১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামার রং

  • ইকবাল খন্দকার

পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল মারুফরা। এবার তারা পাড়ার সামনের রাস্তা এবং রাস্তার পাশের দেয়ালে ‘ঈদ মোবারক’ লিখবেই। একজন অবশ্য বলেছিল-দেয়ালে লেখাটা কি ঠিক হবে? দেয়ালের মালিক বারেক ভাই যদি কোন আপত্তি করে! এরপর বারেক ভাইকে খুলে বলা হয় কথাটা। তার কোন আপত্তি নেই। বরং তিনি খুশি, কারণ তার ভাঙাচোরা দেয়ালে রং পড়বে। মারুফ বলল, রোজার ঈদে দেয়ালে ‘ঈদ মোবারক’ লিখতে পারিনি, কিন্তু এবার কোরবানীর ঈদে রাস্তায় আমরা ‘ঈদ মোবারক’ লিখবো সাদা কালি মানে চুন দিয়ে। আর দেয়ালে লিখবো লাল কালি দিয়ে। লেখাগুলো ফুটবে না? সবাই একযোগে বলে উঠল-অবশ্যই, অবশ্যই।

ঈদের আগের দিন বিকেলে বড় বালতিতে চুন ভেজানো হলো। চুন ভিজতে সময় লাগবে। তাই ঠিক করা হলো এই ফাঁকে দেয়ালের লেখাটা লিখে ফেলা হবে। লাল রঙের বড় একটা ডিব্বা আনা হয়েছে। ডিব্বাটা দেখতে মাঝারি আকারের বালতির মত। মারুফ নিজেই মুখ খুলল ডিব্বার। তার হাতের লেখা ভালো। তাই দেয়াল লিখনের দায়িত্বটা তার ওপরই পড়ল। মারুফ মনের মাধুরী মিশিয়ে বড় করে একটা ‘ঈদ মোবারক’ লিখল। পাড়ার চেহারাটাই যেন পাল্টে গেল। কেমন একটা ঈদ ঈদ আমেজ চলে এলো। এই আমেজ আরো গাঢ় হলো কালো পিচের ওপর সাদা রঙের ‘ঈদ মোবারক’ লেখার পর।

অর্ধেক ডিব্বা লাল রঙ বেঁচে গেল। মারুফদের মধ্যে আরিফ খুব হিসেবী। সে বললÑআমরা যদি রংটা যতœ করে রেখে দিতে পারি, তাহলে আগামী ঈদে আর রং কিনতে হবে না। এটা দিয়েই চালাতে পারবো। আরিফের কথাটা সবার কাছে যুক্তিযুক্তই মনে হলো। কিন্তু ডিব্বাটা রাখা হবে কার বাড়িতে? সাগর বললÑমারুফদের বাড়িতেই থাকুক। ওর পড়ার ঘরটা বেশ নিরিবিলি। কেউ যায় না বললেই চলে। ঐ ঘরের খাটের নিচে রেখে দিলেই হবে। মারুফ কোন আপত্তি বা দ্বিমত করে না। লেখালেখির কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার সময় ডিব্বাটা নিয়ে যায়।

বাড়ি ফিরেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় মারুফের। কারণ তার মামা তার জন্যে ঈদের পাঞ্জাবি পাঠিয়েছেন। সাদা ধবধবে একটা পাঞ্জাবি। সাদা পাঞ্জাবির প্রতি আলাদা আকর্ষণ ছিল মারুফের। সে মনে মনে খুব চাইত তার একটা সাদা পাঞ্জাবি হোক। এর আগের ঈদগুলোতে মামা যতগুলো পাঞ্জাবি পাঠিয়েছেন সবগুলোই রঙিন। কোনোটা সবুজ, কোনো ফিরোজা, কোনোটা বেগুনি। মারুফ পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে দেখে। পারফেক্ট সাইজ। সে এটা রেখে দেয় আলমারিতে। পরদিন সকালে গোসলটা সেরে পাঞ্জাবিটা পরে চলে যায় ঈদগাহে। কোলাকুলি করে বন্ধুদের সঙ্গে।

মারুফদের বাড়ির পাশ দিয়েই চলে গেছে রেললাইন। বিকেলে মারুফ রেললাইনে বসে হাওয়া খাচ্ছিল। তার গায়ে তখনও নতুন পাঞ্জাবি। বিকেলের সোনালি আলোয় পাঞ্জাবির ধবধবে রংটা যেন আরো ধবধবে দেখাচ্ছে। মারুফ বসে বসে কিছু এটা ভাবছিল। এমন সময় হানিফ এসে বললÑমারুফ, আমি নদীর দিকে গিয়েছিলাম। দেখলাম ঐখানে ফিশপ্লেট খোলা। মারুফ বললÑবলিস কী! কে খুলল? হানিফ হাঁপাতে হাঁপাতে বলেÑকে খুলেছে জানি না। তবে এটা জানি কিছুক্ষণ পরই রেল আসবে। ফিশপ্লেট খোলা থাকলে তো নির্ঘাৎ এ্যাক্সিডেন্ট। আচ্ছা তোর কাছে কি স্টেশন মাস্টার বা অন্য কারো নাম্বার আছে?

মারুফ জানায়, তার কাছে কারো নাম্বার নেই। হানিফ কান্না জুড়ে দেয়Ñতাহলে এখন কী হবে মারুফ? এ্যাক্সিডেন্ট হলে তো শত শত মানুষ মারা যাবে। মারুফ দশ সেকেন্ড ভাবে। তারপর দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। বাড়ি গিয়ে নিজের পড়ার ঘরে ঢুকে খাটের নিচ থেকে রঙের ডিব্বাটা বের করে। এরপর আবার দৌড় দেয় রেললাইনের দিকে। এরমধ্যে সে রেলের হুইসেল শুনতে পায়। হানিফ কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়ে। মারুফ তাকে ভরসা দেয়Ñআহা কাঁদিস না তো। দেখ না আমি কী করি। মারুফের ওপর ভরসা করতে পারে না হানিফ। কারণ রেল প্রায় চলেই এসেছে। এতো তাড়াতাড়ি করলে সে কী-ইবা করবে। কিন্তু মারুফ ঠা-া মাথায়ই কাজ করে যায়। সে গা থেকে তার সাদা পাঞ্জাবিটা খোলে। তারপর সেটি চুবায় ডিব্বার লাল রঙে। সাদা জামাটা মুহূর্তেই হয়ে যায় লাল টকটকে একটি জামা। সে তার এই লাল জামাটি একটি লাঠির আগায় বেঁধে দাঁড়িয়ে যায় রেললাইনের ওপর। লাল কাপড় উড়তে দেখে থেমে যায় রেলগাড়ি। বেঁচে যায় শত শত যাত্রীর প্রাণ। মারুফকে পরম আনন্দে জড়িয়ে ধরে হানিফ। ঈদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায় তাদের।