২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার যাত্রী ছাউনির দোকান প্রভাশালীদের দখলে

  • রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত যাত্রীছাউনির দোকানগুলো ভোগদখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী একাধিক গ্রুপ। প্রায় আড়াই শ’ যাত্রী-ছাউনির কোনটির ওপরই সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে এসব দোকান থেকে কোন ধরনের আয় করতে পারছে না সিটি কর্পোরেশন।

আশির দশকে অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশন রাজধানীর যাত্রী-ছাউনিগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে বরাদ্দ দিয়েছিল। এসব বরাদ্দের মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অথচ সেগুলোর নবায়ন করা হয়নি। বরং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা চালাচ্ছে প্রভাবশালীরা। অনেকে আবার সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে তাদের উচ্ছেদ করতে গেলেও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে।

যাত্রী-ছাউনিতে অবস্থিত দোকানের বিষয়ে একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললেও দোকান ভাড়া ও যাত্রী-ছাউনির বিষয়ে কেউই সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য দিতে পারেনি। একেকজন বলেছেন একেক কথা। আবার অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতেই নারাজ। দক্ষিণ সিটিতে যাত্রী-ছাউনির হিসাব-নিকাশ না থাকলেও উত্তর সিটি কর্পোরেশন বলছে, যাত্রী-ছাউনি থেকে তারা কোন ভাড়া পান না। ভোগ ও জবরদখল করে ব্যবসা করছে প্রভাবশালীরা। এদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে যে সব যাত্রী-ছাউনি রয়েছে সেগুলোর কোনটি থেকেই ভাড়া আসে না। যে যার মতো দখল করে রেখেছে।’

রাজধানীর শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুটি যাত্রী-ছাউনিতে মোট চারটি দোকান রয়েছে। দোকানগুলো হলো- ইত্যাদি মেডিসিন সেন্টার, নিশাত মেডিক্যাল সেন্টার ও লামিয়া জেনারেল স্টোর ও শাহবাগ মেডিসিন কর্ণার। এগুলোর মধ্যে শাহবাগ মেডিসিন কর্ণারের যাত্রী-ছাউনিটি এখনও ব্যবহার করা হয়। অন্য তিনটিতে আগে যাত্রী-ছাউনি থাকলেও এখন শুধু দোকানে পরিণত হয়েছে। তবে দুটি যাত্রী-ছাউনির দেওয়ালে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থিতাবস্থার আদেশ জারি সম্বলিত সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে।

জানা যায়, চারটি দোকানের মধ্যে তিনটির দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ আকবর নামের এক ব্যক্তি। তিনি ইত্যাদি মেডিসিন সেন্টারের মালিক বলে দাবি করেন। আকবরের কাছে যাত্রী-ছাউনির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাত্রী-ছাউনির দোকানের মালিক সিটি কর্পোরেশন। যা জানার তাদের কাছ থেকে জেনে নিন। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। এছাড়া আমি বরাদ্দ নেয়া ব্যক্তি নই। অন্য এক ব্যক্তি এগুলো বরাদ্দ নিয়েছেন, আমি তার কাছ থেকে নিয়েছি।’ অন্য ‘সেই ব্যক্তি’র পরিচয় জানাননি আকবর। তবে পাশের ব্যবসায়ী লামিয়া জেনারেল স্টোরের মালিক নূরে আলম বলেন, ‘আকবর তিনটি দোকানের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বাকিদের কাছে থেকে ভাড়া আদায় করেন।’ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লামিয়া জেনারেল স্টোরের বিষয়ে জানতে চাইলে নূরে আলম জানান, তার দোকানের মূল মালিক সিটি কর্পোরেশন। তবে তাকে কাউকে ভাড়া দিতে হয় না। তার কোন ভাড়া লাগে না। তবে কি কারণে ভাড়া দেন না। এ বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। নূর আলম ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। দোকান ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ মেডিসিন কর্ণারের মালিক মোঃ আল-আমীন ওরফে রিপন বলেন, ‘ভাড়া জেনে কী করবেন? ভাড়া আর কত হবে? ৩-৪ হাজারে বেশি নয়।’ এ সময় তিনি এ দোকানের মালিক নন বলে জানান। যদিও তার ভিজিটিং কার্ডে ‘প্রোপাইটর’ হিসেবে তার নাম উল্লেখ রয়েছে। ফার্মগেটের অবস্থিত যাত্রী-ছাউনির দোকান বরাদ্দ নিয়ে গত ২০ বছর ব্যবসা করছেন খোকন মিয়া। ছাউনির দোকানের নির্ধারিত আয়তন থাকলেও তিনি দোকানের বাইরেরও অংশও দখল করে সেখানে আরেকটি ব্যবসা পেতেছেন। খোকন মিয়া নিজে দোকানে বসেন না। তিনি মাঝেমধ্যে দোকানে আসেন।

দোকানের কর্মচারী মোঃ সোহাগ বলেন, ‘ন্যাপচুন ন্যামের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে ভাই (খোকন মিয়া) বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসা করছেন। তিনি দোকানে থাকেন না। মাঝেমধ্যে আসেন।’ দোকানের ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাড়ার বিষয়ে বলতে পারব না। শুধু বিদ্যুত বিলের ব্যাপারে বলতে পারব। তবে শুনেছি মালিক ৬ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া দেন।’ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার ॥ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে প্রায় আড়াই শ’ যাত্রী-ছাউনি রয়েছে বলে জানা গেছে। এর অধিকাংশ ছাউনিতে রয়েছে দোকান। তবে এর মধ্যে কতটিতে দোকান রয়েছে সে বিষয়ে কোন তথ্য নেই সিটি কর্পোরেশনে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের যাত্রী-ছাউনির তথ্য না থাকলেও সংবাদপত্রের বুথের হিসাব তাদের কাছে রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের উপ-কর কর্মকর্তা আনিসুর রহমান (আনিস) বলেন, ‘দক্ষিণ সিটিতে সংবাদপত্রের ২২টির মতো বুথ রয়েছে। তাদের মাসিক ভাড়া নির্ধারণ রয়েছে ১০ হাজার ২৯৮ টাকা। বছরে ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৬ টাকা।’

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আয়তনে সংবাদের বুথ ছোট হলেও এর ভাড়া ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ রয়েছে। বুথের তুলনায় যাত্রী-ছাউনির আয়তন অনেক বেশি। সে তুলনায় এর ভাড়া আরও বেশি হওয়ার কথা। তারপরও যদি ১০ হাজার টাকা করে নির্ধারণ করা হয়, আড়াই শ’ ছাউনির ১০০টিতেও দোকান থাকলে বছরে ভাড়া আসে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু এখন কিছুই আসে না।’

এ বিষয়ে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা এম এম মাহিনউদ্দিন কবীর মাহিন বলেন, ‘যাত্রী-ছাউনির প্রায় সবগুলো ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা দখল করে ব্যবসা করে থাকেন। তারা সিটি কর্পোরেশনকে কোন ধরনের মাসিক ভাড়া প্রদান করেন না।’ ভাড়া আদায়ের বিষয়ে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, ‘এগুলোর কোন বরাদ্দ নেই। সব অবৈধ, আগে বরাদ্দ দেয়া ছিল, সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সিটি কর্পোরেশনে ভাড়া দেন না। বেআইনী ভোগদখল করে আছে। তাদের দখলে থাকতে থাকতে মনে হয় তারাই মালিক হয়ে গেছে।’