২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রিয় প্রসঙ্গে একটি মিথ্যাচার

  • আলফ্রেড খোকন

পৃথিবীর অনেকগুলো কবিতা আমার জীবনযাপনের প্রিয় পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত। কোন কবিতা আমাকে ভোরে জাগায়। কোন কবিতা আমাকে দিন শুরু“করিয়ে দেয়। কোন কবিতা আমাকে পথে নামায়, বিপথেও...। কোন কবিতা আমার হাতের তালুর পাঁচটি আঙুলকে মুষ্টিবদ্ধ করে, প্রতিবাদে দীক্ষা নেয়ায়। কোন কবিতা আমাকে দুপুরে রক্তাক্ত করে, বিকেলে উপশম দেয়। তারপর কোন কবিতা আবার করুণ রোদ্দুরে বসিয়ে বিষণœতার গান শোনায়। গরমে তালপাখার বাতাস করে। রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

কোন কবিতার পেট ভরে আমি পৃথিবীতে আসি। কোন কবিতার হাত ধরে পৃথিবীর বুকে হাঁটতে শিখি। কোন কবিতা আমার কণ্ঠে ভাষা দেয়। কোন কবিতার জন্য আমি মৃত্যুকে বরণ করি। কোন কবিতার জন্য বেঁচে থাকতে সাধ হয়।

কোন কবিতার জন্য আমি প্রতিবার একটি প্রিয় বাগান রচনা করি। তাতে ফুল ধরে, ফল ধরে। বাগানে গাছের ডালে পরিচিত-অপরিচিত পাখিরা আসে, বসে গান ধরে, গান গায়, গান শুনিয়ে চলে যায়। কোন কবিতার জন্য আমি একবার প্রেমিক, কোন কবিতার জন্য আমি একবার বিপ্লবী, কোন কবিতার জন্য আমি খুনিও। কোন কবিতার জন্য আমি মানুষ হয়ে উঠি। কোন কবিতার জন্য আমি বিশেষ প্রয়োজনে অমানুষ হতেও রাজি হই। কোন কবিতার জন্য আমি পরকীয়া করি। কোন কবিতার জন্য আমি বিষ খাই, মরি। তো একটি কবিতা আমি ভালবাসি কী করে!

দৈনিকের বিভাগীয় সম্পাদক, আমাকে টেলিফোনে লেখা চেয়ে জানিয়েছেন, আমি যেন আমার একটি প্রিয় কবিতাকে নিয়ে লিখি। অথবা আমি যেন আমার একটি প্রিয় কবিতার কথা জনসমক্ষে প্রচার করি। কিন্তু তা কী করে সম্ভব?

‘প্রিয়’ তো প্রিয়ই। আমরা কি আমাদের প্রিয়কথা, প্রিয় প্রেম, প্রিয় প্রণয়, প্রিয় বিরহ যেচে গিয়ে বলে দিই। প্রিয় তো আপন মহিমায় প্রকাশিত। তার তো কোন সহায়তা লাগে না। সে নিজেই নিজের সহযোগী।

প্রেমিকা যদি প্রশ্ন করে, তোমার কাছে কে বেশি প্রিয়? জগতে সকল প্রেমিক মিথ্যে কথা বলে। কারণ নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয় তো অন্য কিছু হতে পারে না। প্রাণপ্রিয় বলেই কেউ কেউ প্রাণ বিসর্জন দেয়। স্বপ্রাণ প্রিয় বলেই অন্যকে প্রিয় বলতে শিখি। তো আমার প্রিয় কবিতা আমারই প্রাণ; যাকে নিয়ে আমার আছে অনেক আয়োজন। কোন আয়োজন প্রেমে

কোন আয়োজন সোহাগে

কোন আয়োজন বিরহে

কোন আয়োজন বিসর্জনে

কোন আয়োজন করমর্দনে

কোন আয়োজন ঠোঁটে

আবার কোন আয়োজন চোটে

কোন আয়োজন কলমের নিবে।

তাই আমার একটি প্রিয় কবিতার কথা ভাবতে যেয়েই মনে হলো যতগুলো মুখ, যতগুলো কবিতার নাম, সেই নাম ধরে মুহূর্তেই আমি ঢুকে পড়ি তাদের বৈঠকখানায়, তারপর অন্দরমহলে, তারপর সেই মুখ, সেই প্রিয় কবিতার কোলে। তারপর?

তারপর একজন বড়ু চণ্ডীদাস, একজন কানা হরিদত্ত, একজন বিদ্যাপতি, একজন জ্ঞানদাস, একজন গোবিন্দ দাস, একজন আলাওল, একজন মাইকেল মধুসুদন দত্ত, একজন কাজী নজরুল, একজন জীবনানন্দ দাশ, একজন বিনয় মজুমদার, একজন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, একজন সমর সেন, একজন শামসুর রাহমান, একজন নির্মলেন্দু গুণ, একজন শঙ্খ ঘোষ, আবার একজন আবুল হাসান, একজন রাইনের মারিয়া রিলকে, একজন মাহমুদ দারবীশ, একজন নাজিম হিকমত, একজন নিকানো পাররা, একজন হোমার। আরও একজন যার সঙ্গে সময়-সুযোগের অভাবে এখনও সাক্ষাত হয়নি আমার। ফলে এই প্রিয় তালিকায় আরও কত বাকি রয়ে গেল! সেই বাকি তালিকার হাত ধরে যদি এগোই, তবে আমার সম্পাদক দিলখোশ হতে পারবেন না তার অধিক খরচের সম্ভাবনায়। কিন্তু তাতেও কি আমার একটি প্রিয় কবিতা নিয়ে বলা সম্ভব হবে! যদি শেষপর্যন্ত আমি না বলি সেই ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র কথা।

“এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

মিছিলের সব হাত

কণ্ঠ

পা এক নয়।

সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে

কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার

কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার।’’

[নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, যে জলে আগুন জ্বলে : কবি হেলাল হাফিজ]

কবি হেলাল হাফিজের এই কবিতাটি আমি পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠ করি ২০০৯ সালের ৮ মে, ওইদিন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আর এই কবিতাটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে, অন্তত ১৯ বছর আগে! কী অদ্ভুত! পাঠের আগেই এই কবিতাটি আমাদের প্রিয়পাঠ্য হয়ে যায়। সে কবিতা প্রিয় না হলে, কী করে এই অসম্ভব সম্ভব হয়ে থাকে?

এরপরও কিছু বাকি রয়ে যায়। কারণ সম্পাদক চেয়েছেন কেন প্রিয় তাও যেন লিখি। কিন্তু আমার প্রিয়র সবটুকুই কি আমার প্রিয়? না, কখনই নয়। তাহলে? কী কী কারণে প্রিয় তা আমাকে জিজ্ঞেস না করে বরং পড়েই দেখুন না, আপনারও প্রিয় হয়ে যায় কিনা? তাহলে আপনিও জেনে যাবেন, কেন সে আমার এত প্রিয়।