২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দফতরবিহীন মন্ত্রী

  • মূল : আর কে নারায়ণ;###;অনুবাদ : জাফর আলম

[আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইংরেজী ভাষার কথাশিল্পী আর কে নারায়ণের জন্ম ১৯০৬ সালে মাদ্রাজে। ১৯৩৫ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘সোয়াসী’ এ্যান্ড হিজ ফ্রেন্ডস’ প্রকাশিত হয়। তার গ্রন্থ হিব্রুসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ব্রিটেনের রয়েল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো এবং আমেরিকান সোসাইটি অব লিটারেচার এ্যান্ড লেটার অনারারী সদস্য ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তাকে ভারতীয় রাজ্য সভার সদস্য করা হয়। এই অমর কথাশিল্পী ২০০১ সালের ১৩ মে মাদ্রাজে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। ‘মিনিস্টার উইদাউট পোর্ট ফলিও’ গল্পটি আর কে নারায়ণের গল্প সঙ্কলন সল্ট এ্যান্ড স’ডাস্ট’ থেকে নেয়া হয়েছে। অনুবাদক]

তিনি অফিসে বসেই একান্তসচিবকে চাঙ্গা করার জন্য তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকারের ধারাবিবরণী দিতে শুরু করেন। কিন্তু একান্ত সচিব মন্ত্রী মহোদয় অফিসে পৌঁছার পর তিনি তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব আলাপচারিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ব্রিফ করে দেন।

প্রধানমন্ত্রী অফিসে গেলে প্রধানমন্ত্রী মহোদয় মন্ত্রী মহোদয়কে অভ্যর্থনা জানান এবং দু’জনে একটি সোফায় বসে নিচু গলায় দু’জনে আলাপ করছিলেন। দরজার বাইরে থেকে একান্ত সচিব দু’জনের আলাপচারিতা আদিঅন্ত শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বললেন, ‘আমি আপনার কোরিয়া সফরের প্রস্তাব পড়েছি। আপনি কোরিয়া থেকে ঘাস কিনতে আগ্রহী। কিন্তু কোরিয়ার ঘাস এখানে সর্বত্র পাওয়া যায়। তদুপরি তাদের কৃষিব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে এতদূর পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শিক্ষণীও নেই। ঘাস উৎপাদন অত্যন্ত সহজ ব্যাপার। আপনি দেখেছেন অমার বাড়ির সামনে প্রচুর ঘাস রয়েছে। যে কোনখানে এটা উৎপাদন করা সম্ভব।’

উত্তরে মন্ত্রী বললেন হ্যাঁ, আমি জানি স্যার কিন্তু আমার ধারণা এটা উৎপাদনে কোরিয়ার বিশেষ অভিজ্ঞতা ও কৌশল রয়েছে...। মন্ত্রী মহোদয় বক্তব্য শেষ করার আগেই প্রধানমন্ত্রী চায়ের অর্ডার দেয়ার জন্য কলিংবেল টিপলেন। মন্ত্রী কিন্তু তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বললেন, আপনার এলাকার সমস্যাবলীর দিকে বিশেষ নজর দিন। আপনার দিল্লীতে সরকারী বাসায় অবস্থানের পরিবর্তে আপনার এলাকায় অধিক সময় ব্যয় করুন। সেখানে আপনার এলাকায় আমাদের দলকে শক্তিশালী করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ।’

চা পানের পর পরবর্তী সাক্ষাতপ্রার্থীকে আগমনের অনুমতি দিয়ে কলিংবেল টিপেন। এখানেই তাদের বৈঠক শেষ। অফিসে ফিরে মন্ত্রী মহোদয় তার একান্ত সচিবকে বুঝানোর চেষ্টা করেন এবং নিজেকে সুখী দেখানোর ভান করেন। তিনি একান্ত সচিবকে বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মহোদয় মনে করেন এ বছর বৃষ্টি হওয়া উচিত অন্যথায় সমস্যা দেখা দেবে‘। তিনি মনে করেন পার্টিকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং জরুরী ভিত্তিতে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার দিকে নজর দিতে হবে।

তার কোরিয়া থেকে ঘাস আমদানির ব্যাপারে অভিমত কী ছিল? একান্তসচিব জানতে চায়।

‘আহ আমাদের অনেক জরুরী বিষয়ে আলাপ ছিল। আমার মনে হয়েছে আম্মাকে নিয়ে তার অন্য কোন পরিকল্পনা রয়েছে।’ মন্ত্রীর উত্তর।

‘হয়ত গবর্নর পদ দিতে পারেন। চারটি গবর্নরের পদ শূন্য রয়েছে।’ একান্ত সচিব জানালেন।

হয়ত তাই হবে। কিন্তু বিষয়টি আমাদের কামরার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে যেন কেউ জানতে না পারে। আমি এ ব্যাপারে চিন্তিত নই। কিন্তু যদি দেশের স্বার্থে আমাকে এই পদ দেয়ার প্রস্তাব করেন। আমি দলের একজন সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর সৈনিক হিসেবে তার আদেশ মেনে নেব। কারণ প্রধানমন্ত্রী ভালভাবেই জানেন দেশের কল্যাণে কোন্টা বেশি উত্তম।’ কয়েকদিন পর একটি সংবাদপত্রের রিপোর্ট মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রিপোর্টে বলা হয়, ‘বাঙ্গালুরের বান্নার ঘাটা চিড়িয়াখানায় খাঁচায় বাঘ একটি ছোট্ট শিশুকে হত্যা করেছে। ভয়াবহ ব্যাপার, এই ঘটনা কিভাবে ঘটল তা খুঁজে বের করতে হবে। আমাকে অবশ্যই একটি প্রাথমিক রিপোর্ট সংগ্রহ করে জানাবেন। মান্ত্রী একান্ত সচিবকে নির্দেশ দেন।

‘হ্যাঁ স্যার, আমি জরুরী ভিত্তিতে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ একান্ত সচিব জানালেন।

কয়েকঘাটার মধ্যে একান্ত সচিব খোঁজখবর নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রীকে জানালেন, ‘স্যার, আমি বাঙ্গালুরের ওই পত্রিকা সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে বলেছি, ‘মন্ত্রী মহোদয় সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও রিপোর্ট জানতে চেয়েছেন। কিন্তু জানালেন, ‘সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী বেকায়দায় ফেলার জন্য এই অতিরঞ্জিত রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।’ তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি বাঙ্গালুর যাব এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করব। ফিরে এসে আপনাকে বিস্তারিত ঘটনা জানাব। ‘মন্ত্রী জবাব দিলেন এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগতভাবে বিমানে বাঙ্গালুরে যাওয়া উচিত।’

খাঁচায় বন্দী বাঘটি দেখে, চিড়িয়াখানা পরিদর্শনের পর একইদিনে রাজধানীতে ফিরে আসব। বিমান বাহিনীর একটি বিমানের খোঁজ নিন। দ্রুত বাঙ্গালুর বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখান থেকে হেলিকপ্টারে বান্নারঘাটা চিড়িয়াখানা পরিদর্শনে যাব। এই সুযোগে আমি সেখানকার বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও জরিপ করতে পারব। তদুপরি বন্যাদুর্গতদের রিলিপ কতখানি প্রয়োজন তা জানার সুযোগ পাব।’

তিনি পরবর্তীকালে আফ্রিকার সাফারি পার্কে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি বললেন, ‘দর্শকদের আফ্রিকার সিংহ অধ্যুষিত বন্যপ্রাণী এলাকা পরিদর্শনের যেসব গাড়ি ব্যবহৃত হয়। নিশ্চয় তা অত্যন্ত উন্নতমানের স্টিলের ডিজাইনে তৈরি। আমার মনে হয়, যখন বন্য জন্তুরা উম্মুক্ত স্থানে ঘোরাপফেরা করছে সেখানে দর্শকদের খাঁচায় তুলে পার্ক পরিদর্শনে নেয়া হয়। তাদের এ ব্যাপারে নিশ্চয় বিশেষ কৌশল ও পদ্ধতি রয়েছে। অন্যথায় দর্শনার্থীদের সেখানে প্রচুর ভিড় হয়, সেখানে নিশ্চয় বন্যপ্রাণীর আক্রমণে অনেক দর্শক হতাহত হতো।’

‘আমাদের শিশু এবং নারী-পুরুষ সকলকে বাঘের কবল থেকে রক্ষার কৌশল জানতে হবে। চিড়িয়াখানায় বন্দী জনগণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। আগামীকাল পশু দফতরের মহাপরিচালককে ডেকে আনাই হবে আপনার প্রথম কাজ মন্ত্রী একান্ত সচিবকে লক্ষ করে বললেন। পরদিন একান্ত সচিব জানালেন, ‘আমি সরকারী কর্মকর্তাদের তালিকা দেখেছি। সরকারী দফতরসমূহে এ ধরনের কোন পদ নেই স্যার।’

‘আশ্চর্য ব্যাপার আমাদের জাতীয় স্বার্থে ও জনকল্যাণে এ ধরনের একটি পদ সৃষ্টি করা একান্ত দরকার বিষয়টি মনে রাখবেন একান্তসচিবকে মন্ত্রীর নির্দেশ। ‘আগামীতে সুযোগমতো বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করব। ইত্যবনরে আমার দক্ষিণ ভারত সফরসূচী প্রণয়ন করুন। এর জন্য ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমানের ফরমায়েশ দিয়ে চিঠি পাঠান।’ মন্ত্রী বললেন।

একান্ত সচিব জানালেন, ‘এই ধরনের চাহিদাপত্র প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে পাঠাতে হয়।’

মন্ত্রী আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘হায় ভগবান আবার প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে? একান্ত সচিব অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে এবং শুনেও না শুনার ভান করেন।

মন্ত্রী মহোদয়ের সফরসূচী চূড়ান্ত হলো, তাকে জানানো হয়, ‘ভারতীয় বিমান বাহিনীর কোন বিমান সীমান্ত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সাময়িক কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহারের জন্য বিমান দেয়া হয় না। তাছাড়া দফতরবিহীনমন্ত্রীর সফরসূচীও সুস্পষ্ট নয়। তিনি যদি পরিস্থিতি পরিদর্শনে যেতে চান, তিনি নিশ্চয় জানেন, এখন কাবেরী ও কাবিনী নদীর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন আর আগের পরিস্থিতি নেই।’

‘তদুপরি রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় রিলিফ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। একটি মাত্র হেলিকপ্টার আছে সেটি মুখ্যমন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে। ওই হেলিকপ্টার এখন মেরামতে আছে এবং মেরামতের জন্য এর পাখা ও যন্ত্রপাতি খুলে দেয়া হয়েছে। ওই প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী ও কয়েকটি বন্যা উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনের জন্য সফরসূচী নির্ধারিত করে হেলিকপ্টারের অভাবে যেতে পারেননি। আর চিড়িয়াখানায় বাঘের শিশু হত্যার ঘটনাটিও বিতর্কিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এমতবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার বাঘের আক্রমণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিতে পারছেন না। আর বিষয়টি যদি সত্য হয়ে থাকে তবে এটা সম্পূর্ণ প্রাদেশিক বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের কোন এখতিয়ার নেই।’