২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আরেকটা রুদ্র দরকার

  • রহমান মতি

আমার রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ একটা রুদ্র নয়, অনেকগুলো রুদ্রর সমষ্টি। সেথায় আছে কবি রুদ্র, প্রেমিক রুদ্র, অভিমানী রুদ্র, সংগ্রামী রুদ্র, মানবিক রুদ্র, বোহেমিয়ান রুদ্র, গীতিকার রুদ্র, অকালপ্রয়াত রুদ্র। এই রুদ্রকে চিনতে আমার ঢের সময় লেগেছে । তাও যে একেবারে চিনে ফেলেছি সেটি হলপ করে বলাটা অন্যায়ই ঠেকবে। তার মানে আর একটা রুদ্রকে পাওয়া গেল যাকে বলা যায় রহস্যময় রুদ্র ।

আমার মনে হয় প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রহস্যময়তা থাকে। একটু আধটু অথবা সম্পূর্ণ ফ্যান্টাসিও থাকে । মানুষগুলো আমাদের যা দেয় বা যতটা তাঁদের দেয়ার মধ্যে থাকে তারপরেও মনে হয় আরও পেতে পারতাম আমরা। কিন্তু পাওয়ার ঐ ইচ্ছাটা যতই প্রবল হোক তৃষ্ণাটা যে চিরন্তন তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। রুদ্রকে নিয়েও এরকম একটা আক্ষেপ আছে। মনটা বলে রুদ্রর প্রতিভাকে রুদ্র নিজেই সহ্য করতে পারেনি, নইলে ডাক্তার যাকে বাঁচানোর জন্য সিগারেট ছাড়তে বললেন তিনি কেন পা ছেড়ে সিগারেটেই আস্থা পেলেন ভাবলে ভয় লাগে। তিনি জীবনবিরোধী ছিলেন নাকি অর্ধেক জীবন তাঁর ভাল লাগেনি এসব জিজ্ঞাসা জাগে। এসব অনুমান করা শুরু করলে একজন রুদ্রকে নিয়ে আরও অনেক রহস্য বের হবে। আমি রুদ্রকে পড়তে গিয়ে ব্যক্তি ও কবি রুদ্রর যে সংযোগ তাতে তাঁর সমকাল ও এখনকার সময় মিলিয়ে ভেবেছি রুদ্রর মতো আরও রুদ্র দরকার নইলে যে রুদ্রর এত এত রূপ তার ফসল অধুনা বাংলা কবিতা বা তার শস্যক্ষেত্রে উর্বরতার অভাবটা থেকেই যাবে। কারণটা পরিষ্কার। কবিতার উর্বর শস্যে রুদ্রর মতো আরও কেউ যেমন দরকার তেমনি তাঁর ব্যক্তিত্বে যে নানা সমষ্টি লুকিয়ে থেকে বাস্তবকে মেনে চলার একটা পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব ছিল সেটাও এখন সমান দরকারী।

অবাক হয়ে ভাবি একজন রুদ্র যখন কবি তিনি নিজেকে কবি না বলে বলছেন ‘শব্দশ্রমিক’। কথাটা শুনতেই ভালো লাগে আর উপলব্ধিতে আনতে তো আরও বেশি ভালো লাগে । তিনি একজন স্বাদেশিক চিন্তার কবি আবার অভিমানী প্রেমিক কবিও, তিনি রোমান্টিক আবার স্যাডিস্টিকও ।

‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই

আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,

ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে

এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়।’

(বাতাসে লাশের গন্ধ)

এ লাশের গন্ধ থেকে আজকের স্বদেশ মুক্ত নয়। সকালের চায়ের কাপে বা হাটাহাটি করতে গিয়ে যে পত্রিকাটি পড়েছেন তাতে কোনো না কোনো পৃষ্ঠাতে আপনি এই লাশের গন্ধ বা ধর্ষিতার চিৎকার শুনতে পাবেন। ‘এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়’- দেশ ভুলে যায়নি আজও। আজও সময়টা রক্তাক্ত। স্বদেশের ব্যক্তিগুলো কেমন হবে বা স্বদেশের সামষ্টিক বিনিময়গুলো কেমন হবে তার ওপরেও রুদ্রর অনেক চাওয়া ছিল...

কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত,

রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে

রাখালিয়া বাজাবে বিশদ।

কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপণি খুলে বোসবে না,

চিত্রল তরুণ হরিণেরা সহসাই হয়ে উঠবে না

রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।

(কথা ছিল সুবিনয়)

এই সুবিনয়কে সবাই চিনি আমরা। লোকটা সেই কবে থেকে আমাদের অস্তিত্বের একজন হয়ে ঘুরছে আর বলছে-

‘কথা ছিলো আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বণ্টন’,

আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ।

অথচ পা-ুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু

অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে’

আমরা এক একজন সুবিনয় হয়ে ক্লান্তিকর হয়ে আছি। এখন রুদ্রকে দরকার হবেই বা না কেন!

কবি রুদ্র এভাবে স্বদেশ থেকে ব্যক্তি হয়ে সমষ্টিতে মিশে গেছেন যেখানে কবির সীমানাকে তিনি স্পর্শ করেছেন সম্পূর্ণভাবে। সে স্পর্শ মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থেকে মানবিক থেকেছে ।

ব্যক্তি রুদ্র একজন প্রেমিক রুদ্রের অপূর্ব যোগফল। তসলিমা নাসরিন তাঁর সেই প্রেম। প্রেমকে তিনি যেভাবে অনুভব করেছেন তার দিকে খুব কম লোকই যেতে পারে। ভালোবেসে তসলিমাকে বিয়ে করে বাড়িতে আনলে বাবার কাছে যে জবাবদিহি থাকে সেখানে একটা চিঠিতে রুদ্র বলে যান তাঁর ব্যক্তিভাবনাগুলো আর সেগুলো পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র হয়ে যে চূড়াকে স্পর্শ করে ভালোবাসার জন্য তার তুলনা কেবল ভালোবাসা দিয়েই অনুভব করা যেতে পারে আর কিছুতে নয়। রুদ্রর চিঠির কথাগুলোতে এক জায়গায় আছে -

‘আমি কি ভুল পথে চলেছি? কখনো মনে হয়েছে, আমিই ঠিক, এই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবে সবচেয়ে সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসতে গেলে সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসা মানেই একটি গ্রামকে ভালোবাসা। একটি গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটি গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে। পৃথিবীতে কত বড় বড় কাজ করেছে মানুষ। একটা ছোট্ট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কত সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে কাজ সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি।’

প্রেমিক রুদ্রও একটা মাত্র রুদ্র যে নয় এ কথাগুলোতে তার প্রমাণ মেলে। প্রেমিক হয়ে তিনি শুধু একজন নারীকে (প্রেমিকা তসলিমাকে) ভালোবেসে গেছেন তা নয়, তাঁর ভালোবাসা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বড় পরিসরে গিয়ে ছড়িয়েছে। পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের সর্বোচ্চ ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে সে চেতনা। অসাধারণ এ অনুভূতি। তসলিমার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে তসলিমা লিখেছিলেন, ‘তুমি চলে যাবার পর আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি...ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়’ খুব দামী কথা। ভালোবাসা সত্যিই দেখেশুনে বিলোবার মতোই অমৃত সম্পদ। সে দীক্ষাটি তসলিমা রুদ্রকে ভালোবেসেই পেয়েছিলেন। তসলিমার গল্প ‘ভালো নেই ভালো থেকো’তে আরো এসেছে যখন রুদ্র টাকার অভাবে সিঙ্গাড়া খেয়ে দুপুর পার করতেন তখন কোথায় ছিল এই রুদ্র নিয়ে মাতামাতি। আক্ষেপটা অবশ্যই বড় ব্যাপার। করুণ। রুদ্রকে নিয়ে আমরা যে আয়োজন করি বা করছি জীবদ্দশার রুদ্রকে সে সম্মান দেয়া হয়নি, যদিও এ বাস্তবতা কবিদের বা শিল্পস্রষ্টাদের জন্য নতুন কিছু নয়। রুদ্র দারিদ্র্য দেখেছেন, সংগ্রাম করেছেন, দেখেশুনে লিখেছেন এভাবেই যা লিখেছেন খাঁটি লিখেছেন ।

গীতিকার রুদ্রর গান রোমান্টিক ও স্যাডিস্টিক দুটোই। তিনি লিখেছেন, ‘ভালো আছি ভালো থেকো/ আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ।’ আকাশের ঠিকানাটা আমার কাছে, আপনার কাছে খুব সহজেই অনুভূত হবে যে এটি অসীমের ঠিকানা। মৃত্যু ছাড়া বা রহস্যময়তা ছাড়া এ অসীমের ব্যাখ্যা তো সেভাবে মাথায় কুলায় না। রুদ্রের গানের কথাতে বাউলিয়ানা আছে যেখানে তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘দিও তোমার মালাখানি/বাউলের এই মনটারে/আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে/আছ তুমি হৃদয়জুড়ে।’ ভালোবেসে গভীরভাবে বলা এ কথাগুলো কাতর প্রেমিকেরই অনুরণন। গানের অন্তরার কথাগুলো-

১. পুষে রাখে যেমন ঝিনুক, খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ,

তেমনি তোমার নিবিড় চলা, ভিতরের এই বন্দরে,

আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছ তুমি হৃদয়জুড়ে...

২. ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ধুম

তেমনি তোমার নিবিড় ছোঁয়া, গভীরের এই বন্দরে

আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছ তুমি হৃদয়জুড়ে

হৃদয়জুড়ে যে ভালোবাসার বসবাস এভাবে কাব্যিক আবেগময় করে বলার মধ্যে একটা আত্মিক সুখও আছে। রুদ্র সম্ভবত সে সুখ পেয়েছিলেন সম্ভবত পানওনি। প্রেমিক রুদ্র তাই প্রেম ও বিচ্ছেদে রোমান্টিক ও স্যাডিস্টিক।

আমার কাছে রুদ্রের নিঃসঙ্গ অভিমান খুবই প্রিয়। তাঁর ‘অভিমানের খেয়া’ কবিতায় তিনি বলেছেন-

‘ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ আর কতদিন?

নীল অভিমানে পুড়ে একা আর কতোটা জীবন?

কতোটা জীবন?’

‘কিছুটা তো চাই হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ,

অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই

কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই।’

এ অভিমান চিরন্তন। যে চোখের কথা রুদ্র বলে যান সে ‘চোখ’ আমরা কতটা পেয়েছি রোজকার জীবনে সে জিজ্ঞাসা সবার কাছেই সবার আছে। অভিমানী রুদ্র জীবনে প্রেম হোক বা জৈবনিক যা কিছু আছে তার মধ্যে কোনো একটা আর্তনাদ থেকে জীবনকে আর চাননি শেষ অবধি।

এত এত রুদ্র অনেক রুদ্রের সমষ্টি সে কথা আগেই বলেছি। রুদ্রর এত রূপ দেখে একজন বৈচিত্র্যময় মানুষ হিসেবে তাঁকে যেমন জানতে ও উপলব্ধি করতে ইচ্ছে হয় তেমনি মনে হয় একালে আর একটা রুদ্র খুব খুব দরকার। আর একটা রুদ্র থাকলে অকালপ্রয়াত রুদ্রর একটা ছায়া তো থাকত যাকে দেখে আরো রুদ্রের জন্ম হতে পারত। ফলাতে পারত রুদ্রর মতোই উর্বর শস্য।

নির্বাচিত সংবাদ