২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পিরামিড চত্বরের এক বিকেল

  • শাকুর মজিদ

গ্রেট পিরামিডের বাইরের দিকে বিশাল এলাকাজুড়ে এলোপাতাড়ি কবরখানা। সে সময়ে পিরামিড নির্মাণকালে যে সকল শ্রমিক মারা গিয়েছিল এগুলো তাদের কবর। শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিল দাস। এর পেছনে তিনটা বাচ্চা পিরামিড, খুফুর তিন স্ত্রীর জন্য তিনটা। এগুলোতে কেউ যায় না, দূর থেকে দাঁড়িয়ে কতগুলো কোণাকার পাথুরে ঢিবির মতো মনে হয় এগুলোকে।

খুফুর গ্রেট পিরামিডের পাশে আরও দুটো বড় পিরামিড। একটি তার পরবর্তী উত্তরসূরি খাফ্রির, অপরটি মেনকাউরের। এ তিনজনের মধ্যে কী সম্পর্ক তা গোলমেলে। হিরোডিটাস লিখেছিলেন খুফুর ভাই খাফ্রি আর পুত্র মেনকাউর। কিন্তু পরবর্তী ঐতিহাসিকরা বলেছেন এরা দাদা-পিতা-পুত্র। আমাদের গাইডও বলছেন একই কথা। বর্তমানের ঐতিহাসিকরা বলছেন, খুফুর শাসন শেষ হয় খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬৬ সালে, এরপর আসেন জেদেফ্রি, চালান ২৫৫৮ খ্রিস্টপূর্ব সাল পর্যন্ত। তার জন্য পিরামিড বানানো হয় অন্য জায়গায়।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৫ সালে হিরোডিটাস মিসর সফরে এসে স্থানীয় লোকজনের কাছে দুই হাজার বছর আগের রাজাদের কথা শুনেছিলেন। তাকে স্থানীয় লোকেরা খুফু এবং খাফ্রি সম্পর্কে খুব আজেবাজে কথা বলেছিল। সেসব রাজার নাম মুখে আনার আগেই তারা খারাপ প্রাণীদের নাম নিত। বলেছিল যে, মেনকাউরে ছিল ভাল রাজা। সে এসে তার আগের দুই রাজার কাজ কারবার বাতিল করে দিয়ে দেশে অন্য মন্দিরগুলো জনগণের জন্য খুলে দিয়েছিল। দেশের অর্থনৈতিক খারাপ অবস্থা দেখে নিজের পিরামিড ব্যয় সঙ্কোচন করে বানিয়েছিল। এ কারণে এটার গায়ে বেলেপাথরের প্রলেপ পড়েনি সে সময়ই। এখন এটা প্রায় সেরকমই আছে। মাঝখানে চোর-ডাকাতরা ঢুকে তার মালামাল নিয়ে গেছে মাত্র। এই দুর্বল পিরামিডটির ভেতর দেখার পথটাও এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু খুফু আর খাফ্রির পিরামিডের ভেতর দেখা যায়।

গ্রেট পিরামিডের অবস্থান মিসরের গিজায়। আরবী ‘গিজা’ শব্দের অর্থ ‘সীমান্ত’। নীল নদের সৃষ্ট ব-দ্বীপে এটির অবস্থান আপার এবং লোয়ার ইজিপ্টের সীমান্তে। এই পিরামিডের অবস্থান যে ব-দ্বীপে সেই ব-দ্বীপটির অবস্থান আবার গাণিতিকভাবে মিসরের মাঝখানে। তাই গ্রেট পিরামিড গিজাকে অবস্থানগতভাবে বলা হয় মাঝে এবং সীমান্তে।

পিরামিডের অনেক গল্প শোনা হলো। তাকিয়ে দেখি আমাদের সঙ্গীদের কেউই আমার আশপাশে নেই। একটু দূরে দেখি মাসুদ ভাই আর এনায়েত ভাই এক উটের পিঠে হাত রেখে ছবি তোলার পোজ দিচ্ছেন। ছবি তুলে দিচ্ছে উটের চালক কাম মালিক।

এই উটোয়ানের (গরুর গাড়ির চালক যদি গাড়োয়ান হয়, উটের চালক ‘উটোয়ান’ হতে দোষ কি!) বেশবাস মিসরী। পায়ের গোড়ালি থেকে গলা পর্যন্ত কালো রঙের জোব্বা, মাথায় সাদা রঙের পাগড়ি প্যাঁচানো, হাতে বেত, চোখে কালো চশমা। আশপাশের অন্য উটোয়ান গাড়োয়ানরাও প্রায় একই রকমের পোশাক পরেছে। শুধু জোব্বার রংটি কারও খয়েরি, কারওটা ছাই রঙের। উটের পাশাপাশি ঘোড়ার শকটও আছে। কেউ কেউ এসব ঘোড়ার গাড়িতে ঝাঁকি খেতে খেতে দুলে দুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে লম্বা পথে না চলতে চলতে এসব ঘোড়া গাধার গতি পেয়ে গেছে।

ছবি তোলা শেষ হতেই ফ্যাসাদের মধ্যে পড়ে যান তারা। উটোয়ান তার উটকে তাদের কাছে এনে রেখেছে। উটটি পরম আনুগত্যের সঙ্গে হাঁটু গেড়ে তাদের সামনে প্রায় বসে পড়েছে। এবার তাদের পালা, তারা উটের পিঠে চড়বেন। কিন্তু চড়ছেন না। এখন উটোয়ান বলছেন উটের সঙ্গে ছবি তোলা হয়েছে এজন্য উটের মডেলিং চার্জ দিতে হবে।

যাঁরা ছবি তুলেছেন, তারা এজন্য কেন পাউন্ড দেবেন, বুঝতে পারছেন না। গ্যাঞ্জাম এই নিয়ে।

এই উটোয়ান কয়েকটি ইংরেজী শব্দ জানেন। যে শব্দগুলো তিনি উচ্চারণ করলেন তা আমার গাইডের চেয়ে অনেক সুন্দরÑ দিস ক্যামেল রয়াল ক্যামেল, হিস নেম রোনাল্ড। হিস চার্জ ফিফ্টি পাউন্ড।

তাঁরা যখন এসব নিয়ে বিত-ায় জড়িয়েছেন তখন উটটি দেখি তাঁদের পায়ের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার মালিকের দাবি, এটাতে করে ২০ মিনিট চক্কর দেয়া যাবে, ৫০ পাউন্ড ভাড়া। এর উপর উঠলেও টাকা, না উঠলেও টাকা, একে ছুঁইলেই টাকা দিতে হবে।

গ্যাঞ্জাম মেটানোর জন্য আমাদের বার্গেইন মাস্টার লাভলু ভাই এসে হাজির হন। তিনি ফায়সালা করেন যে, ২০ মিনিটের জন্য এই উটের ভাড়া দেয়া হবে। আগের ১০ মিনিট চলে গেছে এর সঙ্গে ফটোসেশন করে, বাকি ১০ মিনিট আমরা এতে চড়ব। এই উটের পিঠে সওয়ার হতে মাসুদ ভাই বা এনায়েত ভাই কেউই রাজি নন। আমার কাজ তাঁদের ছবি তোলা, সুতরাং আমি উঠব না, তাছাড়া আমি ভয়ও পাচ্ছি এই হাঙ্গরমার্কা উটের পিঠে চড়তে। ঠিক হলো লাভলু ভাই তাঁর ক্যামেরা যুগল আমার হাতে দিয়ে তিনিই সওয়ার হবেন এবং বাকি ১০ মিনিট তিনি গ্রেট পিরামিড অব খুফুর চারপাশ ঘুরবেন।

উটোয়ান বলেন, চারপাশ ঘুরতে ১০ মিনিটে হবে না, আরও ৫০ পাউন্ড দিতে হবে। লাভলু ভাই বলেন, আমার ১০ মিনিট যেখানে শেষ হয় সেখানে আমাকে নামিয়ে দিও। রাজি হয় উটোয়ান। তাঁকে নিয়ে রোনাল্ড চলে যায় খুফুর পিরামিডের দিকে এবং ১০ মিনিটের অনেক বেশি সময় নিয়ে অনেক পথ ঘুরে এখানে এসে আবার নামিয়ে দেয়। লাভলু ভাই ৫০ পাউন্ড বের করে তাঁর হাতে দেন।

উটোয়ান এবার অনেক বিনয়ী, সে আগে যে ক্ষিপ্র ভাষায় টাকা চেয়েছিল সেটা থেকে নেমে এসেছে। এবার সে বখশিশ চায়। ভেজাল না বাড়ানোর জন্য আরও ১০ পাউন্ড তাঁর হাতে দেয়া হয়।

আমরা বিদায় নেব, এমন সময় রোনাল্ডকে নিয়ে সে ব্যাটা আবার এসে হাজির হয়। বলে, যত ইচ্ছা ওর সঙ্গে ছবি তোলো, আর কোনো টাকা লাগবে না।

পিরামিড কমপ্লেক্সের কাছে ঘোরাঘুরি শেষ করতেই আমাদের গাইড ভাই তাড়া দিলেন। বলেন, আসেন, একটু দূরে এক জায়গায় নিয়ে যাই আপনাদের, ওখান থেকে সবগুলো পিরামিড একসঙ্গে দেখা যাবে এবং আপনাদের চমৎকার ছবি ওঠানো যাবে, ওখানে সব্বাই যায় ছবি তোলার জন্য। আমরা আবার আমাদের গাড়িতে গিয়ে উঠি এবং মিনিট পাঁচেকের মাথায় যেখানে গিয়ে পৌঁছাই তা একটি খোলামেলা স্যুভেনির শপ। ছাতা মাথায় দিয়ে হকারেরা বসেছে। তারা বিক্রি করছে নানা রকমের পুতলা, মগ, প্লেট, প্যাপিরাস পেইন্টিং। সবই মিসরীয় আদি চিত্রকলার রেপ্লিকা। দাম হাঁকে একেকটা ২০০-৩০০ পাউন্ড। কিনতে ইচ্ছা করে, কিন্তু ডান পাশের শূন্য বাদ দিয়েও দাম বলতে ইচ্ছা করে না, না জানি ঠকে যাই। আমি বরং তাঁদের ছবি তুলতে আনন্দ পাই। নানা রকমের ট্যুরিস্ট নানা ভঙ্গিমায় পিরামিডগুলোর চূড়াকে নিয়ে আঙুল দিয়ে নানা কসরতে ছবি তলার চেষ্টা করছে। আমার সঙ্গে এরাও বাদ যান না। পিরামিডের অপর পাশে বিশাল মরুভূমি। সেখানে কতগুলো নিরীহ উট নিয়ে অনেক উটোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। কেউ শখের পর্যটক পেয়েছে, যাদের নিয়ে তারা মরুচারণ করছে। এদের ছবি তুলে পিরামিড ও ফারাওদের নিয়ে লেখা একটা বই আর কয়েটা ডকুমেন্টারি ফিল্মের ডিভিডি কিনে গাড়ির দিকে চলে যাই। এবার আমরা গিয়ে থামি সেই স্ফিঙ্কসের পাশে।

শেষ বিকেলের মিষ্টি আলোয় অনেকেই বেড়াতে এসেছে কাফ্রির পিরামিডের পেছনের দিকের স্ফিঙ্কস চত্বরে। আছে নানা রকমের বোরকাওয়ালী ও জোব্বাওয়ালা হকারের উপদ্রব। আমি ব্যস্ত হই বিকেলের পিরামিডের ছায়ায় দেখা স্ফিঙ্কসের ছবি তুলতে।

পূর্ব দিকে মুখ করা এ স্থাপনাটিকে দেখলে মনে হবে এক বিশাল সিংহমানব সামনে পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে। স্ফিঙ্কস-এর নিচের অংশ দেখতে সিংহের মতো এবং উপরের অংশ বা মাথা তৈরি করা হয়েছে মানব নারীর চেহারা দিয়ে। ১৮৫ ফুট লম্বা এবং ২০ ফুট চওড়া ৬৫ ফুট উঁচু। দুই পা ছড়িয়ে নখরবিশিষ্ট থাবা মেলে রাখা এ সিংহমানবীর মূর্তিটির গভীর অভ্যন্তরে রয়েছে মন্দির। প্রবেশ করতে হয় মেলে রাখা দুই পায়ের মাঝ দিয়ে। তবে স্ফিঙ্কসের নাক এখন আর অক্ষত অবস্থায় নেই। ধারণা করা হয়, নেপোলিয়নের সৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নাকহারা হয়েছে এই সিংহমানবী।

এখানে এসে আমি বেশ ক্লান্ত। একটা ভাঙ্গা পাথর স্তম্ভ দেখে আমি বসে পড়ি। আমার সঙ্গী তিনজন ক্যামেরা নিয়ে চলে গেছেন। স্ফিঙ্কসের ভেতরে যে মন্দির আছে, তা তাঁরা দেখছেন এবং ছবি তুলছেন। আমি ছবি তুলি বেড়াতে আসা মানুষদের। দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল টিমের খেলোয়াড়রা সবুজ রঙের ট্রাউজার ও ফুলহাতা জার্সি পরে এসেছে দলবেঁধে, স্ফিঙ্কস দেখছে। আমি তাদের দেখি।

ছাদের উপর উঠে সময় পাই আমার ইতিহাস বইটা খুলে দেখার আর নিশ্চুপ হয়ে সাড়ে চার হাজার বছর আগের কীর্তিগুলো দেখার। সন্ধ্যা নেমে আসে গিজার মরুতে, আকাশে লালিমা ছড়ায়। এই লালিমার পটভূমিতে তিনটা পিরামিডকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। এ নিদর্শনগুলো কী শিক্ষা দিয়ে যাছে সেটাও আমাদের ভাবায়।

চারতলার ছাদের উপর থেকে আরেকবার ভাল করে দেখি এই অঞ্চলকে। ১৭৯৮ সালে এখানেই পিরামিডের যুদ্ধ হয়েছিল নেপোলিয়নের সঙ্গে মামলুক সুলতানের। মামলুকরা হেরে গিয়েছিল এবং এই পরাজয়ের সঙ্গে ৭০০ বছরের মামলুক শাসনের আপাত অবসান হয়েছিল মিসরে। মিসরের পিরামিড দেখে নেপোলিয়ন তাঁর সৈন্যদের বলেছিলেন, দেখো, ওই পিরামিডগুলো উপর থেকে চার হাজার বছর আমাদের দিকে চেয়ে আছে।

নেপোলিয়ান মিসর জয় করার জন্য কয়েকবারই মিসর গিয়েছিলেন। মিসরকে ফরাসী কলোনি করার ইচ্ছাও তাঁর ছিল। কিন্তু তাঁর জনবল ওখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে তাঁকে ফেরত আসতেও হয়েছিল। শেষমেশ যখন তিনি মিসর যান তাঁর সঙ্গে ৫০০ জন লোক ছিল। তাদের মধ্যে ১৫০ জনই ছিল অযোদ্ধা। তারা কেউ জীববিজ্ঞানী, কেউ পরিবেশবিজ্ঞানী, কেউ অঙ্কবিদ। মিসরের পিরামিড তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর গবেষক দল দেশে ফিরে ২০টি খ-ে মিসরের ওপর বই লেখেন। তা প্রকাশ হয় ১৮২৮ সালে।

আজ সন্ধ্যায় আমাদের আর কোন কাজ নেই। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যতক্ষণ তার বিভা থাকবে আমরা এই রুফটপ রেস্টুরেন্টে খানাপিনা করব। তারপর হোটেল থেকে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে চলে যাব গিজা রেলস্টেশনে। কাল ভোরে নামব লুক্সর।