২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্প ॥ ফ্ল্যাটে শিশু ও বৃদ্ধ নিদারুণ

  • মেহেদী উল্লাহ

‘আপনে জানেন আমি কি? আমি একজন শিল্পী। কী বিশ্বাস হয় না?’

পরিচিত-অপরিচিত মানুষের কাছে এই সাধারণ/অসাধারণ প্রশ্নটা রাখার জন্যই যেন মুকিত সাহেবের এত আয়োজন। তাঁর এমন প্রশ্নে আজ পর্যন্ত কেউ হতচকিত হয়নি। উল্টো বলতে শোনা গেছে, ‘অবশ্যই আপনি শিল্পী। বড়মাপের শিল্পী। আমাদের বিশ্বাসে কোন সংশয় নাই।’

মুকিত সাহেবের শিল্পীসত্তার সমস্ত দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন এই পক্ষীশালা। দু-একটা প্রাণীও চোখে পড়ে এখানে। পাখির কথাই আগে বলি। কবুতর, শালিক, চড়াই, ময়না, টিয়া, বুলবুলি সব আছে শুধু দোয়েল ছাড়া। অনেকেই জানতে চান, দোয়েলটা বাদ রাখলেন কেন?

মুকিত সাহেব জানিয়ে দেন,‘ভাবিনি যে তা না। কিন্তু জাতীয় পাখি বন্দী করব! কষ্ট লাগে।’

‘ও। তবে কাক রাখায় আনন্দ পেয়েছি বেশি!’ বেশিরভাগ মানুষের আরও আনন্দ প্রকাশ।

বাঁশের, বেতের আর লোহার খাঁচায় নানা জাতের পাখিগুলো ঠুকরে-ঠুকরে খায়। মুকিত সাহেবের এই পক্ষীশালার কোন নাম নাই। ফলে জিনিসটা শুধু পক্ষিশালা হিসেবে স্টাবলিশ হয় নাই। খরশোগ আছে, বানর আছে, ইঁদুর, টিকটিকিও বাদ নেই।

পক্ষীশালার লোকেশনটা চমৎকার। খিলক্ষেতের সুনিবিড় নীড় পেরিয়ে রিক্সা দিয়ে একদম সোজা রাস্তায়, এক কিলোমিটারের পথ। এই রাস্তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য, কোন আমলেই এতে পিচঢালা হয় না, জšে§র ইটের! সন্ধ্যার পর এখানকার চায়ের দোকানগুলোতে কুপির বাতি জ্বালানো থাকে, অন্য আলো নাই। দোকানে বসে মেক্সিমাম মানুষ চায়ের বদলে একটু পর পর পানি খায় আর আড্ডা দেয়, বেশিরভাগ শ্রমিক। সুনিবিড় নীড়ের পাশে কয়েকটা কয়েল কারখানা গড়ে উঠেছে। উত্তরার সৌখিন লোকজন এখানে আসে কুপির বাতির আলোয় চা খেতে, প্রেমিক-প্রেমিকা, বউ-জামাই ইত্যাদি। এতে তব্দা মেরে বসে থাকে, এত সুন্দর রোমান্টিক কুপির বাতির আলোয় এরা কিনা পানি খায়!

রাস্তাটার শেষ মাথায় একটা কংক্রিটের হল আছে। কোথায় যেন চলে গেছে ওটা! হলের একটু আগে মুকিত সাহেবের পক্ষীশালার সৌন্দর্য তাদের এমনভাবে ভেতরে টেনে নিয়ে যায় যে, অধিকাংশ লোকই বিহ্বল হয়ে রিক্সা ভাড়া বেশি দিয়ে দেয়, আর নিজের মনকে প্রশ্ন করতেই ভুলে যায় সম্মুখের এই হলটা কোথায় নিয়ে গেছে রাস্তাটাকে?

মুকিত সাহেব দেয়ালহীন খড়েরচালার একটা কুটিরে বসে কৌতূহলী মানুষের অপেক্ষায় থাকেন। আর একটু পর পর ঢেকুর তোলেনÑএটা যৌবন থেকেই অভ্যাস। দর্শনার্থীরা অবাক না হয়ে পারে না। কী সোন্দর পক্ষীনিকেতন! যে মানুষটা গড়েছেন বিদায় নেয়ার আগে স্টাফদের কাছে তারা জানতে চান। তারা দেখিয়ে দেয়, ‘ওই যে, উনি, কুটিরে আরাম কেদারায় বসে অপেক্ষা করছেন আপনাদের দুটি প্রশ্ন করার জন্য। যান।’

তখনই প্রথম প্রশ্নটা তিনি করেন, ‘আপনে জানেন আমি কী? আমি একজন শিল্পী। কী বিশ্বাস হয় না?’

দর্শনার্থীদের প্রতি মুকিত সাহেবের দ্বিতীয় প্রশ্নটা এরকম,‘আপনারা কোন ফ্ল্যাটে না গিয়েই কীভাবে বা কিসের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারবেন যে, ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটগুলো শিশু ও বৃদ্ধদের বাস উপযোগী না। ধরে নেন এটা একটা ধাঁধা। এখন উত্তর দিতে হবে না, পরের বার পক্ষীশালায় এলে বলবেন। বাসায় গিয়ে চিন্তা করেন সকলে।’

এই প্রশ্ন শুনে মুকিত সাহেবের প্রতি দর্শনার্থীদের ইন্টারেস্ট কমে যায় তৎক্ষণাত। তাঁরা বিদায় নেয়।

অথচ এই একটা প্রশ্ন আঁকড়ে বসে আছেন মুকিত সাহেব। সেই যৌবন থেকে। যে দিনগুলোয় তিনি খিলক্ষেত, সুনিবিড় নীড়ের আবাসন প্রকল্পের ম্যানেজার ছিলেন। এছাড়া সেই দিনগুলোতেই পক্ষীপ্রেমে মগ্ন এই মানুষটি কারও কারও ফ্ল্যাটে গিয়ে বলতেন, ‘আমি এই পুরো প্রকল্পের ম্যানেজার মুকিত। ইতোমধ্যেই আপনারা আমার সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। আপনারা অনুমতি দিলে আমি আপনাদের অব্যবহƒত বারান্দায় পাখির খাঁচা বসাতে চাই। সব দায়-দায়িত্ব আমার। আপনাদের কিছুই করতে হবে না। জায়গা আপনার, পাখি ও তাদের যতœ-আত্তি আমার।’

এই অদ্ভুত প্রস্তাবে অনেকেই রাজি হয়ে যেত, কারণ তারা মুকিত সাহেবের যথাযথ ও ভদ্র-ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ফ্ল্যাট বুকিং দেয়ার সময় থেকেই অবগত। এছাড়া, তারা এও জানেন, মুকিত সাহেবের নিজস্ব কোন ফ্ল্যাট নাই, তিনি অবিবাহিত আর তাঁর পাখি প্রতি অত্যধিক নেশা।

আজ এই জমজমাট পক্ষীশালার কালে এসে বলা যায়, মুকিত সাহেব একজন চিরকুমার, তাঁর বয়স আটান্ন। তিনি এখন আর সুনিবিড় নীড়ের ম্যানেজার নন, একজন সফল পাখিপ্রেমিক। অথবা তাঁর ভাষায়, তিনি শিল্পী।

দুই

‘আপনারা কোন ফ্ল্যাটে না গিয়েই কীভাবে বা কিসের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারবেন যে, ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটগুলো শিশু ও বৃদ্ধদের বাস উপযোগী না। ধরে নেন এটা একটা ধাঁধা।’

মুকিত সাহেবের এই ধাঁধাটা খিলক্ষেত, উত্তরাসহ আশপাশের মানুষের কাছে একটা জাতীয় জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে। একজন থেকে আরেকজনের কাছে প্রশ্নটা ছড়িয়ে পড়ছে। সমাধান করতে পারছে না কেউ-ই। সবার আক্ষেপ, বাসায় গেলে না হয় দেখে বলতে পারতাম পরিস্থিতি কী! না গিয়ে কীভাবে বলব, কার বাসায় কোন শিশু বা বৃদ্ধ কীভাবে আছে, কেন ফ্ল্যাট তাদের জন্য বাস উপযোগী না।

তিন

খিলক্ষেত, সুনিবিড় নীড়ের বিল্ডিংগুলো নিরাপদ দূরত্বে হলেও ভালই গায়ে গা লাগিয়ে গড়া হয়েছে। এক বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে আরেক বিল্ডিংয়ের জানালায় বা বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষরা ইচ্ছে করলে একে অপরকে দেখতে পায়। নানা নয়েজের কারণে সাউন্ড অবশ্য যায় না। তাই ইশারায় কথাও বলতে পারে চাইলে।

মুকিত সাহেব ম্যানেজার থাকা কালে ‘বনলতা’ বিল্ডিং থেকে ‘সুরঞ্জনা’ বিল্ডিংয়ের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। বনলতার দশতলার এক ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে সুরঞ্জনার দশতলার এক বারান্দা দেখা যেত পরিষ্কার। বনলতার বৃদ্ধ আর সুরঞ্জনার শিশু ইশারায় কথা বলত। শেষ পর্যন্ত, কেউ কারও কথা বুঝতে সক্ষম হয়েছিল কিনা কেউ জানে না। তবে কিছু দিন বৃদ্ধ ও শিশুটি ইশারা চালিয়ে গিয়েছিল। মাথা কামানো, সাদা গোঁফের গাল ভাঙা, লম্বা মুখের বৃদ্ধটি ছোট করে ছাঁটা কালো চুলের শিশুটির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছিল। তারা এও জানত, যতই তাদের ভাব হোক, কখনও দেখা হওয়া সম্ভব না। বৃদ্ধের এক পা অচল। শিশুটি একা অচল। দু’জনের জন্য আরও বড় কথা, তারা গৃহবন্দী। সারাদিন তারা বাসায় একা। বৃদ্ধের ছেলে আর ছেলের বউ অফিসে গিয়ে ফিরত সন্ধ্যা কিংবা রাতে। শিশুটির মা-বাবাও তাই। শিশু আর বৃদ্ধে অনেক কথাই হয়েছিল বোধ হয়, আবার কোন কথাই হয়নি হয়ত। তারা তাঁদের অভাবগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করত অথবা তারা বুঝতেই পারেনি কী তাদের অভাব। অসমবয়সী এই দুই বন্ধুর দুর্ভাগ্য, তারা কখনই একে অন্যের পুরো শরীর দেখতে পায়নি! তারা ঠিক এ রকম দেখতে চেয়েছিল কি না তাও লেকসিটির বাসিন্দাদের জানা নাই। সন্ধ্যার পর তারা জানালা ও বারান্দা থেকে মিলিয়ে যেত। পরদিন সূর্য ওঠার পরও তাদের দেখা হতে বিলম্ব হতো, ফ্ল্যাট দুটির বুয়াসহ অন্য চার সদস্য বাসা ত্যাগ করলেই কেবল জানালা ও বারান্দায় মানুষদ্বয় উš§ুক্ত হতে পারত অথবা হতো। শিশুটি ভেংচি কাটত বৃদ্ধটিকে, বৃদ্ধ কেবল সাপের মতো জিহ্বা বের করে ভেংচির জবাব দিত। অবসরে যাওয়ার আগে বৃদ্ধ ছিলেন স্কুল টিচার, শিশুটি সবে স্কুলে যাবে। ফলে, তাদের মধ্যে দেখা হলে নিশ্চয়ই তারা পরস্পর স্কুল নিয়ে কথা বলতে পারত। বৃদ্ধটি হয়তো শিশুটিকে বলত,‘খোকা, চোখ বন্ধ করে একটা পথ কল্পনা কর, কী দেখতে পাও? হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছ, একটা সোজা পথ, পথের শুরুতে একটা বাড়ি, তাই না? বাড়ি থেকে সামনে হাঁটলে একটা স্কুল, দেখতে পাচ্ছ? স্কুলের পাশ ঘেঁষে একটা রাস্তা চলে গেছে, যেখানে রাস্তাটা শেষ হয়েছে ওটা কেমন নীরব, তাই না? হ্যাঁ, ওটা কবর।’ শিশুটি মাথা নেড়ে সায় দিত, হ্যাঁ সে বেশ দেখতে পেয়েছে। এছাড়া সেও বলতো, ‘তুমি যেখান থেকে ফিরছ, আমি কেবল সেখানে যাচ্ছি, তুমি যেখানে যেখানে যাচ্ছ, আমি স্কুল থেকে ফিরে সেখানে যাব। তাই না?’

বৃদ্ধটি হয়ত বলত,‘বেশ! তুমি তো ধরে ফেলেছ!’

তারপর বৃদ্ধটির একটি প্রশ্ন করার থাকত শিশুটিকে, যেহেতু সে স্কুলে যাবে জ্ঞানার্জনের জন্য। এবার সে প্রশ্নটি করেই ফেলবে,‘আচ্ছা, খোকা, স্কুলে তো যাবে, লেখাপড়া শিখে তুমি কী হতে চাও?’

উত্তর শিশুটির ঠোঁটেই রেডি ছিল। সে জানাবে,‘মা বলে আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো, বাবা বলে ইঞ্জিনিয়ার।’

বৃদ্ধ বলবে,‘সে তো তারা বলবে, এদেশের সব বাবা-মাই বলে থাকে, কিন্তু তোমার কোন ইচ্ছে নাই, খোকা?’

‘না।’ মাথা নেড়ে বলবে শিশুটি।

‘আচ্ছা, তুমি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে কেমন হয়?’ শিশুর প্রতি সম্পূর্ণ নতুন একটা প্রশ্ন রাখে বৃদ্ধ।

শিশুটি এবার জানায়,‘ধুর! প্রধানমন্ত্রী আবার হতে চায় না কি কেউ? প্রধানমন্ত্রী তো আছেই। আমি মায়ের কথা মতো ডাক্তারই হব।’

বৃদ্ধ হয়ত ভাববে, শিশুটির সঙ্গে তার দেখা হয়ে কিংবা কথা হয়ে কোন লাভ হলো কি? অদ্ভুত শিশু! প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা নাই!

চার

প্রসন্ন আর বুনোহাঁস উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে সন্ধান পেল মুকিত সাহেবের পক্ষীশালার। নামগুলো হাজিরা খাতার, সনদপত্রের কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের নয়, একে অপরকে দিয়েছে। প্রসন্ন আর বুনোহাঁস নাম দুটি আর কেউ জানে না। যেদিন থেকে প্রসন্ন বুনোহাঁস নাম ধরে ডাকবে না অথবা বুনোহাঁস প্রসন্ন নাম ধরে ডাকবে না সেদিন থেকে ধরে নিতে হবে কেউ-ই আর ডাকবে না। অর্থাৎ নাম দুটি আর শোনা না গেলে ধরে নিতে হবে সম্পর্ক শেষ। মুকিত সাহেবের পক্ষীশালার এক কোণে বসে দুজনে সেদিন ফ্ল্যাটের প্ল্যান করছিল। তারা আপাতত এই সিদ্ধান্তে আছে, বিয়ে করবে। কিন্তু বিয়ে করার আগে বাসাটা তারা মনের মতো সাজাবে। যাতে সেটা বাস উপযোগী হয়। তারা দুই বেড, এক ডাইনিং আর এক ড্রয়িংরুমের বাসা নেবে। বারান্দা থাকবে দুটি। একটা বেডরুম তাদের জন্য, অন্যটায় শেয়ার করে থাকবে বুনোহাঁসের বৃদ্ধ মা আর প্রসন্নের আগের হাজব্যান্ডের ছেলে ইউ। বৃদ্ধ মায়ের বয়স চৌষট্টি আর ইউয়ের বয়স ছয়। ফলে ফ্ল্যাট সজ্জিতকরণ বিষয়ে তারা চিন্তিত। চিপস খেতে খেতে তারা চিন্তা করছে বিষয়টা নিয়ে। বৃদ্ধ মা আর ইউর কক্ষটা নিয়ে তারা অধিক যতœবান। চিন্তা করতে প্রয়োজনে সময় লাগুক, তবু একটা ভাল ব্যবস্থা হতেই হবে। দরকার পড়লে আরও কয়েক প্যাকেট চিপস অর্ডার করবে। তবুও শিশু ও বৃদ্ধকে নিয়ে চিন্তা চলতে থাকুক।

অন্যদিকে, কুটিরের কেন্দ্রে আরাম কেদারায় মুকিত সাহেব চিন্তিত, সেই ধাঁধাটা নিয়ে। কেউ-ই সমাধান করতে পারছে না।

পাঁচ

কমসংখ্যক বৈদ্যুতিক বাতিই স্থানে স্থানে ছড়ানো। সূর্য ডোবার আগে পাখির খাঁচাগুলোর আশপাশে বাতি জ্বলে ওঠে। মুকিত সাহেবের কুটিরে কোন আলোর ব্যবস্থা নেই। তিনি অন্ধকারে কয়েল জ্বালিয়ে বসে থাকেন আর ঢেঁকুর তোলেন। একটা চায়ের দোকান আছে পক্ষীশালায়। নতুন হয়েছে। বছর তিন আগে মুকিত সাহেবের মাথায় যখন পক্ষীশালার আইডিয়াটা এলো, তিনি তখন চায়ের কথা ভাবতেই পারেননি। পরে অনেকের অনুরোধে চায়ের ব্যবস্থা করেছেন, সঙ্গে প্রয়োজনীয় জিনিসপাতিও আছে। সন্ধ্যার পর দোকানে কুপি জ্বলে, সামান্য আলো দোকানেই থাকে।

প্রসন্ন আর বুনোহাঁসের বৃদ্ধ ও শিশুবিষয়ক চিন্তা-চেতনা শেষ। তারা উঠবে। কিন্তু কুটিরের সামনে দিয়েই তাদের যেতে হবে। যাচ্ছেন এমন সময় তাদের সালাম দিলেন মুকিত সাহেব। এই রীতি নতুন শুরু“করেছেন। সালাম ছাড়া হঠাৎ কাউকে প্রশ্ন করলে মানুষ রেগে যান, অনেকে বুঝতেই পারেন না প্রশ্নটা তাকে করা হয়েছে। প্রসন্ন আর বুনোহাঁস কুটিরের কাছে এলো। যদিও তারা বুঝতে পেরেছে, সালামটা দেয়া হয়েছে কেবলই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। ফলে উত্তর না করেই তারা গেল মুকিত সাহেবের কাছে। সালামের উত্তর না দেয়ায় রাগ করলেন না মুকিত সাহেব। তিনি জানেন, সালামের অনেক রকম অর্থ আছে। তিনি যে ধরনের সালাম দেন, তাতে কাছে আসার আহ্বান থাকে, ভাগ্য ভাল অধিকাংশ দর্শনার্থী তার সালামের অর্থটা ধরতে পারে। তারা কাছে আসতেই মুকিত সাহেব প্রথম প্রশ্নটা করলেন।

‘আপনারা জানেন আমি কী? আমি একজন শিল্পী। কী বিশ্বাস হয় না?’

‘হ্যাঁ, পক্ষীশালার আইডিয়াটা ক্রিয়েটিভই বলতে হয়। আরও অবাক হয়েছি এটা জেনে, সূর্য উঠার পর থেকে খাঁচা সব সময় খোলাই থাকে। পাখিরা আকাশে উড়ে, কিন্তু ঘুরেফিরে আপনার কাছেই আসে। হা হা। অবশ্যই আপনি শিল্পী, বড়মাপের শিল্পী।’ জানায় প্রসন্ন।

মুকিত সাহেব খুব খুশি হন। আরাম কেদারা থেকে শরীর সামনের দিকে উঠিয়ে এবার যথারীতি দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন, ‘আচ্ছা, আপনারা কোন ফ্ল্যাটে না গিয়েই কীভাবে বা কিসের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারবেন যে, ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটগুলো শিশু ও বৃদ্ধদের বাস উপযোগী না। ধরে নেন এটা একটা ধাঁধা।’

প্রশ্নটা প্রসন্ন আর বুনোহাঁসের কাছে বেশ প্রাসঙ্গিক। বুনোহাঁস জানায়, ফ্ল্যাটে না গিয়ে তো বলতে পারব না কীভাবে উপযোগী না। তবে একটা ফ্ল্যাটে কী কী থাকলে তা শিশু ও বৃদ্ধের থাকার উপযোগী হয় তা আমরা জানি। আর এই বিষয়টি নিয়েই বিকাল থেকে এখানে বসে আমরা ভাবছিলাম।’

‘বেশ, বেশ।’ তাদের কথায় বেশ আনন্দিত হন মুকিত সাহেব।

আরও বললেন, ‘আপনারা আমার চিন্তার কাছাকাছি লোক, আরও ঘনিষ্ঠ হন, যদি সময় থাকে খানিক কথা বলি।’

প্রসন্ন আর বুনোহাঁস মুকিত সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী। তিনজনই কুটিরের বাইরে গিয়ে তিনটি চেয়ারে বসল।

তারপর মুকিত সাহেব বলতে শুরু করলেন, ‘দেখুন, আপনারা জানেন কি না? আমি কিন্তু ম্যানেজার ছিলাম। ইয়ে মানে, প্রায় পঁচিশ বছর লেকসিটি কনকর্ড আবাসন প্রকল্পের ম্যানেজার ছিলাম। এই প্রকল্পের প্রতিটি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে আমার হাত দিয়ে। কোন ফ্ল্যাটটি কে ক্রয় করেছেন আমি এখনও বলে দিতে পারি। ওখানকার বেশক’টি বাসার বারান্দায় এখনও আমার পাখির খাঁচা আছে। হয়ত আজ আর একটি পাখিও নেই। এক সময় আর ভাল লাগছিল না চাকরিটা। ম্যানেজারের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েই শুরু“করলাম পক্ষীশালা। জায়গাটা বিশ বছর আগে কিনে রেখেছিলাম।’

প্রসন্ন আর বুনোহাঁস বেশ আগ্রহ নিয়েই শুনছে তাঁর কথা।

আবার শুরু“করেন মুকিত সাহেব, ‘এই ধাঁধাটা আমি কম করে হলেও হাজার দশেক মানুষকে ধরেছি। যারা এখানে নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত দর্শনার্থী হয়ে এসেছেন। কেউ-ই আজ পর্যন্ত ভাঙাতে পারল না। আচ্ছা, বলুন তো আমরা কেন, নিজেদের উপকরণাদি দিয়েই শিশু আর বৃদ্ধের জীবনটা চালিয়ে দিতে চাই। তাদের জীবনটাকে কেন অস্বীকার করি বলতে পারেন? কেন আমরা অপেক্ষা করে থাকি, শিশু তারুণ্যে পৌঁছাবে? আর বৃদ্ধের মধ্যে তারুণ্য খুঁজি? তাহলে কি শিশু আর বৃদ্ধ বয়সের যে ব্যাপারটা আছে, জিনিসটাকে আমরা নিজেদের দিয়েই প্রত্যহ মেপে চলেছি।’

‘হ্যাঁ, আমরা ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই ভাবছিলাম আপনার এখানে বসে বসে।’ জানায় বুনোহাঁস।

‘আর আমরা উত্তরও পেয়ে গেছি, আমরা ঠিক কী করতে চলেছি।’ জানায় প্রসন্ন।

‘আমরা ম্যানেজারি জীবনে আমি কখনই দেখিনি এটা। অথচ আমি দেখেছি প্রত্যেকেরই বাসায় শিশু বা বৃদ্ধ আছে। এমনকি শুরুর দিকে আমি কারও বাসায় না গিয়েও বুঝতে পেরেছি এই ফ্ল্যাটগুলো অবশ্যই শিশু আর বৃদ্ধের বাস উপযোগী না।’

‘আসলে, আমরা দুঃখিত, আপনার ধাঁধার উত্তরটা আমাদের জানা নাই, এটা ভাবতেই পারছি না যে, কীভাবে বাসায় না গিয়ে বলব কার বাসায় কোন বৃদ্ধ বা শিশু উপযুক্ত পরিবেশে আছে কি নাই। আপনি সমাধান দিলে ভাল।’ জানতে চায় প্রসন্ন।

‘হ্যাঁ, আমি অবশ্যই তোমাদের ভাঙিয়ে দেব। আজ দিতেই হবে তোমাদের। আজকেই ভাল সময়। দ্যখো, উত্তরটা খুব সহজ আমার কাছে। আমি ম্যানেজার থাকতে দেখেছি, প্রতিটি বাসায় কি কি মালামাল ডুকছে। কখনই কোন ভ্যানে আমি শিশু কিংবা বৃদ্ধের জন্য আলাদা কোন আসবাব দেখতে পাইনি, শিশুদের আসবাব তো আলাদাই হয়, তাই না? শিশুতোষ আসবাবের গঠন, রং ইত্যাদি আলাদা হওয়ারই কথা, তাদের নিজেদের একটা জগত আছে। কোন ভ্যানেই আমি সেরকম কিছু দেখিনি। এছাড়া কোন ভ্যানেই আমি বৃদ্ধের জন্য একটা আরাম কেদারা দেখতে পাইনি। আমি ভাল করে দেখেছি। ফলে আমি বাসায় না গিয়েও, গেটের কাছে বসেই দেখেছি, কোন ফ্ল্যাটেই শিশু বা বৃদ্ধের স্বচ্ছন্দে বসবাসের মতো উপাদান নাই। তারা ফ্ল্যাটের যুবক বা যুবতীরা যে আসবাব-উপাদান ব্যবহার করে তাই ব্যবহার করে থাকে। যুবক বা যুবতীরা যে চেয়ারে বসে তাতেই বৃদ্ধ ও শিশুরা বসে, তারা যে খাটে ঘুমায় সে রকম খাটেই বৃদ্ধ ও শিশুরা ঘুমায়, এমনকি বেশিরভাগ বাসায় যুবক বা যুবতীর টেবিলই শিশুদের টেবিল।’

এবার আরও আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন মুকিত সাহেব। তিনি আরও বললেন, ‘আমার ছোট ভাই ট্রাফিক পুলিশ, বিষয়টা যেবার প্রথম আমার নজরে এলো, আমি তাকে নোটিশ করি, যাতে সেও রাস্তার ভ্যানগুলোতে চোখ রাখে, যে ভ্যানগুলো বাসা বদলে জিনিসপত্র পরিবহনে ব্যবহƒত হয়। আশ্চর্যজনকভাবে আমার ভাইটিও শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য ভ্যানে কিছু দেখেনি। সবই বৃদ্ধের সন্তান আর শিশুর বাবা-মায়ের ব্যবহারের জন্য নতুন কোন ফ্ল্যাটে যাচ্ছে।’

ধাঁধার উত্তর এ রকম হতে পারে মাথাতেই আসেনি প্রসন্ন ও বুনোহাঁসের। তবে সংসার শুরুর আগেই বিষয়টি নিয়ে তারা অনেক ভেবেছেন এবং সচেতন। তারা মুকিত সাহেবকে কথা দেয়, তাদের বাসায় অবশ্যই শিশু ও বৃদ্ধের জন্য আলাদা দুটি কক্ষ না থাকলেও একটি কক্ষের দুই পাশে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাই রাখবে তারা।

তাদেরসহ শিশু ও বৃদ্ধের বাস উপযোগী একটি ফ্ল্যাটই গড়ে তুলবেন তারা।

শিশু শিশুর মতো থাকবে, যুবক যুবকের মতো আর বৃদ্ধ বৃদ্ধের মতো। কেউ কারও মতো বাস করবে না গৃহে।

শিশু বর্ণিল কল্পরাজ্যে ঘুরবে, বৃদ্ধ আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে নিজ মগে চা-কফি খাবে, যুবক-যুবতী একটি সম্পূর্ণ নিজ বালিশে ঘুমাবেÑ একই ফ্ল্যাটে।

ছয়

বনলতার বৃদ্ধের সঙ্গে সুরঞ্জনার শিশুর সামনা-সামনি কথা হতে খুব বেশিদিন বাকি নাই।

এবার থেকে শিশু বড় হয়ে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হতে চাইবে!