২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাত্রী ॥ এক অসুখীর যাত্রা

  • বিধান রিবেরু“

মিকেল্যাঞ্জেলো আন্তোনিওনির বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য প্যাসেঞ্জার’ এ বছর পূরণ করল ৪০ বছর। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিকে এখন বলা হয় কোন ইতালীয় পরিচালকের নির্মিত মাস্টারপিস কাজের একটি। এই ছবিটি নিয়ে অনেক সমালোচকই লিখেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে থিয়োডর প্রাইসের লেখা সমালোচনাটি।

সমালোচনায় প্রবেশের আগে ছবির কাহিনী সংক্ষেপে বলি- ডেভিড লক নামের এক ব্রিটিশ-মার্কিন সাংবাদিক, তিনি চাঁদে গেছেন বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সেখানকার রাজনীতি নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে। সাহারা মরুভূমিতে ঘুরে ঘুরে এই সাংবাদিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের খবর সংগ্রহে ব্যর্থ হন। বিফল হয়ে তিনি হোটেলে ফিরে দেখতে পান, পাশের কামড়ায় ওঠা এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী অজ্ঞাত কারণে মারা গেছেন। তার নাম রবার্টসন, মজার ব্যাপার ব্যবসায়ী রবার্টের চেহারা দেখতে অনেকটা তারই মতো।

পারিবারিক জীবনে অসুখী সাংবাদিক ডেভিড চিন্তা করলেন, নিজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে দিলে কেমন হয়? ডেভিড জানে, তার স্ত্রীর রয়েছে একজন প্রেমিক। বোধহয় সে কারণেই নিজের জীবন থেকে রেহাই চাচ্ছিলেন ডেভিড। বেছে নিতে চাইছিলেন অন্যের জীবন। সে মৃত রবার্টকে নিজের কক্ষে রেখে, পাসপোর্টের ছবি পাল্টে, রবার্টকে বানিয়ে দিলেন মৃত সাংবাদিক ডেভিড। আর তিনি নিজে বনে গেলেন ব্যবসায়ী। কিন্তু ডেভিড পরে বুঝতে পারেন রবার্ট ছিল অস্ত্র ব্যবসায়ী। আফ্রিকার বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্রের চালান দিতেন রবার্ট।

নিজের অভ্যস্ত জীবন থেকে পালাতে পালাতে বার্সেলোনায় এসে একপর্যায়ে ডেভিডের সঙ্গে দেখা হয় স্থাপত্যবিদ্যার এক ছাত্রীর, তার নাম দর্শক জানতে পারে না। এই অজ্ঞাত মেয়েটি প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ডেভিডের সঙ্গে। ওদিকে ডেভিডের স্ত্রী র‌্যাচেল বুঝতে পারে কোন একটা গণ্ডগোল হয়েছে। কারণ যখন মৃত স্বামীর জিনিসপত্র তার কাছে আসে, তখন সে দেখতে পায় পাসপোর্টের ছবিতে ডেভিডের ছবি নেই, রয়েছে অন্য কারও ছবি। র‌্যাচেল চেষ্টা করতে থাকে, ওই ‘রবার্ট’কে খুঁজে বের করতে, কারণ চাঁদের হোটেলে স্বামীর পাশের কামড়াতেই ছিলেন রবার্ট। এই রবার্টকে খুঁজে পেলেই স্বামীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা যাবে। র‌্যাচেল সাহায্য চায় চাঁদ দূতাবাসের কাছে। রবার্ট যে অস্ত্র ব্যবসায়ী, সেটা র‌্যাচেলকে জানায় চাঁদ সরকার এবং তারা যৌথভাবেই রবার্টরূপী সাংবাদিক ডেভিডকে খুঁজতে শুরু“করে। আসল রবার্ট তো মরে ভূত। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না সাংবাদিক ডেভিডের। কারণ আসলে তিনি যেই হন না কেন, কাগজে কলমে তিনি রবার্ট, এবং রবার্ট একজন অপরাধী। তাই শেষ পর্যন্ত আর পালিয়ে বাঁচা হয় না ডেভিডের, মৃত্যুকেই বরণ করতে হয়, অবশ্য এও এক মুক্তি, অনন্ত মুক্তি। নকল রবার্টকে, মানে সাংবাদিক ডেভিডকে চাদ সরকারের গোপন এজেন্টরা স্পেনেরই এক হোটেলে খুন করে। তাদের কাছে এই ব্যক্তি তো অস্ত্র ব্যবসায়ী!

হোটেল থেকে মৃত ‘রবার্ট’কে উদ্ধার করে পুলিশ। শেষ দৃশ্যে স্ত্রী র‌্যাচেলকে পুলিশ জিজ্ঞেস করে, আপনি কি এই লোকটিকে চেনেন? র‌্যাচেল সময় নষ্ট না করে বলে দেয়, সে এই লোককে আগে কখনোই দেখেনি। মানে পুলিশের সামনে নিজের স্বামীকে অস্বীকার করে সে। স্বীকার করলেই তো পুলিশি ঝামেলা! অন্যদিকে অজ্ঞাত প্রেমিকা ঠিকই স্বীকার করে, সে চেনে এই মৃত ব্যক্তিকে। কমবয়সী এই প্রেমিকা জানতো ডেভিড পালাতে চাইছে বাস্তবতা থেকে। এমনকি সে এও জানতো ডেভিড পরিচয় লুকিয়েছে, ‘রবার্ট’ তার ছদ্মনাম। তারপরও সে তাকে ভালোবেসে ফেলে। একা ফেলে যেতে পারে না। এই হচ্ছে সংক্ষেপে সিনেমার কাহিনী।

এবার আসি সমালোচনা প্রসঙ্গে। দ্য প্যাসেঞ্জার ছবির নাম থেকে অনেকেই প্রশ্ন করেন এই ছবির যাত্রী আসলে কে? জবাবে অনেকে বলেন, ওই মেয়েটি, যে নিষ্ক্রিয়ভাবে ছবিতে থেকেছে এবং ডেভিডের গতিপ্রকৃতি দিয়ে তার গন্তব্য নির্দিষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন মার্কিন এ্যাকাডেমিক থিয়োডর প্রাইস। ‘দ্য পলিটিকাল এ্যান্ড রেলিজিয়াস মিনিং অব আন্তোনিওনি’স দ্য প্যাসেঞ্জার’১ শীর্ষক প্রবন্ধে দ্বিমত পোষণ করেন প্রাইস। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ওই প্রবন্ধে প্রাইস বলেন, এই ছবিতে যাত্রী হলেন সাংবাদিক ডেভিড নিজেই। তার নিয়তিই তাকে পরিচালিত করেছে।

এই ছবিকে অনেকে রহস্যে ঘেরা, বিমূর্ত বলে আখ্যা দিলেও প্রাইস মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে এই ছবি খুবই স্পষ্ট ও দৃঢ় বক্তব্য পেশ করেছে। আন্তোনিওনি নিজে এই ছবি শুট করার আগে চীনের সমাজতন্ত্র নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন। যা এই ছবিতে ডেভিডের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ চেষ্টার সঙ্গে মিলে যায়।

প্রাইসের ভাষ্য অনুযায়ী কিছু বিষয় সমালোচকরা যদি এই ছবিটি প্রসঙ্গে না বলেন, তাহলে তারা আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছেন। সেগুলোর মধ্যে আন্তোনিওনির চীনা সমাজতন্ত্র নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘চুং কুয়ো চিনা’ (১৯৭২) একটি, দ্য প্যাসেঞ্জার নিয়ে কথা বললে আন্তোনিওনির এ বিষয়টি উল্লেখ করতেই হবে।

স্প্যানিশ স্থাপত্যবিদ গাউদি সম্পর্কে যদি সমালোচক নিশ্চুপ থাকেন, তাহলেও তিনি আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছেন। কারণ এই ছবিতে গাউদির কাজকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং এটি চলচ্চিত্রের মূল থিমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আর সমালোচক যদি আফ্রিকার দেশ চাঁদের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ না করেন, সেক্ষেত্রেও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে দ্য প্যাসেঞ্জার ছবির আলোচনা।

এই ছবিতে নিজেকে মৃত ঘোষণা করে মুক্তির পথ খোঁজার যে চেষ্টা আমাদের চোখে পড়ে সেটির সঙ্গে লেনিনের বিপ্লবী চিন্তার তত্ত্বগত যে মিল সেটিকেও মিলিয়ে দেখতে হবে। সমালোচক আপনাকে বোকা বানাচ্ছে কি না সেটা খতিয়ে দেখতে থিয়োডর প্রাইসের শেষ পরামর্শ হলো : সমালোচনা পড়ে দেখুন ছবিটির নাম কেন ‘যাত্রী’ রাখা হয়েছে সেই ব্যাখ্যা আছে কি না।

প্রাইসের প্রস্তাবে কমবয়সী মেয়েটি যেন গার্ডিয়ান এ্যাঞ্জেল, ডেভিডের যখন পুরনো জীবনে ফিরে যেতে মন চাইছে না তখন সেই পথপ্রদর্শক ফেরেশতা যেন কানে কানে তাকে বলে- এই দুনিয়া যেমন, তেমনটা যদি তোমার পছন্দ না হয়, যদি এই জগৎ ভয়ানক বোধ হয়, তাহলে এসব বিপ্লব ক্যামেরাবন্দী করা বন্ধ কর, নিজেই বিপ্লব শুরু“কর। বিপ্লবের ইংরাজী জবাড়ষঁঃরড়হ, এই শব্দটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জবাড়ষাব বা ঘোরার সঙ্গে। রিভলভিং চেয়ারের কথা তো আমরা সকলেই জানি। তো ডেভিড নিজের জীবনকে তো ঘোরাতেই চেয়েছিল। ঠিক যেমনটি বাস্তবে চেয়েছিলেন স্থাপত্যবিদ আন্তোনিও গাউদি। স্পেনের এই বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যবিদ মনে করতেন, জীবনে অর্থ প্রদান করতে হলে আপনার নিজেকে যুক্ত করতে হবে, যা বিশ্বাস করেন সেই বিশ্বাসের জন্য আপনার সম্পূর্ণ সত্তাকেই বাজিতে লাগিয়ে দিতে হবে, শুধু পর্যবেক্ষক হলে হবে না। ছবিতে যখন ডেভিড মেয়েটিকে প্রশ্ন করেন, গাউদি কি পাগল ছিলেন? তখন মেয়েটি উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, তুমি কি মনে কর? ডেভিড প্রত্যুত্তরে বলেন, না, উনি পাগল ছিলেন না।

বোঝাই যাচ্ছে, গাউদির জীবন দর্শনকে গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করেছিলেন এই সাংবাদিক। আর তাই তিনি নিজের জীবনকে ঠেলে দিয়েছিলেন ঝুঁকির মুখে, ঘোরাতে চেয়েছিলেন নিজের জীবনের গতিমুখ। কিন্তু সবকিছু তো তার হাতে নেই। সবকিছু মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পরিচিত জীবন থেকে পালিয়ে, অন্য যে জীবনে যেতে চেয়েছিলেন ডেভিড তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।

সলিল চৌধুরীর একটি গানের কথা মনে পরে যাচ্ছে- ‘এই রোকো/পৃথিবীর গাড়িটা থামাও/ আমি নেমে যাব/আমার টিকেট কাটা অনেক দূরে/এ গাড়ি যাবে না/আমি অন্য গাড়ি নেব।’ ডেভিড কি এমন করেই গাড়ি থেকে নেমে যেতে চেয়েছিল? চাইলেই কি পারা যায়? সেটা যে যায় না, তা তো শেষ পরিণতিতেই প্রকাশিত। তাই থিয়োডর প্রাইসের পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে আমিও বলছি, ডেভিড এই পৃথিবী নামের গাড়িটার যাত্রী। তিনি হয় তো বুঝতে পারেননি, গাড়িতে থেকেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, বাস্তবতা থেকে পালানোর কোন জায়গা নেই। ডেভিডও পালাতে পারেননি।

দ্য প্যাসেঞ্জার ছবিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জ্যাক নিকলসন ও মারিয়া স্নেইদের। নিকলসন অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ আমেরিকান সাংবাদিক ডেভিড লকের ভূমিকায়, আর মারিয়া অভিনয় করেছেন স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রীর চরিত্রে। ইউরোপে এই ছবি পরিচিত ‘প্রফেশন : রিপোর্টার’ নামে।