২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গীমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে যুক্তরাষ্ট্র কতখানি আন্তরিক

  • এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার

এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে চতুর্থ যৌথ নিরাপত্তা সংলাপ ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কর্মকর্তাসহ ছয় সদস্যবিশিষ্ট দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপাক্ষিক) মিজানুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের রাজনৈতিক-সামরিক ব্যুরোর প্রিন্সিপাল ডেপুটি এ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি টড সি চ্যাপম্যান। বৈঠকের ফলাফল বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু পত্রিকায় আসেনি। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রথাগত ও অপ্রথাগত নিরাপত্তা, জঙ্গী সন্ত্রাস দমন, সামরিক সহযোগিতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে ব্যাপকভিক্তিক আলোচনা হয় বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ মাসেই পর্যায়ক্রমে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রী। তাছাড়া এ মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালীন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা সম্মেলনে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। উপরন্তু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এবার শেখ হাসিনার দিকে সকলের অতিরিক্ত আগ্রহ থাকবে। কারণ, পরিবেশ বিষয়ে সবুজ নোবেল হিসেবে পরিচিত জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেলেন এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যা সবেমাত্র ঘোষিত হলো। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব এখন চারটি কাঠামোর ওপর দ-ায়মান। যথা, অংশীদারি সংলাপ, নিরাপত্তা সংলাপ, সামরিক সংলাপ এবং টিক্্ফা (ট্রেড এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন এ্যাগ্রিমেন্ট)। এই কাঠামোগুলোর আওতায় বাংলাদেশের প্রায় সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সহযোগিতা ও সরঞ্জামাদি সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ নেভীর কমান্ডো বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সবচাইতে বড় জাহাজ সমুদ্র বিজয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তাছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দুই দেশের আদান-প্রদান অব্যাহত আছে। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্বের পরিধি ছোট নয়।

২০১০ সালে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন সামরিক নীতির আওতায় ২০২০ সালের মধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমরশক্তির ষাট ভাগ মোতায়েন করবে, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থান ও ভষ্যিতের একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন অন্যতম একটি ফ্রন্টলাইন স্টেট। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে কারণে, ঠিক একই কারণে চীনের কাছেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিকট প্রতিবেশী হওয়ায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মাত্রা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা আছে এবং থাকবে। আর সঙ্গত কারণেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন কোন ক্ষেত্রে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ডাইমেনশনের ভেতরে পড়লেও বাস্তবতার নিরিখে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ডাইমেনশন আরও অনেক বড় ও আলাদা। বৃহত্তম প্রতিবেশী তো আছেই। তাছাড়া ভারতের মূল ভূখ- এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি ভাইটাল রাজ্যের মাঝখানে বাংলাদেশ অবস্থিত। এছাড়া ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিকভাবে বিশাল মিল ও সংযোগ থাকার কারণে ভারত-বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যদিকে চীনের বেলায় কথা হলো তারা নিকট প্রতিবেশী এবং বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি ও বিনিয়োগের বিশাল সক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার এখন চীন। মেরিটাইম সিল্করুট স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নে চীনের জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা অপরিহার্য। সুতরাং বাংলাদেশকে ঘিরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্ট্র্যাটেজিক রাজনৈতিক স্বার্থ কখনও দ্বিমুখী, আবার কখনও ত্রিমুখী দ্বন্দ্বাত্মক হয়ে ওঠে, যাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। জামায়াত, ইসলামী ঐক্য জোট, হেফাজত প্রভৃতি উগ্রবাদী ধর্মান্ধ ইসলামিস্ট দল ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হওয়ায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ভয়ঙ্কর হুমকির মধ্যে পড়েছিল। সুতরাং, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রীয় পরিবেশ ভারতের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।

অন্যদিকে গত পাঁচ বছর, ২০১০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যে তৎপরতা বাংলাদেশকে ঘিরে দেখেছি তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই জায়গায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিপরীতমুখী। সে কারণেই আজ প্রশ্ন উঠেছে আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গীমুুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চায়, নাকি স্ট্র্যাটেজিক ও কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ্ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, সোমালিয়ার মতো কোন কৌশল অবলম্বন করতে চায়? এই প্রশ্নটি কেন উঠছে তার দুয়েকটি উদাহরণ দিই। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য আজ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় হুমকি উগ্রবাদী ইসলামিস্ট জঙ্গী গোষ্ঠী, আইএস, আল কায়েদা এবং এদের অনুসারী বা এদের মন্ত্রে ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ স্থানীয় জঙ্গী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। প্রায় ৮৫-৯০ ভাগ সুন্নি মুসলমানের দেশ, তারপর জঙ্গীদের মাতৃ রাজনৈতিক দল জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, হেফাজতÑ এরা সব বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ এবং মিত্র হওয়া সত্ত্বেও গত পাঁচ-ছয় বছর উগ্র জঙ্গী সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে তা অসামান্য এবং বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রও আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রশংসা করেছে এবং স্বীকৃতি দিয়েছে। এতদসত্ত্বেও গত ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনের প্রাক্কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের রাষ্ট্রদূতের মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতায় মনে হয়েছে তারা জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতের নেতারা যে জোটে আছে সেই জোটকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায়। এই জোট ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে তৎকালীন সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার কারণে দেশব্যাপী ব্যাপক মাত্রায় জঙ্গী উত্থান ও গ্রেনেড-বোমা হামলার তা-ব সম্পর্কে নতুন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। বিশ্বের নামকরা জার্নাল ও পত্রিকা Ñফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণসহ ভয়ঙ্কর সব প্রতিবেদন ছাপে। বাংলাদেশের যে কোন মানুষের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সিআইএ বেশি জানে যে, বাংলাদেশের সব জঙ্গী সন্ত্রাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে জামায়াতের ভেতরে। আর জঙ্গী তৈরি ও সরবরাহের কারখানা হিসেবে কাজ করছে ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালের শুরুতে ছাত্রশিবিরকে বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াত, আবার কখনও জামায়াত-বিএনপি মিলে ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালে যে মাত্রায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে সেগুলো বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। একটা সার্বভৌম দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দ-ে দ-িত জামায়াত নেতার দ- মওকুফের অনুরোধ জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। ইউরোপের না হয় একটা অজুহাত আছে, তাদের দেশগুলোতে সাজা হিসেবে ফাঁসির দ- নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তো এখনও মৃত্যুদ- সাজা হিসেবে বহাল আছে। এই মাত্র কয়েক বছর আগে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝোলাতে ইরাকের পুতুল সরকারকে তারা নিষেধ নয়, বরং উৎসাহিত ও চাপ প্রয়োগ করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে, অথচ বাংলাদেশে জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাতৃ রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, তবে বেশি উদাহরণ দেয়া যাবে না, কলামের স্পেস স্বল্পতার কারণে। দুয়েকটি উদাহরণ দিই, যার মধ্য দিয়ে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে।

২০০১ সালে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ৫০ বছরের রিজার্ভ নিশ্চিত না করে বাংলাদেশের গ্যাস ভারত বা অন্য কোন দেশে রফতানি করা হবে না। তারপর ২০০১ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় কূটনীতিকদের টুইসডে ক্লাব ও ভারতের দক্ষিণ ব্লকের সম্মিলিত তৎপরতায় আওয়ামী লীগ কিভাবে শোচনীয় পরাজয়বরণ করেছিল তা এখন ইতিহাসের অংশ। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির মাধ্যমে ভারতে গ্যাস রফতানির জন্য কম চেষ্টা করেনি। তার প্রমাণ ২০০১ সালে তারা ক্ষমতায় এলে নতুন সরকারের প্রথম কেবিনেট সভা শেষে ভারতে গ্যাস রফতানি সম্পর্কিত সাংবাদিকদের প্রশ্নেœর জবাবে বিএনপির অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান বলেছিলেন, ‘মাটির নিচে গ্যাস রেখে কি হবে?’ কিন্তু শেষ বিচারে বিএনপি ভারতে গ্যাস বিক্রি করতে পারেনি। কেন পারেনি সে কাহিনী লম্বা ও ভিন্ন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আল কায়েদা কর্তৃক টুইন টাওয়ার ধ্বংসযজ্ঞ এক দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত শয়তান (জর্জ বুশের ঘোষণা অনুযায়ী ইরাক, ইরান ও উত্তর কোরিয়া হলো শয়তানের অক্ষশক্তি) ইরানকে দুই পাশ থেকে স্যান্ডউইচ চাপে ফেলার জন্য ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করার পরপর ২০০৩ সালে সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাতে ইরাক দখল করে নেয়। বিশ্বের তাবত বিশ্লেষক এ ব্যাপারে একমত যে, ইরাকে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় থাকলে আজ সেখানে কিছুতেই আইএস, আল কায়েদা ঘাঁটি গাড়তে পারত না। একইভাবে সিরিয়ার আসাদকে উৎখাতের জন্য আমেরিকা সশস্ত্র জঙ্গীদের সরাসরি সব ধরনের সহযোগিতা না দিলে ইরাক-সিরিয়া মিলে আজ তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস সৃষ্টি হতো না। গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে সোমালিয়ার বামপন্থী নেতা ফারাহ আইদিদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীতে সোমালিয়ায় জন্ম নেয় দুর্ধর্ষ জঙ্গী সংগঠন আল শাবাব বাহিনী, যার অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি হয় নাইজিরিয়ার বোকো হারাম। এই দুই জঙ্গী সংগঠন এখন আইএস-আল কায়েদার সহযোগী। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই শাবাব বাহিনী ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে একই দিনে একযোগে তানজানিয়া ও কেনিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা চালায়, নিহত হয় কয়েক শ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জঙ্গী উত্থানের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্ট্র্যাটেজিক, রাজনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থরক্ষায় জঙ্গী সন্ত্রাসসহ সব কিছুকে উপেক্ষা করতে পারে। এমনও দেখা গেছে, নিজেদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের জীবন অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বলি দিয়েছে রাজনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবিন রাফায়েল তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক প্লেন ক্রাশে নিহত হন। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় ওই প্লেন ক্রাশের পিছনে সিআইএ-এর হাত ছিল। একই প্লেনে ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবিন রাফায়েল। আফগানিস্তান ও ইরাকের ঘটনায় প্রমাণ হয় প্রথম লক্ষ্য অর্থাৎ রাজনৈতিক-কর্পোরেট স্বার্থের লক্ষ্য অর্জিত হলে তারপর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হওয়া জঙ্গী দমনের জন্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে লিপ্ত হতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধা করে না। এতে তাদের লাভ-লোকসান দুটোই আছে। তবে লাভ বেশি। রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রাপ্তি হিসেবে যোগ হয় অস্ত্র ব্যবসার স্বার্থ। ২০০১ সালে বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন আমরা জানি। তখন আমাদের গ্যাস ছাড়া অন্য কোন সম্পদ দৃশ্যমান ছিল না । এখন আঞ্চলিক কানেকটিভিটির কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর আগামীতে হবে সোনার খনি। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় যে অভাবনীয় সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো সকল পরাশক্তির কাছেই লোভনীয়। বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে আপোস করেননি। আর বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাও যে আপোস করবেন না তার প্রমাণ ২০০১ সালে একবার পাওয়া গেছে। বাহ্যিকভাবে সন্ত্রাস দমনের সফলতায় বাংলাদেশের প্রশংসা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্র যদি জঙ্গীমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চায় তাহলে সর্বক্ষেত্রেই তার আন্তরিক প্রতিফলন থাকতে হবে।

লেখক : ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

নির্বাচিত সংবাদ