১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাড়ছে শিশু হত্যা ॥ দেড় বছরে খুন ৫শ’

বাড়ছে শিশু হত্যা ॥ দেড় বছরে খুন ৫শ’
  • বাবা-মায়ের কোলও এখন আর নিরাপদ নয়;###;বেড়েছে ধর্ষণ অপহরণ নির্যাতন

শর্মী চক্রবর্তী ॥ শিশুরা হচ্ছে ফুলের মতো কোমল। তাদের দেহ-মন স্বচ্ছ ও পবিত্র। এই কোমলমতি শিশুদের শুধু ভালবাসা যায়। আজকে যারা শিশু তারা আগামী দিনের ভবিষ্যত। দেশ ও জাতির উন্নয়নে এই শিশুরাই একদিন বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনায় এই ধারণা পাল্টে যাচ্ছে অনেকের। এখন সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে শিশুরা। দিনের পর দিন এই নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েই চলছে। শিশুদের প্রতি এমন নির্মমতা চোখে পড়ার মতো। ঘরে বাইরে সর্বত্র এখন শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। এমনকি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান বাবা-মায়ের কাছেও তারা নিরাপদ নয়। বাবা-মায়ের নির্মমতার শিকার হয়েও শিশুদের এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই কোন কোন জায়গায় শিশুরা শিকার হচ্ছে এমন নির্মমতার, যা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে সবার মধ্যে। বর্তমান যে দৃশ্য তা গত কয়েক বছরেও ছিল না। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ শিশু ফোরাম তাদের এক জরিপে দেখেছে, গত দেড় বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’ শিশু হত্যা করা হয়েছে। শুধু শিশু হত্যাই নয়, বেড়েছে শিশু ধর্ষণ, শিশু অপহরণ ও শিশু নির্যাতন। অথচ অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের বিচার না হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বায়নের ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব ও পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতার কারণে শিশু হত্যা ও নির্যাতন বেড়েই চলছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।

গত বছরের ২৯ নবেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর ভাটারার সোলমাইদ উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ফারজানা আক্তার লিজার বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার আগের দিন দোকানে ছবি আঁকার রং-পেন্সিল কিনতে গিয়ে আর ফেরেনি লিজা। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ধর্ষণের পর নির্মম নির্যাতনে হত্যা করা হয়েছে ৯ বছরের লিজাকে। জড়িত সন্দেহে লিজাদের ভাড়া বাসার মালিক রেজাউল করিমের ছেলে সৌরভকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী আব্দুস সালামকে।

মামলাটির তদন্ত থানা পুলিশের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে যায়। গ্রেফতার করা হয় সৌরভের এক বন্ধু ও এক খালাত ভাইকে। তবে আট মাসে একে একে সব আসামিই জামিনে ছাড়া পেয়েছে। শিশু লিজার বাবা, প্রাইভেটকারচালক ফারুক হোসেন হতাশা ভরা কণ্ঠে বলেন, এমনভাবে আমার বাচ্চাটারে মারল, তার বিচার মনে হয় পাবই না! শিশু লিজার মতোই নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারাচ্ছে কোমলমতি অনেক শিশু। তবে বিচারের আওতায় আসছে না সেসব অপরাধী। একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। এমন কারণেই শিশু হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অপহরণের মতো অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করছেন অপরাধ, সমাজ ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি সিলেটে নির্মম নির্যাতনে সামিউল আলম রাজন হত্যার ভিডিওচিত্র দেশবাসীর মনে গভীর দাগ কেটেছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর খিলক্ষেতে নাজিম উদ্দিন নামে আরেক শিশুকে একই কায়দায় হত্যার খবর প্রচার পায়। খুলনায় শিশু রাকিবের পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। অন্যদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্যুটকেসের ভেতরে পাওয়া যায় অজ্ঞাত পরিচয় আরেক শিশুর লাশ। বরগুনার তালতলীতে রবিউল আউয়াল নামে আরেক শিশুকে চোখ উপড়ে, কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নির্মম এসব হত্যাকা- দেখে উদ্বিগ্ন গোটা দেশ।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য মতে, ২০১২ সালে হত্যাকা-ের শিকার হয় ২০৯ শিশু। এ সময় হত্যাচেষ্টা করা হয় আরও পাঁচজনকে। ২০১৩ সালে হত্যা করা হয় ২১৮ শিশুকে এবং হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৮ শিশুকে। ২০১৪ সালে দেশে ৩৫০ শিশু হত্যাকা-ের শিকার হয়। এ সময় আরও ১৩ শিশুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ২৭১ শিশুকে। এ সময় হত্যার চেষ্টা করা হয় আরও ১১ জনকে।

বিএসএএফ সূত্র জানায়, চলতি বছরের আট মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৪৮ শিশু। ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬২। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ শিশুকে। এই সময়ে অপহৃত হয়েছে ১৮১ শিশু। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ শিশুকে।

বিএসএএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অপহৃত হয় ১১৮ শিশু, যার মধ্যে ৫০ জনকে মেরে ফেলা হয়। ৬৬ শিশুকে অপহরণের পর উদ্ধার করা হয়। ২০১৩ সালে ৪২ শিশু অপহরণের শিকার হয়, যার মধ্যে মেরে ফেলা হয় ১৩ জনকে। এর আগে ২০১২ সালে ৬৭ শিশু অপহৃত হয়েছিল।

ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতন করে শিশু হত্যার পাশাপাশি দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে পারিবারিকভাবেও হত্যার শিকার হচ্ছে শিশুরা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই হত্যাকা-গুলো সংঘটিত হয়েছে শিশুদের বাবা-মায়ের দ্বারা। পরিবারে মা বাবাই কখনও কখনও হয়ে উঠছেন চরম অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ। তারা নিজ হাতে হত্যা করেছেন তাদের সন্তানকে। বর্তমানে শুধু নির্যাতন নয়, শিশু খুনের দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন মা-বাবা। গত আট মাসে সারাদেশে খুনের শিকার হয়েছে ২১০ শিশু। এর মধ্যে ৩১ শিশুর প্রাণ গেছে মা-বাবারই হাতে। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

গত ৪ আগস্ট চাঁদপুরের ঘটনা। সাড়ে তিন বছরের শিশু সুমাইয়া আক্তার। বাবা-মা সেই শিশুটিকে অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে গিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই পাষ- মা-বাবা হলো আমেনা বেগম (৩৫) ও এমরান হোসেন (৪০)। ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য কবিরাজি করে টাকা আয় করার জন্য নিজের সন্তানকে হত্যা করে সেই বাবা-মা।

দরিদ্র পরিবার। কোন আয় রোজগার নেই। তাই এলাকার কয়েকটি এনজিও থেকে সুমাইয়ার মা আমেনা বেগম ১ লাখ টাকার ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। তবে কোন কাজ করে সেই ঋণের টাকা পরিশোধে করতে পারেনি তারা। তখন সেই পাষ- মা আমেনা বেগম ও বাবা এমরান হোসেন দু’জনে মিলে ফন্দি করেন কবিরাজির মাধ্যমে টাকা আয় করার। এরই ধারাবাহিকতায় আমেনা বেগমের জিন আছর হয়েছে এবং সে অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করেছে বলে এলাকায় প্রচার করে। আর তার প্রমাণ হিসেবে বলা হয়- শিশুকে পেটালেও সে কান্নাকাটি করবে না। তাই তার গর্ভজাত সাড়ে ৩ বছরের শিশু কন্যা সুমাইয়াকে লাঠিপেটা করে লোকজনকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা শুরু করে। এতে কয়েক রোগীকে ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, তাবিজ-কবজ দিয়ে টাকা আদায়ও শুরু করেন তারা। মা-বাবা দুজনে মিলে শিশু কন্যাকে লাঠি দিয়ে পেটায়। এমনভাবে টানা ৬ দিন ধরে চলে নির্মম নির্যাতন। এর ফলে শিশু সুমাইয়া গত ৪ আগস্ট মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এছাড়া মাত্র ২৫ দিনের শিশু সন্তানকে ৭ তলার ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করে এক পাষ- বাবা। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ জুলাই সাভারে। শিশুটি জন্মের পর থেকে মারাত্মক অসুস্থ ছিল। শিশুর মা ছিল বাকপ্রতিবন্ধী। সন্তানটিও হয়ত প্রতিবন্ধী হবে- এমন আশঙ্কা অথবা মানসিক বিকার থেকে নিজের সন্তানকে হত্যা করে এই পাষ- পিতা। সেই পাষ- পিতার নাম ফজলুল হক। পুলিশের কাছে তিনি এ হত্যার কথা শিকার করেছেন।

মৃতপ্রায় শিশুটিকে চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করা হয় সাভারের এনাম মেডিক্যাল হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল পরদিন। তবে চিকিৎসার টাকা যোগাড় হয়নি অজুহাত তুলে আরও একদিন হাসপাতালে অবস্থান করেন ফজলু। আর সেই রাতেই শিশুটিকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা আঁটে। সেই পরিকল্পনা থেকেই সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৭ তলার একটি কেবিন থেকে ছুড়ে ফেলে শিশুটিকে খুন করে।

স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, ভাবছিলাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতে ও এমনিতেই মারা যাবে। কিন্তু মরল না। বরং ডাক্তারদের সেবায় অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠল। তাই বাচ্চারে হাসপাতাল থেকে যাওয়ার আগে আপদ বিদায় করার পরিকল্পনা করি।

ফজলুল হক পেশায় গাড়িচালক। তার স্ত্রী নুরুন্নাহার বাকপ্রতিবন্ধী। তিন বছর আগে ফজলুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় সাভারের জামসিং মহল্লার নুরুল ইসলামের মেয়ে নুরুন্নাহারের (২৫)। ফজলুর শ্বশুর মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী বলে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে জামাইকে গাড়ি কিনে দেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন ফজলু। সংসারে আল আমীন নামে এক বছরের আরেকটি সন্তান রয়েছে।

বিএসএএফের পরিচালক আব্দুস শহীদ মাহমুদ বলেন, ‘শিশুদের অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ, গণপিটুনি প্রভৃতি অপরাধমূলক ঘটনা পরিসংখ্যানগতভাবে বেড়েই চলছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কেউ তাদের রক্ষা করতে পারছে না। এছাড়া অপরাধীরা প্রভাব কাটিয়ে আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে বের হয়ে আসে। বিচার হয় না সেই অপরাধীদের। তখন অপরাধীরা ভাবে অন্যায় করলে তারা সাজা পাবে না। তাই আবার একই অন্যায় করে থাকে। এসব কারণে উদ্বেগজনক হারে শিশু হত্যা বেড়ে যাচ্ছে। যদি এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হয় তাহলে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাড়াতে হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আকাশ সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজ ও পরিবারে। মাদকের প্রভাবও রয়েছে শিশু হত্যার মতো ঘটনার পেছনে। বিদেশী সিনেমা ও নাটকে অনৈতিক সম্পর্ক, বেপরোয়া জীবন আচার এবং শিশু হত্যার ঘটনা দেখানো হচ্ছে হরহামেশা। অথচ এ ধরনের সংস্কৃতি দেশের সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পারিবারিক অশান্তি ব্যাপক হারে বাড়ছে, যার শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোথাও ‘বাধা’ সরাতে বা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে কোমলমতি শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। কোথাও চলছে চরম নির্যাতন। অনেক শিশুই এখন বেড়ে উঠছে অস্বাভাবিক পরিবেশে।