২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক ॥ পবিত্র মাহে জিলহজের আজ পঞ্চম দিবস। আর কদিন পরই মক্কা শহরজুড়ে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। যে কোন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জন্য হজ অনুষ্ঠানমালার সৌন্দর্য বিমোহিত করার মতো। হজ ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম। হজের আভিধানিক অর্থ সঙ্কল্প করা। পারিভাষিক অর্থে হজের মাসে নির্ধারিত দিনে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বায়তুল্লাহ্ শরীফ ও সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ জিয়ারত ও বিশেষ কার্যাদি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করাকে হজ বলা হয়।

হজ একান্তভাবেই ব্যক্তিগত আমল। ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্যই একজন আল্লাহতে মজনু হাজী সাহেব হজ করে থাকেন। তা সত্ত্বেও সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হজের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। বস্তুত হজের মৌসুম এমন এক বসন্ত মৌসুম, যার আগমনে নতুন প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মুসলিম উম্মাহ্। এ কারণেই হজের সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে বায়তুল্লাহ্র জিয়ারতে ছুটে আসে। যারা হজে গমন করেন তাঁরা তো ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত থাকেনই, অনুরূপভাবে তাঁদের আত্মীয়স্বজন যারা হাজীদের বিদায় সম্ভাষণ এবং ফেরার পর অভ্যর্থনা জানান এবং হাজীদের থেকে হজের বিস্তারিত মনোমুগ্ধকর অবস্থা শুনে তাদের মধ্যেও ধর্মীয় দিক থেকে নবচেতনার উন্মেষ ঘটে।

এমনিভাবে হাজীদের কাফেলা যে স্থান দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করে তাদের দেখে এবং তাদের লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক আওয়াজ শুনে সেখানকার কত মানুষের দিল ধর্মীয় ভাবধারায় আপ্লুত হয়ে ওঠে এবং কত মানুষের অচেতন আত্মায় হজ করার উৎসাহ জেগে ওঠে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিভিন্ন দেশ হতে আগত হজযাত্রীদের শারীরিক কাঠামো ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন কিন্তু নির্ধারিত মিকাতের নিকট এসে তারা নিজেদের পোশাক পরিবর্তন করে একই ধরনের সাদা শুভ্র কাফন সদৃশ ইহরামের কাপড় পরিধান করে, তখন তাদের মধ্যে একই ইলাহ - এর বান্দা হওয়ার চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। সকলের মুখে একই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে : লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক... হাজির ওহে প্রভু আমি হাজির তোমার দরবারে, হাজির তোমার কাছে, তোমার কোন শরিক নেই, নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা এবং যাবতীয় নিয়ামতের শুকরিয়া তোমার খিদমতে উৎসর্গিত, লা শারিকালাক- তোমার শরিক, সমকক্ষ, সমমর্যাদার ও সমভক্তির আর কেউ নেই।’

তারপর মক্কা আল হারাম ও মদিনা শরীফের পবিত্র ভূমিতে কাফেলা একত্রিত হয় এবং সকলেই একই পদ্ধতিতে একই ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে। এভাবে সমবেত মুসলিম জনতা ভাষা, জাতি এবং দেশ গোত্রের কৃত্রিম বৈষম্য ভেঙ্গে দিয়ে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব সংস্থাপনের বিরাট সুযোগ পায়। প্রকৃতপক্ষে, হজের এ বিশ্ব সম্মিলন হলো ‘কুল্লু মুসলিমুন ইখওয়াহ’ ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’... এর বাস্তব নমুনা। হজের মৌসুমই এ অনুভূতি উপলব্ধির হৃদয়কাড়া উৎকৃষ্ট সময়।

হজের মৌসুমে আলিম-উলামা এবং সুফি ও সংস্কারকগণ পবিত্র মক্কা ও মদিনায় একত্রিত হয়ে থাকেন। তাই এ সময় উম্মাহর সঠিক অবস্থা পর্যালোচনা করা, তাদের শিরক ও বিদ’আতের অভিশাপ হতে মুক্ত করা এবং মুসলিম বিশ্বে তালিম ও তাবলিগী মিশন প্রেরণের বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া যায়। হজ যেহেতু মুসলিম উম্মাহর এমন এক বিশ্ব সম্মিলন, যেখানে সব শ্রেণীর মানুষই এসে সমবেত হয়। তাই এ সময় বিশ্বশান্তি স্থাপনের এবং জাতিসমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ মিটিয়ে, লড়াই ঝগড়ার পরিবর্তে ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করার এক বিশ্ব মৌসুম। এ মহতী আমলে অবগাহন করতে আমরা কেউ যেন গাফিলতি না দেখাই।