১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব রক্ষা করবে বলে হাত গুটিয়ে বসে নেই বাংলাদেশ

  • হাফিংটন পোস্টে শেখ হাসিনার নিবন্ধ

বাংলানিউজ ॥ জাতিসংঘে ২৫-২৭ সেপ্টেম্বরের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্ব নেতাদের অংশগ্রহণে এবার গৃহীত হতে যাচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। তারই প্রাক্কালে ‘হোয়াটস ওয়ার্কিং : সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ এই শিরোনামে ধারাবাহিক নিবন্ধ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এ সময়ের খ্যাতিমান সংবাদপত্র হাফিংটন পোস্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা এই নিবন্ধটি হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিদিন এতে একটি করে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ওপর জোর দিয়ে নিবন্ধ থাকছে। শেখ হাসিনার এ নিবন্ধে আলোকপাত করা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গ। যেটি এসডিজির ১৩ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা। প্রধানমন্ত্রীর নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

মোটেই ক’দিন পর টেকসই উন্নয়ন ২০৩০ এজেন্ডা গ্রহণ করবে বিশ্ব। আমার নিজের দেশ, বাংলাদেশের জন্য এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ নিয়ে বৈশ্বিক যে হুমকি তাতে আমরাই সামনের সারির দেশ।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঘন-জনবসতির দেশগুলোর একটি (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২১৮ জন), আর মাথাপিছু চাষযোগ্য জমি সবচেয়ে কম (০.০৫ হেক্টর)। আমরা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি ঠিকই, কিন্তু জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো আবহাওয়ার চরম বৈরী আচরণের মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের কৃষি উৎপাদন, শিল্পোন্নয়ন আর সামাজিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব রেখে চলেছে। এর ফলে সৃষ্টি হতে পারে কোটি কোটি পরিবেশ-উদ্বাস্তু, যদিও গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে যে জলবায়ু পরিবর্তন তাতে বাংলাদেশের ভূমিকা নেই বললেই চলে। জরুরী ব্যবস্থা না নিলে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে। গবেষণাগুলো বলছে, সমুদ্রের স্তর আর এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে চলে যাবে। তাতে বাস্তচ্যুত হয়ে পড়বে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ। এতে শহরে-নগরে মানুষের অভিবাসন অবশ্যম্ভাবী, যা প্রভাব ফেলবে মানুষের জীবিকায়, জীববৈচিত্রে, খাদ্যে, পানিতে, পয়ঃনিষ্কাশন আর অবকাঠামোতেও।

আর সেসব কারণেই আমরা আসন্ন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) আর প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছি। তবে বিশ্ব আমাদের রক্ষা করবে সেই ভাবনায় আমরা হাতগুটিয়ে বসে নেই। সীমিত সম্পদ আর প্রযুক্তির শক্তি দিয়েই ভবিষ্যতের জন্য আমরা নিজেরা লড়াই করে যাচ্ছি। ২০১১ সালে আমরা পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নে আর বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র, বনাঞ্চল আর বন্যপ্রাণিসম্পদ সুরক্ষার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করেছি। এই নীতির আলোকে দেশের বনাঞ্চল রক্ষায় ২০০৯ সাল থেকে অন্তত আটটি নতুন আইন প্রণীত কিংবা সংশোধিত হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে বনাঞ্চল ১৭.০৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এ জন্য সামাজিক বনায়ন কর্মসূচীকেই ধন্যবাদ দিতে হবে। এ কর্মসূচীতে দেশের শহর ও গ্রাম উভয়াঞ্চলে সম্ভাব্য সব স্থানে গাছ লাগানো ও বড় করে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। এখন প্রতিবছর দেশের মানুষের মাঝে ১২ কোটি গাছের চারা বিতরণ করা হয়, যা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে ছিল মাত্র চার কোটি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে সরকার তিন হাজার কোটি টাকা (৩৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে। আমাদের সকল কর্মসূচীর লক্ষ্যেই রয়েছে পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে মানবজীবনকে সুরক্ষা দেয়া আর অব্যাহত নগরায়ন ও দুর্বল শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা।

আমাদের নীতি-কাঠামোর অংশ হিসেবে নেয়া সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের অনেক উদাহরণই রয়েছে। বিদ্যুতের সঞ্চালন নেই এমন এলাকায় প্রায় চল্লিশ লাখ সৌর-ঘর আমরা তৈরি করেছি, ১৫ লাখ উন্নত স্টোভে রান্না করতে পারছে, এতে ঘরের ভেতরে বায়ুদূষণ কমেছে।

বঙ্গোপসাগরে ঘেরা দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড়ের থাবা থেকে সুরক্ষা দিতে উপকূলজুড়ে আমরা সবুজবেষ্টনী তৈরি করেছি। ঘন বন দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে উপকূলরেখা, বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বন কার্যকরভাবেই ঝাপটা সামলাচ্ছে। এ ব্যবস্থার কারণে ২০০৯ সালের আইলা থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের মহাসেনের আঘাত পর্যন্ত সকল ঘূর্ণিঝড়ে মোট প্রাণহানি ঘটেছে ২০০ জনের মতো। অথচ ১৯৯১ সালে মাত্র একটি ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

খাদ্য উৎপাদনেও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করেছি। গত ছয় বছরে বাংলাদেশ একটি খাদ্য আমদানিকারক দেশ থেকে খাদ্য রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা শস্যের প্রায় ২০০ রকম জাত তৈরি করেছেন, যা জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, স্বল্প উর্বর জমিতেও ফসল উৎপাদনে সক্ষম। দেশে ২০০৮-০৯ সালে ধানের উৎপাদন ছিল ৩৩.৩০ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৩৮.৩৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

তবে এসব উদ্যোগের পরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বছরে গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে দেশের ব্যাপক অঞ্চলের শস্যহানি ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের গম চাষ ও প্রধান ধানশস্য (বোরো) উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণাগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের দুই থেকে তিন শতাংশ বিনষ্ট হতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, আর সে কারণেই এসডিজি ও জলবায়ু চুক্তির মতো উদ্যোগগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমাদের মতো দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায়, এর প্রভাবের সঙ্গে খাপখাইয়ে নেয়া আর তা কমিয়ে আনা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্যারিসে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু আলোচনায় কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে যে সব প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে সেগুলো পরিমাপ ও প্রমাণযোগ্য হওয়া চাই। বিশ্বকে এখনই কার্বন বাজেটিং ও কার্বন কমিয়ে আনার পথগুলো কী হবে তাতে দৃষ্টি দিতে হবে। খাপখাইয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনমাফিক অর্থ বরাদ্দও জরুরী।

বাংলাদেশ এগিয়ে থাকা একটি দেশের উদাহরণ, আর জলবায়ু পরিবর্তনে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা বাকি বিশ্বের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচী আমাকে এ বছর চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। আমি আশা করি এর মধ্য দিয়ে ভিন্ন নজির স্থাপনে বাংলাদেশের অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রতি গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে। আর সময়ের সবচেয়ে বড় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উন্নত বিশ্ব তাদের সম্পদের ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।