২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অধিকাংশ যাত্রী পায়নি রেলের অগ্রিম টিকেট

অধিকাংশ যাত্রী পায়নি রেলের অগ্রিম টিকেট

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির শেষদিনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে অধিকাংশ যাত্রী শুন্যহাতে বাড়ি ফিরেছেন। ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সোনার হরিণ টিকেটের দেখা পেয়েছেন কেউ কেউ। শনিবার বিক্রি হয় ঈদের ছুটির শুরু অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বরের টিকেট। টিকেট কাটার সর্বশেষ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন অন্তত ১৫ গুণ মানুষ। আজ রবিবার থেকে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ট্রেন সার্ভিসের যাত্রা শুরু হচ্ছে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে অগ্রিম টিকেট নেয়া যাত্রীরা ছুটবেন আপন গন্তব্যের দিকে।

সোমবার থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ৪১ জেলায় বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসেরও যাত্রা শুরু হবে। এছাড়াও বিআরটিসি ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বাসের ঈদ সার্ভিস শুরু হবে সোমবার থেকে। শনিবার ছুটির দিনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৩০ কিমি যানজটে যাত্রীভোগান্তি চরমে ওঠে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ঈদের আগে মহাসড়কগুলো শতভাগ যানবাহন চলাচল উপযোগী করে তোলা যায়নি। সে কারণে সম্পূর্ণ যানজটমুক্ত করা সম্ভব হবে না। তবে এর আগে মন্ত্রী বলেছেন, রাস্তার কারণে এবারের ঈদে সড়ক-মহাসড়কের কোথাও যানজট হবে না।

কমলাপুরে মানুষের ঢল ॥ ২৫ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। ছুটি তিনদিন। এই হিসেবে ২৪ তারিখ থেকে ঈদ উৎসবের ছুটি। ছুটি শুরুর দিনে টিকেট নিতে বাড়তি চাপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবতা ছিল তাই। শেষদিনে টিকেট সংগ্রহে শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। টিকেট চাই-ই চাই। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য যাত্রীদের পছন্দ রেলপথ। সময় গড়িয়েছে। ভিড় বেড়েছে মানুষের। ভোরের আলো ফোটার আগেই প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে লাইন রাস্তা ছুঁই ছুঁই। নারীরাও পিছিয়ে নেই। বাড়তি মানুষের চাপে বার বার লাইনের দিক বদলাতে হয়েছে। নারীদের লাইনের দিক পরিবর্তন হয়েছে একাধিকবার। এর মধ্যে বৃষ্টি আর রোদ গেছে মাথার ওপর দিয়ে। ভ্যাপসা গরমে দুর্ভোগ বাড়লে মনোবল কমাতে পারেনি। টিকেট সংগ্রহের যুদ্ধ থেকে কাউকে পিছু হটাতে পারেনি।

টিকেটের তুলনায় লাইনে মানুষের সংখ্যা যে অনেক তা সহজেই অনুমান করা যায়। বেলা একটার পর পরই বেশিরভাগ রুটের টিকেট শেষ হয়ে যায়। অনেকই কাক্সিক্ষত গন্তব্যের টিকেট পাননি। বিকল্প হিসেবে অন্য গন্তব্যের টিকেট কেটেছেন। কেবিন, এসি চেয়ার ও চেয়ারের টিকেটের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বেশিরভাগ যাত্রী পেয়েছেন শোভন টিকেট। এসি ও সিøপিং টিকেট পেয়েছেন যাত্রীদের মধ্যে এমন নজির মেলেনি।

কমলাপুরে শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিক্রি শুরু হয় অগ্রিম টিকেট। এদিনের টিকেট কিনতে দাঁড়ানো অনেকে বলেছেন, তারা কাউন্টারের সামনে লাইনে রয়েছেন শুক্রবার বিকেল থেকে। জামালপুরের টিকেট কাটতে আসেন কায়কোবাদ। কিন্তু এই গন্তব্যের কোন টিকেট ছিল না। একই তারিখে ময়মনসিংহের টিকেট কেটেছেন তিনি। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ থেকে সহজেই জামালপুরের ট্রেন পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার রতন আগের দিন বিকেলে ৪টায় দাঁড়ান সুন্দরবন এক্সপ্রেসের আলমডাঙ্গার টিকেটের জন্য। তবে টিকেট পেয়েছেন চুয়াডাঙ্গা স্টেশনের। তিনি বলেন, কাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আজ ১০টায় টিকেট হাতে পেয়েছি। তাও পরের স্টেশনের। মোহনগঞ্জগামী হাওড় এক্সপ্রেসের টিকেট কাটতে এসেছিলেন মরিপুরের ব্যবসায়ী মনির হোসেন। পেয়েছেন প্রায় ৩০ কি.মিটার আগে অর্থাৎ নেত্রকোনার টিকেট। তিনি বলেন, নেত্রকোনা যেতে পারলে ট্রেন ফাঁকা হবে। বাকি পথ যেতে সমস্যা হবে না। তবে শোভন চেয়ারের টিকেট না পাওয়ার কথা জানান তিনি।

সবচেয়ে বেশি টিকেটের চাহিদা চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ইশ্বরদী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনাসহ কয়েকটি জেলার। চট্টগ্রামের সুবর্ণ এক্সপ্রেসের টিকেট না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছেন মনিপুরি পাড়ার বাসিন্দা সোহেল। তিনি জানান, সকাল আটটায় লাইনে দাঁড়িয়েও টিকেট পাইনি। মহানগর গোধূলী এক্সেপ্রেসের টিকেট না পাওয়ার কথা জানালেন অনেক যাত্রী। রাজশাহীগামী সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস ও ধূমকেতু এক্সপ্রেসের টিকেট না পাওয়া যাত্রীর সংখ্যাও নিহায়ত কম নয়। অন্তত ১০ যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে টিকেট না পাওয়ার অভিযোগ মিলেছে। তবে তাদের প্রত্যেকেই সকাল আটটা থেকে ১০টার মধ্যে লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সিলেটের জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের শোভন চেয়ারের তিনটি টিকেট পেয়ে খুশির সীমা ছিল না কামরুজ্জামানের। তিনি বলেন, ১৬ ঘণ্টা কষ্টের পর টিকেট পেলাম। এবার সময়মতো ট্রেন ছাড়লে দুর্ভোগ কম হবে। সিলেটের উপবন এক্সপ্রেসের শোভন টিকেট পেয়ে একগাল হাসি দিলেন আনিন্দিতা। তিনি রাজধানীর একটি ডেন্টাল কলেজের ছাত্রী। টিকেট হাতে পেয়ে ভি চিহ্ন দেখিয়ে স্টেশন ত্যাগ করে তার সঙ্গে আসা আরও দুই বান্ধবীও। ১০ ঘণ্টা আগে লাইনে দাঁড়িয়ে দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেসের টিকেট পাননি পল্লবীর হাকিম মিয়া। নোয়াখালীর উপকূল এক্সপ্রেসের টিকেট পেয়েছেন কাশেম, আরমানসহ দুই বন্ধু।

কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের প্রত্যাশিত টিকেট না পেয়েও খুশি একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। শোভন চেয়ার চেয়েছিলাম, পাইনি। তবে নরমাল হলেও টিকেট তো পেয়েছি। এবার চিন্তামুক্ত। সবাইকে নিয়ে বাড়ি যেতে পারব।

কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক সীতাংশু চক্রবর্তী বলেন, সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট নিচ্ছে, কোথাও সমস্যা হচ্ছে না। নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকেট না পাওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমাদের সম্পদ সীমিত। এই সীমিত সম্পদ দিয়ে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট স্টেশনের টিকেট বরাদ্দ কম থাকে, ২ জন টিকেট নিলেই তা শেষ হয়ে যায়। টিকেট না পেয়ে অনেক যাত্রী স্টেশনে হইচই করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কাউন্টার মাস্টারদের সামনে। এক পর্যায়ে টিকেট শেষ এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয় কাউন্টারের সামনে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ দিনব্যাপী ঈদের আগাম টিকেট বিক্রি শুরু করে। রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারে ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির প্রথম দিন ১৫ সেপ্টেম্বর দেয়া হয় ২০ তারিখের টিকেট, ১৬ সেপ্টেম্বর ২১ তারিখের, ১৭ সেপ্টেম্বর ২২ তারিখের, ১৮ সেপ্টেম্বর ২৩ তারিখের এবং ১৯ সেপ্টেম্বর দেয়া হয় ২৪ তারিখের টিকেট। ২৩ সেপ্টেম্বর দেয়া হবে ২৭ তারিখের অগ্রিম টিকেট। ২৪ সেপ্টেম্বর ২৮ তারিখের, ২৫ সেপ্টেম্বর ২৯ তারিখের, ২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ তারিখের এবং ২৭ সেপ্টেম্বর দেয়া হবে ১ অক্টোবরের অগ্রিম টিকেট।

এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ঈদের আগে মহাসড়কগুলো শতভাগ যানবাহন চলাচল উপযোগী করে তোলা যায়নি। সে কারণে সম্পূর্ণ যানজটমুক্ত করা সম্ভব হবে না।’ শনিবার নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের সময় শনিবার দুপুরে মন্ত্রী এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, এবার ঈদে মহাসড়কের পাশে পশুর হাট বসতে দেয়া হয়নি। মহাসড়কে নসিমন-করিমন চলতে না দেয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা কমে গেছে বলে দাবি করেন মন্ত্রী।

সোমবার থেকে নদীপথে যাত্রা শুরু ॥ ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ৪১ রুটে বিশেষ লঞ্চ চলাচল শুরু হবে। যাত্রীরা শেষ মুহূর্তে টিকেটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চলের সব রুটে চলাচলকারী লঞ্চের প্রায় সব কেবিন বুকিং শেষ। নদীপথের যাত্রীরা লঞ্চের ১ম ও ২য় শ্রেণীর কেবিনের অগ্রিম টিকেটের জন্য লঞ্চে লঞ্চে খোঁজ নিচ্ছেন।

অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থার সদস্য ও ঢাকা নদীবন্দরের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান ভুঁইয়া জানান, ঈদে কেবিনের যাত্রী বেশি থাকে কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী লঞ্চ থাকে কম। অনেকেই অগ্রিম টিকেট বুকিং দিয়েছেন। তবে এ বছর টার্মিনাল এলাকায় স্থাপিত নতুন টিকেট কাউন্টার থেকে কিছু কিছু লঞ্চে অগ্রিম টিকেট বুকিং দেয়া হচ্ছে। নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ লঞ্চ চলাচল শুরু হচ্ছে। যাত্রীদের নির্বিঘেœ নদীপথে বাড়ি ফেরার জন্য বিআইডব্লিউটিএ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোঃ গোলজার হোসেন বলেন, ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় ঈদে ঘরমুখো যাত্রীর নিরাপত্তা, যানজট নিরসন, যাত্রী হয়রানি রোধ, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের মতো বিষয় দেখা গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।