২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সত্যনিষ্ঠ তাড়নার ছবি

সুলতান ইশতিয়াক বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে তুলি-কলম পেন্সিল হাতে নিয়েছেন। তিনি এখনও শিক্ষার্থী। জীবনের সূচনা পর্বেও প্রকৃতির মায়াবী ভূবন তাকে তেমন আবিষ্ট করেনি; তা করা স্বাভাবিক ছিল। চারুকলা অনুষদের ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিংস বিভাগের ছাত্ররাই তুলনামূলক বিচারে বেশি নিরীক্ষানিষ্ঠ হয়ে থাকে। নিজের সময় ও পরিপার্শ্বের বাস্তবতা তাদের অনুশীলনে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এক সময় কলকাতা কেন্দ্রিক শিল্পশিক্ষার শিক্ষার্থীরা যেত গঙ্গার পাড়ে; ঢাকার শিল্পীরা পরবর্তী সময়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে প্রকৃতি ও জনজীবন পাঠ করেছে। এই পরম্পরার মধ্যেই নবীন শিক্ষার্থী-শিল্পী ইশতিয়াক বিকশিত হতে চাচ্ছেন। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গিটা যেভাবে তার কাজে গাঢ়ভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাতে বোঝা যায় ললিত-সুন্দর চিত্রিত করার পথ তিনি মাড়াবেন না। যেখানে জীবনের ক্লেশ, শ্রমী মানুষের কষ্ট, সেখানেই চোখ স্থির করেছেন এই নবীন। আর তিনি বিপুল আকারকে ধরতে চান। রূঢ়, কর্কশ, কষ্টদায়ক জীবন ও বস্তুকে ভর করে বাস্তবতার ভাষ্য সরাসরি তুলে ধরতে চান এই শিল্পার্থী।

ইশতিয়াক ঢাকা মহানগরে বাস করেন এবং নগর-দৃশ্য বা সিটিস্কেপই তার প্রধান বিষয়। ঢাকা অনেক পুরানো নগর। সুলতানী আমল পেরিয়ে, মুঘলে বিশেষ জেল্লা প্রকাশ করে, ইংরেজ আমলেও নতুন বিন্যাস পেয়েছে এই নগর। তারপর ’৪৭-এর দেশভাগের পরও ঢাকা বিকশিত হয়ে চলেছে। যত দালান উঠছে ততই বস্তি বাড়ছে। কোটি মানুষের চাপে ঢাকা যেন তার মুঘল আমলের পুরনো দালানের মতই অনেক ফাটল নিয়ে ভাঙ্গন-জর্জর অভিব্যক্তি পেয়েছে। যানজট, জনজট, দূষিত বায়ু, ধনী-গরিবের বৈষম্য, শ্রমক্লিষ্ট ক্ষুদ্র পেশাজীজী মানুষ, এসব বিষয় মনে আসলে ও চোখে দেখলে জীবনে বিশেষ উপলব্ধি আসে। সুলতানের সেই উপলব্ধি হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তার কাজই তার সেই বোধের প্রমাণ। তরুণ বয়সে মানুষ বিস্ময়কর অভিযানে যেতে ভালবাসে। এই তরুণের মধ্যে তা আছে। পুরনো ঢাকার বাদশাহী দালান ও বিশাল ডকইয়ার্ডে বিপুল জলযানের ছবি আঁকার মধ্যে তরুণ ইশতিয়াকের সেই আকর্ষণের খবর আমরা পাঠ করি। এই শিক্ষার্থী সত্যনিষ্ঠ রিপোর্টারের মত বিষয়কে বিশেষ স্বচ্ছতায় তুলে ধরতে চেয়েছেন। নগর দৃশ্য আঁকতে গেলে পরিষ্কার ব্যাকরণে কথা বলতে হয়। কারণ, এখানে স্থাপত্য আছে, নগর-পরিকল্পনার হিসাবে স্পেস বিভাজিত এবং অপরিকল্পিত কোলাহলেরও একটা ব্যাকরণ আছে।

স্থাপত্যের বিশাল বিশাল কাঠামো খিলান, গম্বুজ, মিনার এসব যেমন ইশতিয়াককে আকর্ষণ করেছে, তেমনি ওইসব বিপুল গড়নের ভেতর যে বিচিত্র নকশা আছে তাও অনুপুঙ্খভাবে এঁকেছেন এই নবীন। তার চোখ নানা দূরত্বে নগরকে পর্যবেক্ষণ করেছে। কখনও টপ-এ্যাঙ্গেল, কখনও লো-এ্যাঙ্গেল, কখনও সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক দৃষ্টিপাতে নগরের ঘরবাড়ি, দালানকোঠা চিত্রিত করে নিরীক্ষাপ্রবণ থেকেছেন তিনি। অনেকটা জার্নালিস্টিক, অনেকটা ক্যামেরার ছবির মতো প্রত্যক্ষ তার এ পর্বের ছবি। মুঘল স্থাপত্যের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ আছে। ঐতিহ্যের প্রতি গভীর টান আছে বলেই তিনি একই সঙ্গে চিত্রকর ও স্থাপত্যের নকশাকার হতে চান যেন।

ইশতিয়াকের ভাল লাগে ভাঙ্গন-ধরা বিষয় আঁকতে। কারণ, তাতে নাটকীয় মুখরতা আছে। রেখার বিচিত্র চালে তা মাপা যায়। আলো-ছায়ার দোলাচলে ওই বিষয়ে বিচিত্রতা রয়েছে। ছবি আঁকা তো আলো-অন্ধকারের হিসাব অনুধাবণ করা। পরিপ্রেক্ষিতের হিসাব মেনে তীর্যক রেখার শক্তি বুঝে দূরত্বের মাত্রাটা প্রসারিত করে এই তরুণ শৈল্পিক আনন্দ অনুভব করেছেন। শিক্ষাকালীন সময়ে এই নাটকীয়তা আঁকতে ভাল লাগে। তবে তার জন্য দায় নিতে হয়। নানাভাবে দূষিত যে নগর তার মধ্যে বসে ছবি আঁকাটা আমাদের কাক্সিক্ষত হলেও সে দায় খুব কম তরুণই মেনে নেয়। ইশতিয়াকের ধ্যানটা স্থির, অঙ্গীকারটা প্রবল। তাই তিনি যখন ডকইয়ার্ডে গিয়ে নির্মাণাধীন ও ভাঙ্গা জাহাজ, দুই-ই আঁকেন তখন তাতে ধাতব পাতের বৃত্তান্ত কর্কশ ট্রেক্সাচারে প্রকাশ করেন এবং এখানেও বিপুল গড়নকে আড়াআড়িভাবে তুলে ধরেন এবং ফলে দূর থেকে দেখে এক ধরনের শৈল্পিক সুখ পাওয়া যায় এবং কাছে গিয়ে লোহার গায়ের পোড়া দাগ, জোড়া, ফাটল এসব দেখেও চোখ নিবিষ্ট হয়ে পড়ে। চিত্রশিল্পের জগতে একটা কথা প্রচলিত আছে যে শিল্পী যেভাবে ক্যানভাসের কাছে ও দূরে গিয়ে ইমেজের মাপটা নিয়ে ছবি সম্পন্ন করেন, দর্শকও যদি সেভাবে নানা দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে ছবি দেখে তবে সেই শিল্পের রস-আস্বাদন যথার্থ হয়। ইশতিয়াকের ছবি অনেকক্ষণ নানা কোণ থেকে দেখার প্রয়োজন হয়। এখানেই তার অনেকটা সার্থকতা অর্জিত হয়েছে। অগ্নিময় দপদপে অঞ্চল আর কালো অঞ্চলের সংঘর্ষ আছে তার ছবিতে। যদিও এই নবীণ কয়েকটি মনোলোভা নদীদৃশ্য বা রিভারস্কোপ এঁকেছেন, তবু তিনি শান্ত সুরকে অনূদিত করতে চান না। তার মনোভঙ্গিটা এক্সপ্রেশনিস্টদের মত; অজস্র ফর্মের একটা মাতম হয়ে ওঠে তার কাজ। তার একটি নির্মীয়মান জাহাজ যেন নানা ধরনের ফর্মের সমন্বয়ে অর্কেষ্ট্রায় রূপান্তরিত হয়েছে।

ইশতিয়াকের আরেকটি বিষয় ‘রানা প্লাজা’। মানুষের লোভ মানুষকে হত্যা করেছে। রানা প্লাজার পোশাকশিল্পের দালানের ধ্বংসলীলা জানিয়ে দেয় এদেশে মানবতা কিভাবে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। চূর্ণ-বিচূর্ণ দালান, মানুষের কর্তিত অঙ্গ-প্রতঙ্গ সব একাকার হয়ে আছে ইশতিয়াকের ছবিতে। এখানে এই শিক্ষার্থী শিল্পী মানুষের রক্তাক্ত দেহের ড্রইং এবং দেয়ালের চাই পরস্পরিত করে কম্পোজিশন তৈরি করেছেন। নিষ্ঠুরতার ডিটেল তিনি তুলে ধরেছেন। মানুষের কষ্টটা দর্শক হৃদয়ে যেন মুদ্রিত থাকে তাই তার আয়োজনটা বিশেষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ইট, সুরকি, সিমেন্ট, মানুষের দেহের অংশ, রক্তের দাগ সব মিলিয়ে একটা করুণ আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন ইশিতিয়াক। তার ছবি দুসহ দুঃখের শৈল্পিক মুদ্রা।

সামাজিক দায় আছে শিল্পীর। এই বোধ থেকে তরুণ ইশতিয়াক নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেননি। তাই শিশুশ্রমের বেদনাঘন পরিবেশটা গভীর মনোযোগে আঁকতে চেষ্টা করেছেন তরুণ শিল্পী। তবে তার দায়বোধটা একটা স্পষ্টতা পেয়েছে রেললাইনের ধারের বস্তি আঁকার মধ্যে। সাপের মত চলে গেছে অনেকগুলো রেল লাইন আর তার ওপরেই মানুষ প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত। রেল লাইনের ধারেই তাদের টিন ও বাঁশে গড়া আবাস। নগর ঘিরে আছে এই কঠোর জীবন। নিচুতলার মানুষেরাই সংখ্যায় বেশি। তাদের কালি-ঝুলি মাখা পীড়িত জীবনকে কেমন পরিহাসময় মনে হয় যখন দেখি রেললাইনের পাশে ভঙ্গুর ঘরবাড়ি ছাড়িয়ে সবুজ প্রকৃতি উঁকি দিয়েছে। আবারও ডিটেলকে ধরার তাগিদ থেকেই ইশতিয়াক এ ছবি এঁকেছেন। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি জীবনঘনিষ্ঠ কোন কোমল-পেলব বিষয় তাকে তেমন আকর্ষণ করেনি এটাই বিশেষ বিবেচনা দাবি করে। কাওরান বাজারে পণ্য ও মানুষের ভিড় আর ফার্মগেটের যানজট, এই দুইটি বিষয় গভীর অভিনিবেশে ইশতিয়াক এঁকেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এ জগত রূপের লীলা। সেই রূপের মহাকাব্য পড়তে চান বলেই এই তরুণ খাতা খুলে বসেন বস্তিতে, রেললাইনের ধারে, যানজট দেখার জন্য দালানের ছাদে, পুরনো দালানের কাছে আর বাজারের ভিড়ে। ফর্মের কোলাহলকে কিভাবে আয়ত্তে এনে নিজের সময়টা ব্যাখ্যা করা যায় তারই তালিম নিয়ে চোখকে অন্তর্ভেদী শক্তিতে সমৃদ্ধ করছেন ইশতিয়াক এবং কব্জিতে অন্তরিত করতে চাচ্ছেন তিনি আরও জোর। তার মধ্যে স্বভাবজাত তারুণ্যের পুলক আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে জেদ আছে বাস্তবতার সত্য রূপ প্রকাশের। তার এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই তার শিল্পসৃষ্টির পথে সবচেয়ে বড় বিষয়। (সংক্ষেপিত)