২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জমে উঠেছে ঈদের বাজার

পারভেজ হোসেন

আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশে চলছে কোরবানির প্রস্তুতি। ঘরে বাইরে সর্বত্রই চলছে কোরবানির পশু নিয়ে আলোচনা। ভারত থেকে গরু আসবে কি আসবে না, যদি না আসে তবে গরুর কেমন সংকট দেখা দেবে, দাম কত বাড়বে এরকম নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল সবার মুখে মুখে। তবে গত কিছুদিন ধরে ভারত থেকে গরু আসায় কেটে গেছে সেই সংশয়। এরই মধ্যে রাজধানীসহ সারাদেশের গরুর হাটগুলো গরু, ছাগল, উট ও ভেড়ায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু গরুর হাটই নয়, শপিংমল, কাঁচাবাজার সর্বত্রই উপচে পড়া ভীড়। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতি তাই বেশ চাঙ্গা।

কোরবানির পশুর বাজার

কোরবানি উপলক্ষে প্রত্যেকেই এখন ভাবছেন, কত টাকা দিয়ে গরু কিনবেন, কোথা থেকে এবং কোন ধরনের গরু কিনবেন। গাবতলী হাটে গরু কিনতে আসা আশরাফ উদ্দিন জানালেন, তার পছন্দ কালো রঙের গরু, কিন্তু ছেলের পছন্দ লাল। তাই এ দুটি রঙের মধ্য থেকে বাছাই করবেন কোরবানির গরু। তবে তা অবশ্যই তাদের সাধ্যের মধ্যে হতে হবে। অনেকেই আবার কোরবানি দেন ভাগাভাগি করে। সেক্ষেত্রে ৩-৪ জন অথবা সর্বোচ্চ ৭ জন মিলে দিতে পারেন কোরবানি। হাটে দেখা হলো এমনই একজন ক্রেতার সঙ্গে, যারা ৪ জন মিলে কোরবানি দেবেন। গত বছরের তুলনায় এবছর গরুর দাম বেশি। দাম কষাকষি করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছেন ক্রেতারা। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরুর দাম তাদের বাজেটকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। যে গরু গতবছর চল্লিশ হাজারে কিনেছিলেন, সেটার দাম হাকানো হচ্ছে সত্তর থেকে আশি হাজার টাকা। ফলে বেশির ভাগ ক্রেতাই গরু না কিনে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন শেষ সময় পর্যন্ত দেখবেন বলে। একারণে এখনও হাটগুলোতে গরু বিক্রি তেমনভাবে শুরু হয়নি। অনলাইনে গরু কেনাবেচা শুরু হয়েছে ২০১২ সাল থেকে। যারা হাটে যাওয়ার কষ্ট থেকে বাঁচতে চান, তাদের জন্যই এ ব্যবস্থা। এখনও অনলাইন গরু বেচা-কেনার হাট জমে উঠেনি। তবে বিক্রেতারা আশা করছেন, দু-এক দিনের মধ্যেই জমে উঠবে পশুর হাট। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ ক্রেতা-বিক্রেতার সুবিধার জন্য হাট এলাকায় সন্ধ্যাকালীন ব্যাংকিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ছুরি-চাপাতি,মাদুর ও অন্যান্য

আনুষঙ্গিক বাজার

কোরবানির ঈদে দা-ছুরি, চাপাতি ও বঁটির চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাই দেদার বিক্রি হচ্ছে এসব সরঞ্জাম। এগুলো তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সারাদেশের কামাররা। পুরনো দা-ছুরি ধারাতে আর নতুন সরঞ্জাম কিনতে কামারপল্লীতে ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা। একদিকে হাতুড়ি পেটাচ্ছেন আর অন্যদিকে হাঁপাচ্ছেন, তবুও একটু বেশি রোজগারের আশায় দিন-রাত কাজ করছেন কামারপল্লীর কামাররা। অনেক ক্রেতা অভিযোগ করছেন, কামাররা দাম ও মজুরি অনেক বেশি রাখছেন। এ প্রসঙ্গ গোপাল নামের এক কামার বলেন, ‘আগের থেকে লোহা ও কয়লার দাম বেড়েছে আর তাছাড়া আমাদের কাছে তো তারা রোজ আসেন না। আমাদের হাতেও খুব একটা কাজ থাকে না। আমাদেরও তা বউ-পোলাপান নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। এসব সরঞ্জাম ছাড়াও মাংস কাটার জন্য গাছের গুঁড়ি, মাদুর, গামছাসহ কোরবানি দিতে আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বেচা-কেনার ধুম লেগেছে। গরুর খাদ্য হিসেবে খড়, খৈল ও ভুষিও বেচা-কেনা হচ্ছে। তবে সবকিছুর দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। বেশি দামের কারণে ক্রেতা-বিক্রেতারা মাঝে মাঝে বাহাসে জড়িয়ে পড়ছেন।

মসলার বাজার

কোরবানিকে কেন্দ্র করে পশুর হাটের পরে সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে মসলার বাজার। স্বাভাবিক চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে দেশীয় মসলা। তবে আগুন লেগেছে পেঁয়াজের দামে। ঝাঁঝালো কাঁচামরিচের বাজার, আকাশচুম্বী বিদেশী মসলার দাম। আদা, রসুন, জিরাসহ সব দেশি-বিদেশী গরম মসলার দাম চড়া। মুখ বেজার করে বাধ্য হয়েই বেশি দাম দিয়ে কিনছেন ক্রেতারা। অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মসলা ভাঙানোর মিল মালিক ও কর্মচারীরা। তবে মসলা মিল মালিক গিয়াসউদ্দিন বলেন, দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছি না।

বিশেষ খাবারের বাজার

ঈদ মানে বিশেষ দিন। আর বিশেষ দিন মানে বিশেষ খাবার। প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি হয় নানা ধরনের মজার খাবার। খাবারের এই আয়োজনের মধ্যে প্রথমেই থাকে সেমাই। সারাদেশের দোকানগুলোতে সাজানো হয়েছে নানা ধরনের সেমাই। আর কোরবানি ঈদে চালের গুঁড়া ও গমের আটার চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এছাড়াও বিক্রি হয় পোলাওয়ের চাল, ঘি, চিনি, দুধ ও অন্যান্য পণ্য। পাইকারী ও খুচরা বাজারে এসব পণ্য বিক্রি চলছে দেদারসে। অন্যান্য পণ্যের তুলনায় বিশেষ খাবারগুলোর দাম স্বাভাবিক। এসব পণ্য ক্রেতারা হাসিমুখেই কিনছেন। কোরবানীর ঈদে কোমল পানীয়র চাহিদা বেশি থাকায় অনেকেই এখনই তা কিনে রাখছেন।

ইলেকট্রনিক্স পণ্য বাজার

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বহুগুণ বেড়ে গেছে ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রি। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ফ্রিজ। এছাড়া বিক্রি বেড়েছে মাইক্রোওভেনেরও। ঈদ উপলক্ষে বিক্রি বাড়াতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে দিচ্ছে নানা উপহার ও ডিসকাউন্ট। মূলত কোরবানির পশুর মাংস সংরক্ষণ করতেই ফ্রিজের চাহিদা বেড়ে যায়। ফ্রিজ কিনতে আসা একজন ক্রেতা জানালেন, তার বাসায় ফ্রিজ থাকলেও কোন ডিপফ্রিজ নেই। তাই তিনি একটি ডিপফ্রিজ কিনতে এসেছেন। ফ্রিজ, ওভেন ছাড়াও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রিও ভালো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একজন বিক্রেতা।

পোশাক, জুতো ও কসমেটিক্সের বাজার

সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেল পোশাকের দোকানগুলোতে। নেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় কিংবা রমজানের ঈদের মতো ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন না পোশাক বিক্রেতারা। তবে এমন দৃশ্যকে অস্বাভাবিকভাবে দেখছেন না দোকানদাররা। কারণ তারা জানেন, এখন সব ব্যস্ততা ও ভিড় শুধু পশুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে। তবুও হাল ছাড়ছেন না এসব ব্যবসায়ীরা।

বিক্রি বৃদ্ধি করতে ও পুরনো ডিজাইনের পোশাকগুলো বিক্রি করে নতুন পোশাক তুলতে দেশের প্রায় সব জনপ্রিয় ব্র্যান্ডই তাদের পোশাকে ৩০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। জনপ্রিয় জুতোর ব্র্যান্ড বাটা তাদের জুতোতে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। বে ইম্পেরিয়াম দিচ্ছে দুটো জুতোর সঙ্গে একটি ফ্রি। বিক্রি হচ্ছে না হচ্ছে না বলেও সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি পোশাক,জুতো ও কসমেটিক্স বিক্রি হচ্ছে, যদিও তা রোজার ঈদের চেয়ে অনেক কম। ঈদের বাজার এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তবে বিক্রেতারা আশা করছেন, শেষ তিনদিনে পুরোপুরি জমে উঠবে পশুর হাট থেকে শুরু করে ঈদকেন্দ্রিক সকল পণ্য ও শপিংসেন্টারগুলো।