২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্যাম্পাসে ঈদ আনন্দ

ঈদ খুশির। ঈদ আনন্দের। আনন্দ আর খুশিতে হারিয়ে যাওয়া একটি দিনের নামÑ ঈদ। যা বিশ্বের সকল মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর বছরে দু’বার এসে দোলা দিয়ে যায়। মুসলিম বিশ্বে এমন আনন্দ ও উৎসবের দিন আর দ্বিতীয়টি নেই। এ কারণে অধীর আগ্রহে মুসলমান মাত্রেই এ দিনের অপেক্ষায় থাকে। এ দিন এলেই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে একেবারে বৃদ্ধ লোকটিও যেন নড়েচড়ে বসেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও নানা আনন্দ-উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে। এসব উৎসব নানারকম উপলক্ষকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়। আর তার মধ্যে হচ্ছে ঈদ-উল- আজহা একটি। মানে কোরবানির ঈদ। ঈদ ছোট-বড়, ধনী-গরিবের প্রভেদ ভুলিয়ে দেয়। রাজা-প্রজা নির্বিশেষে একসঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। শামিল হন ঈদের আনন্দময় উৎসবে। পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা, প্রীতি ও সৌহার্দ-সহমর্মিতা বিনিময় করেন এ সময়। সারা পৃথিবীর মানুষ আবারও একবার হেসে উঠে সাম্য-মৈত্রী আর ভালবাসার অটুট বন্ধনে। থাকে না কোন ধনী-গরিবের ব্যবধান। একদিনের জন্য হলেও এ আনন্দে বিলীন হয়ে যায় সবাই। ছাত্র জীবনে শিক্ষা লাভের জন্য শিক্ষার্থীদের মা-বাবা, পরিবার, পরিজন, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর আধখানা চাঁদ ঝোপে-ঝাড়ে বাতির মতো জোনাকী, ফুলের গন্ধ, সর্বোপরি শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম ছেড়ে দূরে বহুদূরে থাকতে হয়। কিন্তু দূর দূরান্তে থাকলেও এসব নাড়ির টান ও শিকরের বন্ধন সে সব সময় অনুভব করে।

তাই তো জ্যোৎস্না রাতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কলেজের আবাসিক হলের ছাদের ওপর খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালে প্রিয় বাবা-মা ও গ্রাম বাংলার কথা মনে করে চোখে পানি আসে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই একটু ফুসরত পেলেই খাঁচার পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যায় শত শত মাইল দূরে থাকা পরিবার-পরিজনের কাছে। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জীবনে ঈদ এমনই এক ফুরসত এনে দেয়। নানা কারনে কেউবা আবার তখনও যায় না, যেতে পারে না। তবে এ সময় ক্যাম্পাসে থাকার অভিজ্ঞতা, মজা, আনন্দ, বেদনা ও স্মৃতি অনেক।

এম এ আজাদ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে পবিত্র ঈদে ক্যাম্পাসেই থাকেন। সেই সুবাধে ক্যাম্পাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় থেকে কয়েক বন্ধু মিলে ঈদ উদযাপন করেন। একই কথা বললেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী নুসরাত জাহান করভী এবং আইন বিভাগের ছাত্রী তানিয়া আফরোজ শান্তা। তাদের একজনের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলায় এবং অন্য জনের বাড়ি ঝালকাঠী জেলায়। তারা বললেন, একটা উল্লেখযোগ্য সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তাই আমরা ক্যাম্পাসেই ঈদ পালন করি। করভী এবং তানিয়ার মতো দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোজা, ইফতার ও ঈদ ক্যাম্পাসেই উদযাপন করেছেন। আবার পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজমুল, সনন, ওয়াদুদ, মারজান ও শামসুদ্দিন শামস বললেন, ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি না গিয়ে ক্যাম্পাসে ঈদ উদযাপন করার মতো শিক্ষার্থীও তাদের ক্যাম্পাসে কম নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র শিব্বির বললেন, ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি, আমরা চাই ঈদে সব ঝগড়া, বিবাদ, ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সারা বিশ্বের মানুষ মেতে উঠুক এক অনাবিল শান্তি সুখের উল্লাসে। আর যারা এ আনন্দটা ক্যাম্পাসে কাটাবে তাদের কাছে এটি হবে অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনির, রাকিব, নাজমুল, মিমি, মিতু ও মাহিয়া বলেন, তাদের শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে তারা শেষ বছরের ঈদ ক্যাম্পাসেই কাটিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ও সাংবাদিক এরশাদুল বারী কর্নেল। তিনি জানান, তার রাবি ক্যাম্পাসে শিক্ষা জীবনের বিদায়ের বছর। তাই এবারে তারা কয়েক বন্ধু ক্যাম্পাসে শেষ বারের মতো মহাআনন্দে ঈদ উদযাপন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র নজিবুল ইসলাম মাঈনুল, দর্শন বিভাগের আমানুল্লাহ ফয়সাল ও ইংরেজী বিভাগের ছাত্রী জিনিয়া ঈদ ক্যাম্পাসে পালন করার কারণ ও অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে। ঈদের সময় ক্যাম্পাসে থাকার কারণ সম্পর্কে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আমিনুল ইসলাম (সালমান) বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের আর্থিক সঙ্গতি ভাল নয়। আমার মতো অনেকের বাড়ি দূরে হওয়ার কারণে এবং এ সময় নিরিবিলি পরিবেশে ক্যাম্পাসে ভাল পড়াশোনা করা যাবে বলে ক্যাম্পাসেই থেকে যায়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুইনুল ইসলাম জানান, তার বাড়ি থেকে টাকা আসে না। সে একটা টিউশনি করে চলত। কিন্তু কিছু দিন আগে তার টিউশনিটা চলে যায়। বাড়ি যাওয়ার খরচ অনেক। ছোট ভাই-বোনদের জন্য কিছু নিয়ে যেতে হয়। টিউশনিটা হারিয়ে সে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছিল। তাই এবার ঈদ সে ক্যাম্পাসেই করেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস পার্ট- ৩ এর শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সুরভী জানান, ঈদের বন্ধে তাদের ক্যাম্পাসে নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। আর যারা ক্যাম্পাসে ঈদ কাটায়নি এবং যাদের বাড়ি ঢাকা থেকে অনেক দূরে তাদের ঈদের আনন্দটা একটু অন্য রকম হবে। কষ্টকর আবার সুখেরও বটে। অনেক দিন পরে তারা মিলিত হবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাদের জন্য ঈদটা কষ্টকর। এই অর্থে যে, বাড়ি যাওয়ার আগে তাদের জন্য ছিল অনেক প্রতিকূলতা। এর মধ্যে অন্যতম হলো লঞ্চ, স্টিমার, বাস এবং ট্রেনের সিট ও টিকিট পাওয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শহিদুল হকের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠী। কর্মস্থল দূরে হওয়ার কারণে তিনি বাড়ি যান বছরে একবার। তিনি বলেন, এ বছর ঈদ ক্যাম্পাসেই করেন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মো. জিয়াউল ইসলাম বললেন, তাদের কলেজ ক্যাম্পাসে এ বছর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনেকেই ঈদ করছে। তাই ও নিজেও ক্যাম্পাসে থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে।

পরিশেষে ঈদ আমাদের সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি ও সমৃদ্ধি। সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যাক সকল ধনী-গরিব, শ্রমিক-মালিকের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ- এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

ইমাদুল হক প্রিন্স