২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিত্রা নদীর দু’কূল যেন আরেক সুন্দরবন

  • ঘন জঙ্গল, পাখির কলকাকলি- নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী

বাবুল সরদার

যেন সুন্দরবনেরই একটা অংশ। আবাদি-অনাবাদি জমিতে গোলপাতা, কেওড়া, ওড়া, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠছে। চিত্রার দু’কূলে বি¯ৃÍত চরজুড়ে দিনে দিনে বাড়ছে গাছের সংখ্যা। নানা বন্যপ্রাণির দেখা মিলছে এখানে। মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে গভীর অরণ্য। মেছোবাঘ, বাঘডাসা, খাটাশ, বিষধর সাপ, তক্ষক, বনবিড়াল, শিয়াল, গুঁইসাপসহ বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণির বিচরণ ভূমি। গাছে গাছে মৌচাক। মাছরাঙা, ঘুঘু, শালিক, টিয়া, পানকৌড়ি, বক, দোয়েল, ঘড়িয়াল, টুনটুনিসহ প্রায় অর্ধশত প্রজাতির পাখির সন্ধান মিলেছে এখানে। পাখির কলকাকলিতে গোটা বন এখন মুখরিত। যেন সুন্দরবনেরই একটা অংশ।

বিশ্ব ঐতিহ্যে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের মূল ভূখ- থেকে প্রায় শত কিলোমিটার উত্তরে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চিত্রা নদীর বিস্তৃীর্ণ চর ও আশপাশের ১৪-১৫ টি গ্রামজুড়ে প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে বেড়ে উঠছে এই ‘নতুন সুন্দরবন’। যদিও বাঘ-হরিণের দেখা এখানে এখনও মেলেনি, তবে সুন্দরী, গোলপাতা, কেওড়া, ওড়াসহ অসংখ্য প্রকার সুন্দরবনের বৃক্ষ-লতাগুল্ম জন্মেছে এখানে। দিন দিন এর ব্যাপকতায় এখানে আর বসবাস করা যাবে কিনা এমন আশা-নিরাশার দোলাচলে গ্রামবাসী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চিতলমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষে বয়ে গেছে চিত্রা নদী। মধুমতিতে সংযোগ। মাঝে ছোট-বড় অসংখ্য খাল-নালা। আশপাশের রায়গ্রাম, শুরিগাতী, খিলিগাতী, করাতদিয়া, ডুমুরিয়া, আড়ুলিয়া, খড়িয়াসহ গ্রায় ১৪-১৫ গ্রাম। প্রথমে নদীর চরে গোলপাতা, কেওড়া, সুন্দরী ধরনের সুন্দরবনের গাছ-গাছালি জন্মাতে শুরু করে। এক দশক যেতে না যেতেই তা বিস্তীর্ণ চরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একে একে বাড়ির আঙ্গিনা, আবাদি-অনাবাদি জমিতে। এখন গ্রামের পর গ্রাম বনাঞ্চল।

গোলপাতা, কেওড়া, ওড়া, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠছে। চিত্রার দু’কূলে বি¯ৃÍত চরজুড়ে দিনে দিনে বাড়ছে গাছের সংখ্যা। নানা বন্যপ্রাণির দেখা মিলছে এখানে। মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে গভীর অরণ্য। মেছোবাঘ, বাঘডাসা, খাটাশ, বিষধর সাপ, তক্ষক, বনবিড়াল, শিয়াল, গুঁইসাপসহ বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণির বিচরণভূমি। গাছে গাছে মৌচাক। মাছরাঙা, ঘুঘু, শালিক, টিয়া, পানকৌড়ি, বক, দোয়েল, ঘড়িয়াল, টুনটুনিসহ অর্ধশত প্রজাতির পাখির সন্ধান মিলেছে এখানে। সুন্দরবনের মতো পাখির কলকাকলিতে গোটা এলাকা মুখরিত থাকে। বাঘ-হরিণসহ সুন্দর বনের বিভিন্ন বন্যপ্রাণির দেখা এখানে না মিললেও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অরণ্য।

বর্তমানে এলাকার লোকজন তাদের নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে হাজার হাজার টাকার গোলপাতা বিক্রি করছেন। জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় কাঠের চাহিদা মেটাচ্ছেন। পাশাপাশি এখানকার মনোরম দৃশ্যে মুগ্ধ সকলে। বর্তমানে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ পুরোপুরি রূপ নিয়েছে সুন্দরবনে। প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমিতে পরিণত হচ্ছে এলাকাটি। ক্রমশ দর্শনার্থী বাড়ছে।

উপজেলার ডুমুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রকৃতিপ্রেমী হরেন্দ্র নাথ রানা তার অনুভূতি প্রকাশ করে জানান, এখন বাড়িতে বসে সুন্দরবনের দৃশ্য উপভোগ করতে পারছি। চিত্রা নদীর কারণে সুন্দরবন যেন নতুন রূপে এখানে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নদীর দু’পারে এখন সবুজের হাতছানি কেবলই কাছে টানছে ।

উপজেলার করাতদিয়া গ্রামের চিত্রাপারের বাসিন্দা প্রবীণ বিষ্ণুপদ অধিকারী জানান, প্রতিবছর বর্যা মৌসুমে নদীপারের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়। সুন্দর বন থেকে উঠে আসা বিভিন্ন নদী চিত্রা নদীর সঙ্গে যোগ হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের বীজ নদীতে ভেসে সরাসরি এখানে চলে আসে। এসব বীজ থেকে মূলত আপনা থেকে গাছের জন্ম হচ্ছে। এতে গ্রামগুলো দিন দিন ঘন বনে আচ্ছাদিত হচ্ছে।

চিতলমারী সদর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ নিজাম উদ্দিন জানান, সুন্দরবন থেকে উঠে আসা বিভিন্ন নদীর সঙ্গে চিত্রার সংযোগ রয়েছে। যে কারণে নদীর মাধ্যমে সহজে এখানে বনাঞ্চল গড়ে উঠছে। এটা প্রকৃতির আশীর্বাদ বলে তিনি মনে করেন।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ সাইদুল ইসলাম জানান, এ বন প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখবে। এটি যথাযথভাবে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

এ ব্যাপারে বাগেরহাট সরকারী পিসি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রাণি ও উদ্ভিদ বিভাগের প্রফেসর বুলবুল কবির জানান, সুন্দরবনের মূল ভূখ- এক সময় মাদারীপুরসহ উত্তর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কালে কালে যা ছোট হয়েছে। কিন্তু এখানকার মাটিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছ জন্মানোর কার্যকরী ক্ষমতা রয়েছে। উপকূলীয় এ অঞ্চলে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নদীতীরে নতুন বন গড়ে ওঠা সম্ভব।

সমাজিক বন বিভাগের ডিএফও মোঃ হারুনআর রশিদ মজুুমদার সম্প্রতি এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি নতুন এ বন রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার ব্যাপারে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। উপযুুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে এখানে হরিণ-বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণি অবমুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান। ভ্রমণার্থীদের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য একটি বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহতি করবেন বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোঃ জাহাংগীর আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সরকারী খাস জমি ও নদীর চরে এ ধরনের বনাঞ্চল গড়ে উঠলে সেটা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।