১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কালিহাতীর ঘটনার নেপথ্য কারণ জানার চেষ্টা চলছে

  • সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ প্রধান ॥ গুলিবিদ্ধ আরও একজনের ঢাকা মেডিক্যালে মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল ॥ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের অভিযোগের সূত্র ধরে পুলিশ-জনতার সংঘর্ষকালে গুলিতে আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রুবেলের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৪ জনে দাঁড়াল। এদিকে কালিহাতীর ঘটনার পেছনে আরও কোন কারণ আছে বলে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান দাবি করেছেন। সেই কারণটি জানার চেষ্টা চলছে। ধর্ষণের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার এক নম্বর আসামি কাজীরবাড়িতে কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভাড়ায় থাকায় আসামিকে গ্রেফতার না করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় কালিহাতী ও ঘাটাইল থানায় অন্তত ৯শ’ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ২টি পৃথক মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। দুই উপজেলায় অন্তত ১৫ গ্রামের পুরুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। যদিও পুলিশ বলছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে। আতঙ্কের কোন কারণ নেই। এদিকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে রুবেল হোসেনের (১৮) মৃত্যু হয়। নিহতের পিতার নাম ফারুক হোসেন। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার হরিপুর গ্রামে। রুবেল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বিছানায় ডাঃ রেজাউল করিমের তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন। এদিকে সোমবার পুলিশ সদর দফতরে ঈদ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। মা-ছেলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে। পুলিশ ওই ঘটনায় ২ জনকে গ্রেফতারও করেছে। এমন ঘটনার একদিন পর মহাসড়ক বন্ধ করার নেপথ্যে তৃতীয় কোন বিষয় জড়িত বলে মনে হচ্ছে। তৃতীয় বিষয়টি রাজনৈতিক কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ প্রধান বলেন, একটি ঘটনা ঘটেছে, মামলা হয়েছে, পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতারও করেছে। সবকিছুই যখন ঠিকমতো এগোচ্ছিল তখন মহাসড়ক বন্ধ করে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে কেন? সেটা বুঝতে হবে।

প্রসঙ্গত, ধর্ষণের ঘটনায় ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, এক নম্বর আসামির বাড়িতে কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভাড়ায় বসবাস করেন। এজন্য এক নম্বর আসামি কাজীকে গ্রেফতার করা হয়নি। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পুলিশপ্রধান বলেন, যদি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলার এক নম্বর আসামিকে খাতির করে থাকেন, তাহলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে কালিহাতীর ঘটনায় তিন উপ-পরিদর্শকসহ সাত পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন ঘাটাইল থানার এসআই মুনসুপ আলী, কনস্টেবল হারুন-অর-রশীদ, লিয়াকত আলী ও কালিহাতী থানার এসআই আবুল বাসার, সলিম উদ্দিন, কনস্টেবল জিয়াউল হক ও আমিরুল ইসলাম।

শনিবার রাতে কালিহাতী থানার এসআই মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে ৩ থেকে ৪ শ’ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে এবং ঘাটাইল থানার এসআই মুনসুপ বাদী হয়ে ঘাটাইল থানার দিগর ও দিঘলকান্দি ইউনিয়নের ৫-৬ শ’ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় ঘাটাইল ও কালিহাতী থানার অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া, সালেংকা, কুষ্টিয়া, হরিপুর, বেতডোবা, কালিহাতী ও উত্তর বেতডোবা। আর ঘাটাইল উপজেলার গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে হামিদপুর, কালিয়াগ্রাম, নাটশালা, আঠারদানা, পারশী, কাঁশতলা, দিঘলকান্দি ও উত্তর সালেংকা।

গ্রামের পুরুষরা গ্রেফতারের ভয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। যদিও পুলিশের তরফ থেকে আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই বলে জানানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও পুলিশের তরফ বলা হচ্ছে।

এ ঘটনার তদন্তে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির অপর সদস্যরা হচ্ছেন, ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা আরা বেগম ও কালিহাতী উপজেলা সহাকারী কমিশনার (ভূমি) ইশরাত সাদমিন।

কালিহাতী আসনে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। নির্বাচনী এলাকায় তিন জনের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের পাশে নেতাদের না দাঁড়ানোর ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কাদের সিদ্দিকী রবিবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে যান।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনার সূত্রপাত। মা-ছেলে কালিহাতী থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ রফিকুল ইসলাম রোমা ও তার ভগ্নিপতি হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়। পরে আরও একজনকে গ্রেফতার করে।

এ নিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঘাটাইল উপজেলার আঠারদানা ও হামিদপুর এলাকার ৪-৫ শ’ লোক বিক্ষোভ মিছিল করে কালিহাতী থানা ঘেরাওয়ের উদ্দেশে কলেজগেট এলাকায় পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে শামীম, ফারুক ও শ্যামল দাশের (১৫) মৃত্যু হয়। রবিবার সন্ধ্যায় রুবেলের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন।

টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার নিহতদের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুব হোসেন নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা করেন। আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার জেলা প্রশাসন বহন করছে। পাশাপাশি মা-ছেলেকেও চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা দেয়া হয় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে।

এদিকে শনিবারই পুলিশ সদর দফতরের তরফ থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি (ডিসিপ্লিন) মোঃ আলমগীর আলমকে প্রধান করে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন, ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আক্তারুজ্জামান এবং টাঙ্গাইল জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আসলাম খান। কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি শনিবারই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় জনতা ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন।