২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যানজট নিরসনে যা করা দরকার সবই করব ॥ ও. কাদের

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যানজট-জলজট সমস্যা সমাধানে সব দিক ভেবে ভয় পেলে চলবে না। সাহস নিয়ে কাজ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এছাড়া যানজট-জলজট সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কোন সংস্থার প্রধান যদি টাকার লোভী হন, তাহলে কোন কাজই ঠিকভাবে হবে না। ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে ‘নগর ঢাকায় যানজট : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সভায় এসব কথা বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হককে উদ্দেশ করে বলেন, যানজট নিরসনে যা যা করা দরকার- তার সবই আমি করব।

রবিবার দুপুরে রাজধানী বনানীর একটি হোটেলে এই গোলটেবিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘নগর ঢাকায় যানজট : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সভার সহযোগী আয়োজক ছিল বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউট।

আনিসুল হককে উদ্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, রাস্তার জায়গা কেন দেব না? প্রয়োজনে বিদ্যমান স্ট্রাকচার ভেঙে দেব। এতে করে যদি যানজট কমানো সম্ভব তাহলে অবশ্যই আমি এই কাজে আছি। ঢাকার বড় সমস্যা- যানজট, জনজট, জলজট। সমস্যা নিরসনে আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। আজ (রবিবার) যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, সেগুলো থেকে বেছে নিয়ে কাজ করুন। অনেক ডিম এক ঝুঁড়িতে নয়, এক ঝুঁড়িতে কয়েকটি ডিম আনুন। এভাবেই কাজ এগোতে হবে। কোন নেতা কোন গরুর মার্কেট লিজ নিয়েছেন, সেসব দেখবেন না, সাহস করুন।

তিনি বলেন, মানবিক দিক তো ভাববেন, কিন্তু সব বিষয়ে মানবিকতা দেখলে চলবে না। প্রথম থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। ২২টি মহাসড়কে ধীরগতির বাহন বন্ধ হয়নি? ধীরগতির যানবাহন বন্ধ হওয়ায় এখন দুর্ঘটনার হারও অনেক কমেছে। রাজধানীতে ১০ লাখ রিক্সা হিসেবে থাকলেও বাস্তবে হয়ত ২০ লাখ। তাহলে মানবিক আর কত দেখবেন। ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখতে পারছেন না, তাহলে রাস্তা দখলমুক্ত করুন। এমন অনেক রাস্তা আছে যা দখলে আছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন আর আমি ভাষণে বিশ্বাসী নই। ভাষণ দিতে দিতে আমাদের গোডাউনে আর ভাল কথা নেই। এখন কাজ করে দেখাতে হবে। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মোঃ মশিউর রহমান রাঙ্গা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। সভায় মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, হুট করেই রিক্সা উঠিয়ে দেয়া যাবে না। রংপুর ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ রিক্সা চালান ঢাকায়। তাদের জীবিকার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আর কোন উপায় থাকবে না তখন। সব কিছু চিন্তা করে কাজ করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকার সবচেয়ে বড় দুঃখ ও বড় সমস্যা দুটি- যানজট ও জলজট। আমাকে আলাদিনের প্রদীপ দেয়া হলে এই দুটি সমস্যার সমাধান চাইতাম। যানজট নিরসনের দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগের। তবু জনগণ যেহেতু আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, আমাদের কাছ থেকে তারা অনেক কিছু আশা করেন। সেক্ষেত্রে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।

তিনি বলেন, সারা ঢাকাতেই যে সমান যানজট, তা নয়। দক্ষিণের চেয়ে উত্তরে যানজট একটু বেশি। একটি দুটি রাস্তা ধরে যদি যানজট কমানোর কাজ করা হয় তাহলে ফল অপেক্ষাকৃত ভাল আসবে। একবারে সারা ঢাকাকে নিয়ে পরিকল্পনা না করে নির্দিষ্টভাবে কিছু জায়গা নিয়ে কাজ করলেই ভাল হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যে কোন একটি রাস্তা কোন কারণে বন্ধ থাকলে বিকল্প রাস্তা কী হবে- সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে বলেও মনে করেন এ মেয়র।

তেহরান ও বেজিংয়ের মতো একেক দিন একেক নম্বর সারির গাড়ি চালানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগের প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া এক গাড়িতে এক যাত্রী না বহন করে একাধিক যাত্রী বহনের সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কি-না- তাও ভেবে দেখতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় মেয়র আনিসুল হক বলেন, অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করলেও যানজট সমস্যা সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। ঢাকা শহর এখন একটি আইসিইউতে পরিণত হয়েছে। আর মেয়র হচ্ছে সেই ডাক্তার। যে কিনা কখনও ডাক্তারি পড়েনি। অশিক্ষিত ডাক্তার তবুও তার রোগীদের সুস্থ করতে হবে। এতে ভুল হতে পারে, আমি ভুল করতে রাজি আছি তারপরও সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, সারা পৃথিবী গবেষণা ও উন্নয়নে প্রচুর টাকা খরচ করে। কিন্তু যানজট সরকারের কাজগুলো সমালোচনায় বদলে দিচ্ছে। আমার দায়িত্ব হলো- খুব দ্রুত কিছু করতে হবে। অন্তত ৬ মাসে বা এক বছরে যেন একটি সমাধান দিতে পারি। আমরা ইউ-লুপ করতে ৫টি জায়গা পেয়েছি, গাজীপুরে একটিসহ মোট ৬টি জায়গা। সব জায়গা আমরা ইঞ্চি ইঞ্চি করে পর্যবেক্ষণ করেছি। কোথায় কী করলে যানজট কমবে। এছাড়া মাত্র দেড় কিলোমিটার করে রাস্তা সব জায়গায় আলাদা করে দিতে সেতুমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করেন তিনি। এরপর বাস মালিকদের কাছে আহ্বান জানান, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া বাস কোথাও থামবে না- এটা নিশ্চিত করে দিন। রিক্সা, হকার, ফুটপাথ নিয়ে কাজ করার কথা আমাদের মাথায় আছে। ফুটপাথ তুলে দেয়া মুখের কথা নয়। অনেক শক্ত হাত এর পেছনে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি।

সভায় তথ্য ও ধারণা উপস্থাপন করেন বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক, অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন ও স্থপতি তানভীর নেওয়াজ। এ সময় সভায় সরকারের বিভিন্ন কার্যনির্বাহী ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিভিন্ন স্টেক-হোল্ডার, অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খন্দকার গোলাম ফারুক দীর্ঘমেয়াদী ১৩টি সুপারিশ উপস্থাপন করেন।

এর মধ্যে পরিকল্পিতভাবে রাস্তার সম্প্রসারণ ও নতুন রাস্তা তৈরি করে রাস্তার ধারণক্ষমতা বাড়ানো, গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো ও এসবের রুট কমিয়ে পরিকল্পিত রুট পারমিট দেয়া কানেক্টিং সড়ক বাড়ানো এবং বড় বড় হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রধান প্রধান অফিস-আদালত রাজধানী থেকে ডি-সেন্ট্রালাইজেশন করা উল্লেখযোগ্য। এ আলোচনা সভায় যানজট সমস্যার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকনির্দেশনা দেন আলোচকরা।