২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও এক প্লেট খিচুড়ির গল্প!

  • জাকারিয়া স্বপন

একটি নাটকের দৃশ্য। নায়ক বাসা থেকে বের হয়েছেন, যাবেন রাজশাহী। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে দুপুর ২:৪০ মিনিটে ছেড়ে যাবে ট্রেন সিল্ক সিটি। ট্রেনের নামটি বেশ রোমান্টিক। ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে আরাম করে পড়ার জন্য হাতে করে বই নিয়ে নিয়েছেন। আর সঙ্গে যাচ্ছে চাকা লাগানো ছোট কেবিন ব্যাগ। দু’রাতের ব্যাপার। ছোটখাটো কিছু জিনিসপত্র আর ল্যাপটপ। এটুকু নিয়েই রাস্তায় নেমে পড়েন নায়ক।

নিজের গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে পারেন না। বাসার সামনেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তা ব্লক করে বসে আছে। তাদের দাবি, উচ্চশিক্ষা থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিতে হবে। কয়েকদিন ধরে চলছে এই আন্দোলন। আজ আরও কঠিন আকার ধারণ করেছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে তারা বসে পড়েছে। ফলে গাড়ি চলাচল বন্ধ। গাড়ি ছেড়ে দিয়ে নায়ক পায়ে হেঁটে কিছুটা দূর গিয়ে একটা রাস্তা পার হয়ে রিক্সা নিয়ে নিলেন। উদ্দেশ্য একটি স্কুটার যোগাড় করা।

বাসা থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন জ্যামের মধ্যেও ১ ঘণ্টার মতো লাগতে পারে। নায়কের হাতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময়। কিন্তু যখন স্কুটার পেলেন, তখন রাস্তা চারদিক দিয়েই বন্ধ। ফার্মগেট এসে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হলো। কমলাপুর গিয়ে ট্রেন ধরা যাবে কি-না! দ্রুত মত পাল্টিয়ে স্কুটারকে বললেন, এয়ারপোর্ট স্টেশনে চলেন। ওটা তো হাইওয়ে। ওটা খালি থাকতে পারে। একবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পার হয়ে যেতে পারলে, তারপর সমস্যা হবে না। ততক্ষণে ট্রেনেরও আসতে কিছুটা সময় লাগবে।

ফার্মগেট থেকে খুব দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর অফিস পার হয়ে, জাহাঙ্গীর গেট বাঁয়ে রেখে উড়াল সেতুতে উঠে নায়ক বেশ স্বস্তি অনুভব করছেন। তিনি একটু মুচকি হেসে স্কুটারওয়ালাকে বললেন, দেখেছেন কেমন বুদ্ধি করলাম। কত তাড়াতাড়ি চলে এলেন!

ড্রাইভারও মধুর একটি হাসি দিয়ে বলেন, হ।

নায়ক নিজের কৃতিত্ব দেখাতে বলেন, এবার জোরে একটা টান দেন। পনেরো মিনিটে এয়ারপোর্ট।

স্কুটারের চালক বেশ জোরে একটা টান দিয়ে বনানী জ্যামে পড়লেন। ওখানে অনেকটা সময় পার করে দেখা গেল, সামনে পুরোটাই খালি। কিছু বাস এলোমেলো করে রেখেছে বলে পুরো রাস্তা জ্যাম হয়ে আছে। এই রাস্তায় ছাত্র-ছাত্রীদের কোন অবস্থান নেই। তবুও ৩ মিনিটের পথ ৩০ মিনিট খেয়ে নিয়েছে এই অল্প একটু রাস্তা। বনানী পার হয়ে আবার দ্রুত চলতে শুরু করে স্কুটার। এক টানে রেডিসন হোটেল পার হয়ে পাম ভিউ রেস্টুরেন্টের সামনে এসে আটকে যায় পুরো ঢাকা শহর।

টুক টুক করে এগোতে থাকে স্কুটার। রাস্তার ফুটপাথে মানুষকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। বার বার হাতের ঘড়ি দেখছেন নায়ক। ট্রেন তো ছেড়ে দিয়েছে। কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠেছেন আরিফ হাসনাত। তিনি ফোন করে জানালেন, ট্রেন যথাসময়ে ছেড়ে দিয়েছে। আপনার আর কতক্ষণ লাগবে?

নায়ক বললেন, আরও পনেরো মিনিটের মতো লাগতে পারে।

আরিফ হাসনাত ওদিক থেকে বললেন, ঠিক আছে। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পৌঁছাতে ৩০ মিনিটের মতো লাগবে। অসুবিধা হবে না।

নায়ক স্কুটার থেকে নেমে সামনে দেখার চেষ্টা করেন। হাজার হাজার মানুষ হেঁটে হেঁটে উল্টো দিক থেকে আসছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই সামনের জ্যাম কেমন?

পথচারী বললেন, ছাত্ররা রাস্তা বন্ধ করে রাখছে। গাড়ি যাওয়ার উপায় নাই।

নায়ক আর দেরি করলেন না। স্কুটারের চালককে পুরো টাকা এবং বকশিশ দিয়ে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে এলেন তিনি। পথচারীদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেন।

রাস্তার বাঁ দিকে বেশ গাছপালা। মোটামুটি ঠা-ায় হেঁটে নায়ক চলে আসেন হোটেল রিজেন্সি পার হয়ে আরেকটু সামনে নতুন যে হোটেলটি হয়েছে ‘লা মেরিডিয়ান’-এর সামনে। কিন্তু এয়ারপোর্ট স্টেশন তখনও অনেক দূর। অবস্থা বেগতিক দেখে নায়ক এয়ারপোর্ট সড়কের ডিভাইডারের ওপর দিয়ে পার হয়ে চলে গেলেন রাস্তার অন্য পাশে। কারণ, স্টেশনটা ওইদিকে। তাছাড়া ওইদিকে লোকের ভিড় কম। তাড়াতাড়ি হাঁটা যাবে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আর হাঁটার সময় থাকল না। ট্রেন ধরার জন্য রীতিমতো দৌড়াতে শুরু করলেন নায়ক। প্রচ- রোদ, প্রখর সূর্যের তাপে নায়কের নরম শরীর মোমের মতো গলতে শুরু করেছে। ঘেমে ইতোমধ্যেই গোসল করা হয়ে গেছে। তখনও রেলস্টেশন দেখা যাচ্ছে না। নায়ক দ্রুততম গতিতে হাঁটছেন। তার ডান হাতে ট্রলি ব্যাগ, আর বাঁ হাতে ধরা ক্রিসান ব্রেননানের লেখা আত্মজীবনী ‘দি বাইট ইন দি এ্যাপলে মেমোর অব মাই লাইফ উইথ স্টিভ জবস’।

প্রতি মুহূর্তে নায়কের মনে হচ্ছে, তিনি যে কোন সময় রাস্তায় পড়ে যেতে পারেন। শরীর আর চলছে না। কয়েকটি রিক্সা একই দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কোনটাই খালি নেই। প্রতিটিতেই কেউ না কেউ আছেন। একবার ভাবেন, একজনকে অনুরোধ করবেন, একটু লিফট দিতে পারেন কিনা! কারও সাহায্য চাইতে অভ্যস্ত নন নায়ক। লজ্জায় আর সেটা চাওয়া হয় না। ক্রিং ক্রিং শব্দ করে রিক্সাগুলো চলে যায় সামনে। আবারও ঘড়ি দেখেন নায়ক। এত কাছে এসে ট্রেন মিস করার কোন অর্থ হতে পারে না। দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে আরও জোরে পা চালাতে শুরু করেন। ওদিক থেকে আরিফ হাসনাত আবারও ফোন দেন, আপনি এখন কোথায়?

নায়ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, স্টেশন দেখতে পাচ্ছি।

আরিফ হাসনাত আবার বলেন, ট্রেন তো বনানী ছেড়ে গেছে। যে কোন সময় বিমানবন্দর পৌঁছে যাবে। আমাদের বগি নম্বর ‘খ’।

নায়ক আর কথা না বাড়িয়ে আরও জোরে দৌড়াতে থাকেন। একটু পর একটি ভ্যান যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। তাতে একটি জায়গা খালি ছিল। তাকে অনুরোধ করেন, যেন একটু স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যায়।

ভ্যানের চালক একটু সদয় হন। নায়ক চট করে ভ্যানে উঠে পড়ে। জিজ্ঞেস করে স্টেশন আর কতদূর। আর ৩-৪ মিনিট লাগতে পারে, জানালেন আরেক যাত্রী। ভ্যানে উঠে নায়কের মনে হলো, যে কোন মুহূর্তে হার্ট এ্যাটাক হতে পারে। হার্ট খুব দ্রুত পাম্প করছে। দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ছেন তিনি।

এভাবেই স্টেশনের আরেক প্রান্তে এসে থামল ভ্যান। নায়ক পকেট থেকে কিছু টাকা দিয়ে আবার দৌড়ালেন স্টেশনের দিকে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা রেখে দেখেন সবাই লাইন দিয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। একজনকে কোনরকমে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই খ-বগি কি এইদিকে, নাকি শেষ মাথায় হবে?

তিনি হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই সামনের দিকের বগি। একদম ওই মাথায় চলে যান।

নায়ক আবারও জিজ্ঞেস করেন, যে কোন একটাতে উঠে গেলে ভেতর দিয়ে যাওয়া যাবে না?

লোকটি মাথা নাড়িয়ে বললেন, নাহ, ওইগুলো এসি বগি। ওইগুলোতে যাওয়ার রাস্তা নেই। আপনি ওই মাথায় চলে যান।

জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে শরীরকে টেনে নিয়ে গেলেন স্টেশনের আরেক প্রান্তে। ঠিক তখনই আরেক প্রান্ত দিয়ে ট্রেন প্রবেশ করতে শুরু করেছে প্ল্যাটফর্মে। নায়ক সামনের দোকানিকে কিছু টাকা দিয়ে ঠা-া পানির বোতল দিতে বললেন। ফিরতি টাকা গুনে দেখার সময় নেই। সেই পানি, ট্রলি আর বই হাতে যখন ট্রেনে উঠতে যাবেন, তখন সবাইকে ধাক্কা দিয়ে নায়ককে ট্রেনে তুলে নিলেন আরিফ হাসনাত। মুহূর্তেই ট্রেন চলতে শুরু করেছে।

এসি রুমে ঢুকে প্রাণে রক্ষা পেলেন নায়ক। ডগ ডগ করে বোতলের ঠা-া পানি শেষ করে বুঝতে পারলেন, জীবন রক্ষা হয়েছে। আপাতত হার্ট এ্যাটাক হচ্ছে না। ট্রেনে নায়কের সঙ্গে আমার দেখা। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগছে?

নায়ক মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, মন্দ না।

আমি তাকে বললাম, এই কষ্টের কোন অর্থ আছে?

নায়ক আবারও সেই মুচকি হেসে বলেন, হেরে না যাওয়ার নামই তো জীবন, তাই না?

আমি বললাম, আজ তো না গেলেও চলত। কাল বিমানে আসতে পারতেন! আপনি তো রাস্তায় কলাপস করে যেতে পারতেন!

তিনি বললেন, হুম অলমোস্ট কলাপস করার মতো অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু রওনা হয়ে গেছি, আমার সবটুকু চেষ্টা তো করতে হবে। নইলে মনে হবে, আরেকটু চেষ্টা করলেই হয়ত ট্রেনটা মিস করতাম না।

আমিও নাছোড়বান্দা। আমি দেখতে পাই, নায়কের প্যান্টের অনেক জায়গায় ময়লা লেগে গেছে। জিজ্ঞেস করি, আমেরিকার সুখ ছেড়ে এই বঙ্গে এসে এমন পরিশ্রম করছেন কেন?

একই ভঙ্গিতে মুচকি হেসে বলেন, ঋণ শোধ করতে।

আমি বলি, কিসের ঋণ আপনার?

তিনি একইভাবে বলেন, এই যে আজকের আমি। চাইলেই পৃথিবীর যে কোন জায়গায় যেতে পারি, থাকতে পারি। এটা তো এমনি এমনি হয়নি। পুরোটা তো আর আমার নয়!

আমি বলি, টাকা দিয়ে দিন। আমেরিকায় আয় করুন, আর দেশে টাকা পাঠান। অনেক করা হবে।

তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, টাকা দিয়েই বুঝি সব ঋণ শোধ হয়ে যায়?

আমি উত্তরে বলি, নাহ তা হয় না। কিন্তু আপনার সেই ঋণ কি এতদিনে শোধ হয়নি?

বাঁকা হাসিতে তিনি বলেন, মা আর মাতৃভূমির ঋণ কি কখনও শোধ হয়!

দুই.

দীর্ঘ ২৬ বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি সংগঠন চালু করেন আরিফ হাসনাত। তখন সংগঠনটির নাম ছিল ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদপত্র পাঠক ফোরাম’। নাম থেকেই বোঝা যায়, এর কাজ কী হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সংবাদপত্র পড়বে, তাদের একটি সংগঠন। আজকের দিনে অনেকের হাসি পেতে পারে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সংবাদপত্র তার সেই মায়াবী আবেগ হারিয়ে ফেলেছে। তাই সময়ের বিবর্তনে প্রতিষ্ঠানটির নাম এই বছরই পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরাম।’

২৬ বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠান ধরে রাখা খুব সহজ কোন বিষয় নয়। এর জন্য কতটা শক্ত কমিটমেন্টের প্রয়োজন সেটা সেই ব্যক্তিটি ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। কঠিন সেই প্রতিশ্রুতি। একা একা সেই লম্বা পথ হাঁটা যায় কিনা, আমি জানি না। আরিফ হাসনাতের হাত ধরেছেন তার সহধর্মিণী দিবা হাসনাত। ট্রেনের কামরায় সেই গল্পই করছিলেন খুলনার মেয়ে দিবা।

পাঠক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আরিফ হাসনাত, তার স্ত্রী দিবা আর মেয়ে ঐশ্বরিয়া আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাঠক ফোরামের ২৬ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে। ফোরামের কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খুশি হয়ে তাদের নিজস্ব ভবন করার জন্য একটি জায়গা দিয়েছে। তারই নামফলক উন্মোচন করা হবে। একই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরুপাক্ষ পাল এবং সময় টেলিভিশনের বার্তা প্রধান তুষার আবদুল্লাহ। আমাদের সবার একই ট্রেনে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকারী কাজে বিরুপাক্ষ পাল আটকে গেছেন। তাই পরের দিন বিমানে করে তাকে নিয়ে আসবেন তুষার।

দিবা আর আরিফ একটার পর একটা গল্প করে যাচ্ছেন। কিভাবে জন্ম হলো পাঠক ফোরামের, কিভাবে সদস্য সংগ্রহ করা হতো, জায়গা নেই, অফিস নেই, স্টেডিয়ামের অসংখ্য রুমের মধ্যে কিভাবে একটি রুম তারা পেয়েছিলেন, কিভাবে শীতের রাতে মাটি কেটে এনে পচা ড্রেনের পানির ওপর মাটি ভরাট করেছিলেন, কিভাবে ফুলের চারা এনে লাগিয়েছেন, গাছ লাগিয়েছেন, গাছের নিচে খোলা আকাশের নিচে কিভাবে প্রতিদিন ক্লাস করে শত শত ছাত্রছাত্রীÑ এমন অসংখ্য গল্প।

আরিফ দম্পতি ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছেন অনেক আগে। কিন্তু এখনও প্রতিবছর বর্ষপূর্তিতে হাজির হন তারা। ঢাকা থেকে যাবতীয় সাপোর্ট দিয়ে যান সংগঠনটিকে। প্রতিবছর নতুন নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়। কিন্তু তাদের সঙ্গে আত্মার মতো লেগে থাকেন আরিফ হাসনাত পরিবার। এমনকি এখনও ঢাকায় নিজের বাসার সমস্ত রিসোর্স প্রয়োজনে দিয়ে দেন ফোরামের জন্য। এক ধরনের পাগলামি ছাড়া এটা হতে পারে বলে আমি মনে করি না। এটা পাগলামি, স্রেফ পাগলামি!

দিবা বলছিলেন, প্রতিবছর যখন তারা ঢাকা থেকে রাজশাহী যান, বর্ষপূর্তির সময় ফোরামের সদস্যরা একটি রাতে খিচুড়ি রান্না করে সবাই মিলে খায়। সেই রাতে মোটামুটি সবাই উপস্থিত থাকেন। আজ যেমন আমরা গিয়ে রাজশাহী পৌঁছাব, আজও রাতে রান্না হয়ে গেছে খিচুড়ি। আমরা সেই খিচুড়ি খেয়ে তারপর হোটেলে যাব।

কয়েক বছর আগে দিবা এমন খিচুড়ি খেতে বসেছেন। তিনি খেয়াল করলেন, খিচুড়ির ভেতর তেমন কোন মাংস নেই। সঙ্গে তো আর কোন তরকারিও নেই। শুধু ওই একটু মাংস দিয়ে একসঙ্গে রান্না করে ফেলা খিচুড়ি কিংবা খিচুড়ির ভেতর দিয়ে রাখা কিছু মাংস। দিবা বুঝতে পারলেন, মাংস কেনার মতো টাকা ফোরামের নেই। সেই থেকে এই খিচুড়িটা তিনি স্পন্সর করে আসছেন। একটা খাসি কেনার টাকা তিনি দিয়ে আসছেন।

রাত ১০টায় সিল্ক সিটি তার শহরে পৌঁছে গেল। মাইক্রোবাসে করে স্টেশন থেকে পাঠক ফোরামের অফিসে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে দশটা। ফোরামের জন্য যেন ঈদের অনুষ্ঠান। বেলুন আর রঙিন কাপড় দিয়ে তোরণ বানানো হয়েছে। আমাদের একদল তরুণ মুখ ফুল দিয়ে স্বাগত জানাল। আমি আমার স্বভাব বশত তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই বয়স আমারও ছিল, এই ছাত্রজীবন আমারও ছিল! কিন্তু আমি কি দেখতে এত পিচ্চি ছিলাম! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের এত ছোট ছোট লাগছে কেন!

স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচে যে দোকান করার জন্য রুম বানানো হয়, তেমন কয়েকটি রুম নিয়ে কাজ চলে পাঠক ফোরামের। ছোট্ট ছোট্ট ঘর, অফিস। ওর ভেতরই ওরা পত্রিকা পড়ে, কম্পিউটার শেখে, ক্লাস হয় খোলা আকাশের নিচে, বৃষ্টির সময় চলে যায় পাশের আরেকটি ভাঙ্গা কক্ষে! তবুও যেন কত আনন্দ ওদের। সেই ছোট ছোট পবিত্র মুখ তাদের বিশাল হৃদয় দিয়ে আমাদের গ্রহণ করল তাদের ভাঙ্গা আঙ্গিনায়।

আমরা সবাই মিলে খেতে বসলাম। ছোট প্লেটে করে খিচুড়ি দিল সবাইকে। শ’খানেকের বেশি ছাত্রছাত্রী হবে। আজ রাতে কারও যেন বিয়ে হবে! আমার হাতে খিচুড়ির প্লেট দিয়ে গেল এক ছাত্রী। আরেকজন নিয়ে এসেছে হাত ধোয়ার প্লেট। আমি হাত ধুয়ে খিচুড়ির প্লেটটি সামনের চেয়ারে রাখলাম। বেশি কিছু ছবি তুললাম। হলুদ রঙের সেই খাবারের ভেতর অসংখ্য মাংসের টুকরো দেখে মনে হলোÑ এটা তো শুধু এক প্লেট খিচুড়ি নয়, এটা অসংখ্য মানুষের, অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন। এর প্রতিটা দানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওদের পরিশ্রম আর স্বপ্নের ছোঁয়া। এর মসলার ভাঁজে লুকিয়ে আছে আগুনে পোড়া অশ্রুজল। আমি অল্প অল্প করে সেই পাত্র থেকে খাবার খেতে থাকি। প্রতিটি দানা আমার কাছে একেকটি মুক্তোর কণার মতো হতে থাকে। কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে এমন খিচুড়ি আমি অনেক দিন খাইনি। তোমরা যারা এই খিচুড়িটুকু তৈরি করেছ, তোমরা কি জান, তোমাদের ক্ষমতা কী অসীম? তোমাদের এই ভালবাসার ঋণ কখনই শোধ হবে না! সব ঋণ শোধ করতেও নেই!

তিন.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এমন ছবির মতো সুন্দর আমার জানা ছিল না। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে দেখা হয়নি পুরো দেশটা। আমার ধারণা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সবচে সুন্দর। এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখে আমার সেই ধারণা পাল্টে গেছে। যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছের ছায়ায় শীতল হয়েছে, ক্যাম্পাসের নীল আকাশে মুগ্ধ হয়েছে, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে স্নাত হয়েছে তাদের মতো সৌভাগ্য আর কারও হতে পারে না। আমি জানি, এই পৃথিবীর সবার কাছেই তাদের ক্যাম্পাস অতি প্রিয়। কিন্তু নিরপেক্ষ বিচারে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিশালতা আছে, তা পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। আমি হার্ভার্ড দেখেছি, এমআইটি দেখেছি, স্টানফোর্ড দেখেছি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া দেখেছি আর প্রায় ৬০ হাজার ছাত্রছাত্রীর ক্যাম্পাস টেক্সাস এএ্যান্ডএমে পড়েছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দিক থেকে তাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। একটি ধনী দেশের ক্যাম্পাস হওয়ায় তাদের বাড়তি কিছু বিষয় আছে যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ত নেই। কিন্তু এর গ্র্যান্ডনেস যে কাউকে মুগ্ধ করবেই।

তবে একটি বিষয় আমাকে সবসময়ই পীড়া দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। তাহলো, বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়কেও আমরা আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে আনতে পারলাম না। এটা খুব দরকার ছিল। এত বিশাল জনসংখ্যার একটি দেশ অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের কোন স্থান করে নিতে পারেনি। কোন একটি সরকার যদি হাতে ধরে একটি বা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সকল র‌্যাঙ্কিং প্যারামিটার ধরে ধরে সেগুলো পূরণ করে দিত, তাহলে আমরা গর্ব করে বলতে পারতাম, আমাদের দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকমানের। এই দেশে কেন এই কাজটি করা হয়নি, তা আমি জানি না। সরকার এই দিকে একটু নজর দিতে পারে।

চার.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার হাজার ছাত্রছাত্রীর সামনে আমাকে বক্তৃতা করতে বলা হলো। এত বিশাল উপস্থিতি থাকবে, আমার ধারণা ছিল না। মূল অডিটরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। বাইরে দাঁড়িয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী। সেই ছাত্রছাত্রীদের আমি যা বলেছিলাম, তার সারমর্মটুকু এখানে অন্যদের জন্য লিখে দেই।

আলোচনার বিষয় ছিল, মুক্তবাজারে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যক্তিগত প্রস্তুতি। আমি ভাল আলোচক নই। স্টেজে দাঁড়িয়ে ভাল বক্তৃতা করা আমাকে দিয়ে হয় না। তার চেয়ে আমি বেশি উপভোগ করি সরাসরি ইন্টার এ্যাকশন। তাই আমি মাইক্রোফোন নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে যাই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। আমি স্টেজ থেকে মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। এখন আমি তাদের মুখ দেখতে পারছি, তাদের চোখের আলো দেখতে পারছি, তাদের ভালবাসার উত্তাপ অনুভব করতে পারছি।

আমি বিশ্বাস করি, এই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভাল করতে হলে সবচে বেশি যে প্রস্তুতি প্রয়োজন তাহলো ব্র্যান্ড তৈরি করা এবং তা অবশ্যই ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড। এই পৃথিবীর সকল মানুষ আলাদা। তাদের নিজস্বতা আছে, স্বকীয়তা আছে। প্রতিটি মানুষ নিজেই নিজের একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারে। যেমন, কেউ ভাল লিখতে পারে, কেউ ভাল গাইতে পারে, কেউ ভাল ছবি আঁকতে পারে, কেউ ভাল বক্তৃতা করতে পারে ইত্যাদি। তার এই বিশেষ গুণটিকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হতে পারে তার নিজস্ব ব্র্যান্ড এবং বিশ্বের যে কোন জায়গায় সেই ব্র্যান্ডটিকে সে বিক্রি করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে ভাল মূল্যটিও পাবে। নইলে, সে হারিয়ে যাবে হাজারো মানুষের ভিড়ে।

তবে ব্র্যান্ড মানেই কিন্তু এই নয় যে, প্রচার। অনেকেই মনে করতে পারেন, ব্র্যান্ড তৈরির জন্য প্রচার প্রয়োজন। বিষয়টি কিন্তু তা নয়। ব্র্যান্ড তৈরি করতে হয় কঠিন পরিশ্রম আর একাগ্রতা দিয়ে, মান দিয়ে। ক্যাম্পাসে আপনাকে সবাই জানে, আপনি ভাল গিটার বাজাতে পারেন। এটাই আপনার ব্র্যান্ড। তবে, এর মান যত বেশি ভাল হবে, আপনি ততবেশি ওপরে উঠতে পারবেন।

ছাত্রজীবনে ব্র্যান্ড তৈরি করার একটি সহজ উপায় আছে। সেটা হলো, মিথ্যা কথা না বলা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ উঠতে-বসতে মিথ্যা কথা বলে। প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় মিথ্যা। দরকার নেই, তবুও বলে। অনেক সময় সে বুঝতেই পারে না যে, মিথ্যা বলছে। মিথ্যা তার রক্তের সঙ্গে এমন গভীরভাবে মিশে গেছে যে, মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়ত মিথ্যা বলে যাচ্ছে এবং সে মনে করছে, ঝামেলা এড়ানোর জন্য এটুকু বলতেই হয়। এই মিথ্যা কোন বিষয়ই নয়। কিন্তু একবার কি কেউ ভেবেছে, আজ থেকে যদি সে মিথ্যা বলা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তার ব্র্যান্ড কতটা ওপরে উঠে আসবে? ক্যাম্পাসের সবাই জানবে, এই ছেলেটি কিংবা মেয়েটি মিথ্যা বলে না। এর চেয়ে বড় ব্র্যান্ড আর কী হতে পারে!

যারা নিজের একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাও, তোমরা আজ থেকে মিথ্যা বলা বন্ধ করে দাও। অকারণে আর মিথ্যা বল না। এক মাস চেষ্টা করে দেখ। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হবে। কিন্তু একবার সেই পাহাড় কাটিয়ে উঠতে পারলে, দাঁড়িয়ে গেলে নিজের পায়ে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যদি এই দেশকে পাল্টে দিতে চায়, তাহলে তাদের আগে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে। আর তখনই তারা বুঝে ফেলবে, এই পৃথিবী কিভাবে চলে। বাকিটা পথ তারা নিজেরাই হেঁটে যেতে পারবে।

গুডলাক কিডস!

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স