২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘুরে এলাম বিপ্লবী বাঘা যতীনের আত্মবলিদান ভূমি

ঘুরে এলাম বিপ্লবী বাঘা যতীনের আত্মবলিদান ভূমি

লিটন আব্বাস ॥

৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

কয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়া, বেনাপোল, বাংলাদেশে থেকে পেট্টাপোল, বনগাঁ, দমদম, হোটেল অতিথি ইন কলকাতা, ভারত ।

ভারতের উড়িষ্যার বুড়িবালাম নদীর তীরে দুইবাংলার মিলনমেলায় বিপ্লবী বাঘা যতীন মৃত্যুশতবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সফরে বেনাপোল সীমান্ত পার হলেই অভ্যর্থনার শুরু। ফুলের তোড়া দিয়ে আমাদের বরণ করে নিল বরণবালার বারীষ।

যেতে যেতে কোল্ডড্রিংকস, চিপস গাড়িতে চলছে। আমাদের নিতে কলকাতা থেকে ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল এন্ড কালচারাল স্টাডিজ ভারতের পক্ষ থেকে লেখক অর্ণব নাগ বর্ডারে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন দুটো জিপ নিয়ে।

যারপরনাই আনন্দে কল্পনারা আর উল্টো পথে হাঁটলো না। কল্পনাও কখনো মিলে যায় বাস্তবতায় অন্তত কাব্যময়তার সাথে।

জানার বিষয় যেটা বনগাঁ পার হয়েই বারাসাত সেখান থেকেই যশোহর রোড আরম্ভ সুদূর দমদম এয়ারপোর্ট অবধি একেবারে কলকাতার কোল ঘেষে শেষ হলো এ রাস্তা-মনটা মজতে শুরু তখন থেকেই।

বারাসাতের বামনগাছির হোটেল অর্কিডে দুপুরের লাঞ্চ সেরে নিলাম সফরে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা এটিএম আবুর মনছুর মজনু, খান জালাল উদ্দিন, আ: হক, মো: কামরুল ইসলাম(লিটন আব্বাস), শহীদুল ইসলাম, হোসনেয়ারা, মেরী, হামিদুল ইসলাম, রাশেদ খান মেনন, আ: লতিফ এবং ঢাকা থেকে আগে থেকেই এসেই অপেক্ষা করা একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমুর্ল কমিটির রুবেল ও পরাগ। বাংলাদেশের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের প্রধান একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বাঘা যতীন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব কাজী মুকুল আগে থেকেই কলকাতায় আমাদের জন অপেক্ষা করছেন। দুটো গাড়িতে বারজনের বিপ্লবীর মৃত্যুধামে যাওয়া অনেকটাই আন্তিগোনের রোমান্সের মতই শিহরিত। এখানে সেখানে রাস্তার বয়ান বেশ যুঁতসই জবাব এবং আপনা-আপনি বিখ্যাত সব জায়গার এলাকার রাস্তার বিস্তারিত বিবরণ ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল এন্ড কালচারাল স্টাডিজ, ভারত এর অর্নব নাগ যেতে যেতেই আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন। একেবারে দমদম এয়ারপোর্টের পাশে বিগবাজারের উল্টোদিকে হোটেল অতিথি ইন এ আমাদের থাকবার বন্দোবস্ত ছিল এবং সেখানেই সফরের চারদিনের তিনরাত কাটানো। অনেক অভিজ্ঞতা, মজার রাবরী-তুবড়ি, অভিমান, অসুস্থতা মিলিয়ে মন্দ যেতে পারেনা কখনো। সুখস্মৃতি পেখম মেলেছে কেবল।

তাদের আতিথেয়তা, সম্মান সত্যিই লাজবাব। তাদের ভালোবাসা প্রমাণ করে তারা আমাদের অকৃত্তিম বন্ধু...

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫

উড়িষ্যার বালাশোর, চষাখন্ড, ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয়

কলকাতার হোটেল অতিথি ইন থেকে ভোর ৫টার মদ্য সকলেই প্রস্তুত হয়ে থাকি। আমাদের বারো জনের জন ট্রাভেল বাস এবং শাহরিয়ার কবির ও কাজী মুকুল সহ কলকাতার কয়েকজনকে নিয়ে প্রাইভেট গাড়ি রাস্তায় দাঁড়ানো ছিল। আমরা একে একে সবাই নাস্তা না সেরেই উঠে পড়ি। আমাদের সাথে থাকা ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল এন্ড কালচারাল স্টাটিজ, ভারত এর দুজন গাইড অর্নব নাগ ও স্নেহাংশু মমতার ময়দা মিশিয়ে সবকিছু দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। ইন্সটিটিউটের সম্পাদক শ্রী অরিন্দম মুখার্জী সে দায়িত্ব তাদের দিয়ে রেখেছিল্ ওতো ভোরে জুস, আপেল নিয়ে গাড়ি ভর্তি করে চলা শুরু করলাম। সবাই তা খেতে খেতে আনন্দে অজানারে জানার বাসনায় পরম পরিতোষে চলতে চলতে কোলাঘাট এসে থেমে গেলো আমাদের গাড়ি-রাস্তাটা না মায়েরী নাশনাল হাইওয়ে দেখবার মতো মসৃন ধবধবে সিফণ চওড়া বুক পেতে শুয়ে আছে শুধু গাড়ি চলবার অপেক্ষায়। হোটেল এক্সপ্রেস ফুড প্লাজায় নাস্তার বন্দোবস্ত পরিকল্পনায় ছিল বলে সবাই ঢুঁ মেরে ঢুকে গেলো। যে যার মতো ফটোশুট করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে নাস্তা এসে যায়। আলু পরোটা, সবজি, অমলেট, চা পান শেষে আবার তৈরী উদ্দেশ্য একটাই বুড়িবালাম নদীর তীরে উড়িষ্যার বালাশোর পৌঁছানো এক্সপ্রেস ফুড প্লাজাটা দেখতে একবারে ট্রেনের মতো। চিকমিকে ধনীদের প্রাডোর মতো সুন্দর কমনীয় রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। ছুটে চলে ট্রাভেল বাস। ড্রাইভার সাহেব চুপচাপ। কোন তাড়াহুরো, ফোন ধরা বা বকবক মোটেই সাড়ে তিনশো কিলোমিটার যাওয়া এবং আসায় পথে একটা কথাও বলেনি সে। কোন ওভার টেকিং নেই। বাসের মধ্যে আমরা যে যার মতো আড্ডা দিতে থাকি। কেউবা বাইরের দৃশ্য মুগ্ধচোখে অবগাহন করতে থাকে আর সুখ স্মৃতি ঝুলি ভরতে থাকে। পথের মধ্যে পূর্বমেদিনীপুরের কবি দেবশ্রী চক্রবর্তীর সাথে বেশ কথা হতে থাকে। সে বলে উড়িষ্যার জলেশ্বর পার হলেই পাহাড় দেখতে পাবে।‘ আমাদের অপেক্ষা সে পাহারের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মত অমর্ত্য আনন্দ-অপত্য আন্তরিকতায় দু’বাংলার মানুষের মিলনমেলায় এক হয়ে সবার হবার অপেক্ষায় সময়েক্ষপন কেবলি। জলেম্বর ছেড়ে বাস ছুটে চলে বালাশোরের দিকে আর মাত্র ৫০ কিলোমিটার। যেতে যেতে বালাশোরের কাছে ঐ দূরে পাহাড়ের ছিটেফোটাও দেখতে পেলাম না। বেশ খানিকটা লজ্জিত হলাম। পরে অবশ্য বিজনেস পার্কে লাঞ্চ এর জন্যে যেয়ে দোতলা রুমের জানালা খুলে পর্দা সরাতেই পাহাড় দেখে সবাই চমকিত চমকে সুখস্নান সেরে নেয়।

আমরা যখন বালাশোর শহরের প্রবেশ করি দেখতে পাই বেশ কয়েখটি তোরণ, বিলবোর্ড, ফ্লাগ সবই বাঘা যতীন মৃত্যুশত বার্ষিকী ঘিরে। মটরসাইকেল প্রায় শ’খানেক বাইকে এই ফ্লাগ দেখে কয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়ায় ২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া বাঘা যতীন মৃত্যু শত বার্ষিকী অনুষ্ঠানের অপার সুখস্মৃতি ভেসে আসে মননে, মগজে, প্রাণে চাঞ্চল্য বায়ু বইতে থাকে। আমরা মটর সাইকেলের সাথে গাড়ি নিয়ে যেতে যেতে একটা ফোন আসে আবার থেমে ইউটার্ণ করে ওভার ব্রীজ এর কাছে আসি সেখানে মটরবাইকে ফ্লাগ নিয়ে থাকা দুজন আরোহী আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যেখানে নিয়ে গেলো। বাস থেকে থেকে নেমে দেখি সেটা ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয়। ফকির মোহন সেনাপতি উড়িষ্যার একজন প্রখ্যাত লেখক ও কবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে পৌঁছাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও শি¶করা আমাদেরকে উষ্ণ অভর্থ্যনা ফুলেল শুভেচ্ছায় মাতিয়ে রাখেন কিছুক্ষণ। গেস্ট হাউজের রুমে আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে সোজা চিত্রনাট্য মোতাবেক চলে গেলাম বিজনেস পার্ক হোটেল নসিতে। বাংলাদেশি ডেলিগেটদের জন্য বাঙালি কাবার বরাদ্দ ছিল বটে কিন্তু বাসমতি চাউলেল সুঘ্রাণ আর পেস্টি মাংসের, ফিশ ফ্রাই আমদের পেটে খুব একটা গেলেনা। কেউ কেউ কাটা চামচ দিয়ে খেতে থাকে আবার অনেকই হাত লাগিয়ে ডাউলের ঝোলের বাসুমতি চাউলের ভাত উদরপূর্তি করতে থাকে। লাঞ্চ সেরেই মূল অনুষ্ঠান ছিল বালাশোরের মহাত্মা গান্ধি সদনে। আমরা যখন বাস থেকে নামলান। মূল তোরণ দিয়ে ঢুকছি অপেক্ষায় থাকা অরিন্দম মুখার্জীর প্রথম অভ্যথনা আমাদেরকে আন্দোলিত করে এ জন্য যে তার সাথে আমাদের পূর্ব পরিচয় অর্থাৎ গতবছর কয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া ৯৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি ছিলেন এবং দুই বাংলারযৌথ আযোজনে এবারের ২ তারিখের অনুষ্ঠানেও এসেছিলেন ১৪ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি নিয়ে। তার কাছ থেকে পার হতেই অপেক্ষা করা কয়েক হাজার দর্শকরা করতালি আর বিনয়ী জোড়াহাতের সম্মান জানানোর নান্দনিক প্রদর্শন বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের প্রত্যেক হৃদয়ে আনন্দের বান ভেসে যেতে থাকে। তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা আমাদেরকে মুগ্ধ করে। তাদের সম্মান জানানোর কৌশল ভিন্ন। ত্রিমাত্রিক ভাষায় আমাদর মননে বিউগল বেজে উঠে । পার্শ্ব মঞ্চে আমাদের ঠাঁই হলো। মূল মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসাবে আসন গেড়ে বসেন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। অতিথি হিসাবে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন লেঁখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, বাঘা যতীণ পৌত্র ইন্দু জ্যোতি মুখোপাধ্যায়, বালাশোর জেলার জেলা প্রশাসক সনাতন মলি¬ক, কলকাতা চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপাক বিমল শংকর, দুইবাংলায় বাঘা যতীন মৃত্যুশত বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানের অন্যতম রুপায়ক ইন্সটিটিউট অব সোস্যাল এন্ড কালচারাল স্টাডিজ, ভারতের সম্পাদক শ্রী অরিন্মদ মুখার্জী প্রমুখ। প্রায় আড়াই হাজার দর্শকদের উপস্থিতি সেখানকার স্থানীয় এমএল এ, প্রাক্তন মন্ত্রী, বিশিষ্টজন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের শি¶ক সহ সুধীমহলের আনাগোনায় পুরো অনুষ্ঠান অন্যরকম অনুভূতিতে বাঙময় হয়ে ফোঁটে। অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালনার সাথে সাথে বাবুল সুপ্রিয় মনোমুগ্ধকর বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকের মনোরঞ্জন করেন। বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের সবাইকে শুভেচছা সহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিপ্রবী বাঘা যতীনকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান জানিয়ে শেষে দুটো জনপ্রিয় গান গেয়ে তিনি প্রস্থান করেন কলকাতায় সংগীত বিষয়ক কাজ থাকায়। এরপর বক্তব রাখেন বাঘা যতীন পৌত্র ইন্দুজ্যোতি মুখোপাধ্যায়, শ্রী অরিন্দম মুখার্জী ও বাঘা যতীন মুত্যু শত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির প্রধান সমš^য়কারী একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সভাপতি, লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। এর মধ্যে সাইড মঞ্চে বসে থাকা আমাদেরকে ব্যাচ, ফুলের তোড়া উপহার এবং বালাশোরের সুধীজনদের দিয়ে উত্তরীয় পড়িয়ে দেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন চলি¬শজন সাইকেল আরোহী বাঘা যতীন মৃত্যুশত বার্ষিকী ঘিরে বালাশোর থেকে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার পুরিতে যেয়ে শেষ করবে প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীনতার ইতিহাসের এক আত্মবলিদানের খবর পৌঁছে দিতে অনুষ্ঠান মন্ডপ থেকে শুরু করে তাদের পুরিতে যেযে শেষ করা। তাদের উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক স্বাগত জানিয়ে উৎসাহ প্রদান করেন। তারা কিছুক্ষণ থেকে সাইকেল শোভাযাত্রায় ফ্লাগ বেঁধে নিয়ে পুরির উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়ে গেলো। তাদের এমন ব্যত্যয় পরিকল্পনা সত্যিই কসমিক উইলো। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রদর্শন করে স্থানীয় শিল্পীরা। উড়িয়া ভাষায় সংগীত অনেকটা বাংলা ভাষার মতই প্রাঞ্জল ও রিদমিক। অনেকই বলেন উড়িয়া আর বাংলা ভাষা হলো ভাই-বোন। ওদের প্রথম অংশটা বাংলা- শেষের অংশটুকু অন্যরকম সেটাই উড়িয়া। সন্ধ্যার আগেই অনুষ্ঠান শেষ হবার সাথে সাথে আবার বেরিয়ে পড়া সেই ঐতিহাসিক কাপ্তিপোদার চষাখন্ড জঙ্গলে যেথায় বিপ্লবীর ইহধাম,

ভারতীয় প্রতিনিধি, আয়োজকদের সাথে আমরা ১৪ জন বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল। বালাশোর শহর থেকে অনুমান ২০ কিলোমিটারের মত পথে জিপ গাড়ি ও প্রাইভেটে আমাদের ছুটে চলা। যেতে যেতে একটা গ্রাশীন হাট-বাজার দেখা গেলো সেখানে কিছু হাড়ি-পাতিলে মাঠা জাতীয় পসরা সাজিয়ে মানুষ বসে আছে। দুরন্ত বেগে ছুটে চলা গাড়ির ভিতর থেকে যেটুকু দেখলাম পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারিনি। এই বাজারটা পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই চষাখন্ডের দিকে টার্ন করলো গাড়িগুলো। কিছু্ক্ষন যেতেই সেই ঐতিহাসিক জঙ্গল। শিহরণ তখনো বর্তমান। একেবারে কাছে যেয়ে গাড়ী থেকে নেমে বেশ বড় তোরণ দাঁড়িয়ে আছে ফুলেল সাজে। আমরা একে একে ভেতরে ঢুকলাম। বাঘা যতীনের ফ্লাগ, প্রতিকৃতি সহ অনেক কিছু দেখলাম্ সেই পুকুরটি এখনো অগ্নিযুগের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।

ব্রিটিশ বিরোধী যুগান্তরের নেতা ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতার সূর্য সন্তান অগ্নিযুগের মহানায়ক বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন) ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর গোধূলিলগ্নে উড়িষ্যার বালাশোরের কাপ্তিপোদার চষাখন্ড জঙ্গলে চারকিশোর মাদারীপুরের চিত্তপ্রিয় রায় চৌধুরি, মনোরঞ্জন সেন গুপ্ত, নরেন্দ্র নাথ দাস গুপ্ত (নীরেন) ও কুষ্টিয়ার যতীন পাল (জোতিষ)এর সাথে সাথে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিলবি এবং সেনাপ্রধান ট্রেগার্ট বাহিনীর কয়েকহাজার সৈন্যের সাথে লড়াই করে আড়াইঘন্টা মতান্তরে সাড়ে তিনঘন্টা ব্যাপী। ঘটনাস্থলে চিত্তপ্রিয় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। বাঘা যতীন গুলিবিদ্ধ হন অপর তিনকিশোর তাদের হাতে ধরা পড়েন গুলি খতম হবার পর। বাঘা যতীন পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর বালাশোরের সামরিক হাসপাতালে ইহলোক ত্যাগ করেন। ঐ বছরের ৩ ডিসেম্বর মনোরঞ্জন ও নীরেনের ফাঁসি হয়। জ্যোতিষ পালকে আন্দামান দীপে নির্বাসন দিয়ে পরে নির্যাতন করলে পাগল হয়ে মৃত্যুবরন করে। সেখানে বাঘা যতীনের প্রতিকৃত্তি সহ ভাস্কর্য রয়েছে। উড়িয়া ভাষা ও ইংরেজিতে দর্শনাথীদের জন্য সাইনবোর্ড আছে। এটি এখন পার্কে রূপান্তরিত। পুরো জঙ্গল ঘুরলাম। সেই ঐতিহাসিক পুকুরটি এখনো বহাল তবিয়তে নতুন প্রজন্মকে আহবান করে যাচেছ দেখে যাও হে উত্তর প্রজন্ম দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কেমন ত্যাগ আর রক্ত ঝরাতে হয়। বিপ্লবীর স্মৃতি বিজড়িত এই জঙ্গল বাদে চারপাশে আর কোন কিছূ নেই শধু সবুজ ধানক্ষেত বিছানা পেতে শুয়ে আছে।

বিপ্লবী বাঘা যতীন নিজেই বলেন, দেশের সুরাহা বাইরে থেকে নয়, তা আসবে অভ্যন্তর থেকে। আর পালানো নয়...যুদ্ধ করে আমরা মরব, এতেই দেশ বাঁচবে। অন্তিম নি:শ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে তিনি বলেন, আমরা মরব, দেশ জাগবে। “ কয়া গ্রামে বিপ্লবীর জন্মভিটায় গেলে যেমন অনুভূতি ঠিক তেমনি বালাশরের চষাখন্ড যেয়ে একই স্বাদ আস্বাদন করি। অন্তর ভেজে, মন পোড়বার আগে গলে।

কিছুক্ষন থেকে চলে আসতে হয় সিডিউল মোতাবেক অন্যান্য প্রোগ্রাম থাকায়।

সন্ধ্যার পর হোটেল নসিতে নাস্তা চলে। নাস্তার পর ডিনারের আগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয় গেস্ট হাউজে। রাত সাড়ে আটটার দিকে আবার ট্রাভেল বাসে এনওসিসিআই(নসি)তে ডিনার সেরে নিলাম একসাথে বাংলাদেশি চৌদ্দ প্রতিনিধি দল ও ভারতীয় প্রতিনিধিরা। খাবারের পর নসির সামনে উতকলা মঞ্চে যেয়ে বসলাম। রাত তখন দশটার মতো। ঝিরঝিরে হাওয়া ভ্যাপসা গরমকে গিলে ফেললো কিছুক্ষনের জন্য। কেননা থাকবার জায়গা, গাড়িতে এসি থাকায় কলকাতা ও উড়িষ্যার গরম খুব একটা অতিষষ্ঠ করতে পারেনি আমাদের। উতকলা মঞ্চে নাটক, অনুষ্ঠান চলে প্রায়ই আমাদেরকে জানাচ্ছিল এ খবর সেখানকার স্থানীয় দু ছাত্র আশুতোষ ও রেশমি। ওদের সাথে আধভাঙা হিন্দি চললো কিছুক্ষণ। এ নিয়ে হাসাহাসি। আমাদের সাথে থাকা একাশি বছরের তরুন প্রাণজীব খার জালাল উদ্দিন কলকাতা আসা অবধি আধো হিন্দি আধা ইংরজি মিশিয়ে সবখানে বেশিকথা, চুপকথা ঝেরে গেলেন । তিনি আমাদেরকে সবসময় মাতিয়ে রাখতেন। একজন একাশি বছরের মানুষ কিভাবে তরুন থাকে সেটা শুধু বাহ্যিক কালারফুল টিশার্ট পড়েই বোঝালেন না অন্তরেও ভেদ ভেঙে বুঝিয়ে দিলেন সবাইকে। সবাই বেশ মজারু আড্ডায় মেতেছিলেন কদিন।

উতকলা মঞ্চ থেকে বাসে চেপে ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয় গেস্ট হাউজে রাত্রি যাপন । শোবার আগে বলে দেয়া হয়েছে সকাল ৬টার মধ্যে তৈরী থাকতে। বালাশোর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে চাঁদিপুর সী-বিচ। সেখানে বারো ঘন্টা পর পর জল যাওয়া আসা করে। ব্যস। আমি এতটাই ক্লান্ত তার আগে মজনু চাচা ভীষণ অসুস্থ থাকায় একজন সঙ্গী পাওয়ায় পরম তৃপ্ততার সাথে ক্লান্ত বিছানায় এলানো মানেই ঘুমিয়ে পড়া। (চলবে)

লেখক ॥ কলামিস্ট, নাট্যকার