১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মক্কা ছেড়ে মিনার পথে হাজিরা ॥ হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু কাল

  • বাবুল হোসেন, মক্কা থেকে

পবিত্র মক্কা নগরী ছেড়ে মিনার পথে এখন লাখ লাখ হাজির কাফেলা। এহরামের কাপড় পড়ে পায়ে হেটে ও গাড়িতে করে ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ তালবিয়ার ধবনি তুলে মক্কা থেকে মিনার পথে রওনা হয়েছে এসব কাফেলা। আগামী ৮ জিলহজ মঙ্গলবার থেকে মূলত হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে মিনার তাবুতে অবস্থানের সুবিধার্থে সোমবার বিকেল থেকেই হাজিদের মক্কা ছাড়তে হচ্ছে। মূলত মঙ্গলবার থেকে হজের শুরু। আগামী ৯ জিলহজ বুধবার আরাফাতের ময়দানে দিনভর অবস্থান শেষে রাতে মুজদালিফায় রাত্রি যাপনের পর ১০ জিলহজ বৃহস্পতিবার হাজিরা ফিরে আসবেন মিনায়। এখানে বড় শয়তানকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে পশু কোরবানি করে মাথা মুন্ডনের পর সিভিল পোশাক পরতে পারবেন হাজিরা। ১২ জিলহজের মধ্যে বড় শয়তান, মেঝো শয়তান ও ছোট শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে কাবা শরীফ তওয়াফ ও বিবি হাজেরার স্মৃতি বিজড়িত সাফা মারওয়া পাহাড় সায়ীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিন ব্যাপী হজের আনুষ্ঠানিকতা। এদিকে হজকে শান্তিপূর্ণ রাখতে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বাড়তি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মক্কাসহ মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশ্খৃলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের ব্যাগ তল্লাসির পাশাপাশি আকাশ থেকে বিমানেও নজরদারি বাড়াতে দেখা গেছে। শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় থেকে মক্কার আকাশে একাধিকবার বিমানের টহল দেখা গেছে। মক্কার বিভিন্ন রাস্তায় ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোষ্ট।

মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিস সূত্র জানায়, এ বছর রেকর্ড সংখ্যক এক লাখ এক হাজার ৭৫৮জন হাজি হজ পালন করতে মক্কায় পৌচেছেন। সর্বশেষ রবিবার ও সোমবার বাংলাদেশ থেকে আরও প্রায় ৫ হাজার হাজিকে নিয়ে বিমান জেদ্দায় পৌছার কথা। এর মধ্যে সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ যাত্রীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৯০ জন এবং সরকারের খরচে হজ যাত্রীর সংখ্যা ২৬৭ জন। হজ শেষে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বিমানের ফিরতি হজ ফ্লাইট। বাংলাদেশী হাজিদের খোঁজ খবর রাখতে শনিবার রাতে ঢাকা থেকে জেদ্দা হয়ে রবিবার ভোর রাতে মক্কায় পৌচেছেন ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। মক্কায় পৌছে ধর্মমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা উমরা হজ সম্পন্ন করেছেন। রবিবার ও সোমবার মন্ত্রী এখানের ১০টি বাসাবাড়ি ও হোটেলে অবস্থানরত হাজিদের খোঁজ নিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য কর্মকর্তা বুলবুল আহমদ। বাংলাদেশ সরকার সরকারী হাজিদের থাকার জন্য মক্কার ইব্রাহীম খলিল রোড ও হিজরা রোডসহ মিছফালা এলাকার আশপাশে ১০টি বাসাবাড়ি ও হোটেল ভাড়া করেছে। হোটেলের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক হাজি। অনেক হোটেলের টয়লেটে সাবান, বালতি, মগ ও খাবার পানি না থাকায় শুরুতে বিপাকে পড়েছেন অনেক হাজি। ব্যালটী হাজিদের গাইড থাকলেও সরকারী খরচে আসা হাজিদের থাকতে হচ্ছে অভিভাবকহীন অবস্থায়। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারনে অনেক হোটেলে থাকা হাজিদের খোঁজ নিয়েছেন ধর্মমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্যকর্মকর্তা বুলবুল আহমদ, মন্ত্রীর পিএ রেজাউল হাসান বাবু ও ব্যালটি হাজিদের প্রধান গাইড শামছুল হুদা। এদিকে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মনভুলানো প্রলোভন দেখিয়ে হাজিদের নি¤œমানের বাসায় রাখা হয়েছে। হাজিদের মক্কা থেকে মদিনায় পরিবহনেও কষ্ট দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হাজী সুমন। বাংলাদেশের মাহমুদুল্লাহর মালিকানাধীন হজ এজেন্সি নওশাদ ট্রাভেলসসহ একাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে হাজিদের সাথে এরকম প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান মক্কায় জনকন্ঠকে জানান, কোন এজেন্সির বিরুদ্ধে সুনির্দ্দিস্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার

সতর্কবস্থা সবখানে

শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর থেকে হাজিদের জন্য কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে সৌদি সরকার। দিনেরাতে মক্কার কাবা শরীফ ও এর আশপাশের এলাকাসহ প্রতিটি রাস্তায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। মক্কার রাস্তায় ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশী চেকপোষ্ট। মক্কার পাশাপাশি রবিবার থেকে মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফাতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালে মর্টার হামলার পর থেকে সৌদি সরকার হজ উপলক্ষে আরও বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। হেরেম শরীফে ঢোকার পথে ও মক্কার বিভিন্ন রাস্তায় সন্দেহভাজনদের তল্লাসি করতে দেখা গেছে। একই সাথে মক্কার আকাশ থেকেও নজরদারি করা হচ্ছে মিনা, আরাফার ময়দান ও মুজদালিফা। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজিরা যে কোন ধরনের আশঙ্কাকে উড়ি–য়ে দিয়ে জানিয়েছেন, তারা আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছেন। এখানে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া এই মূহূর্তে হাজিরা কাউকে পরোয়া করছেন না। বাংলাদেশী হাজি মজিবুর রহমান জানান, হাজিদের জানমাল রক্ষার মালিক একমাত্র আল্লাহ।

এক ডজনের বেশি ভিআইপি মক্কায়

বরাবরের মত এবারও হজে ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব ও পদস্থ কমর্কর্তাসহ এক ডজনের বেশি ভিআইপি হজ পালনে মক্কায় এসেছেন। তাঁদের অনেকের সাথে এসেছেন স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারী। এখন পর্যন্ত মক্কায় পৌচেছেন এমন ভিভিআইপিরা হচ্ছেন- ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া, ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, খাদ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ভূমি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, পিরোজপুর-১ আসনের এমপি একেএমএ আউয়াল সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, আবুল কালাম আজাদ এমপি, কামাল উদ্দিন মজুমদার এমপি, ব্যারিষ্টার ফজলে নূর তাপস এমপি, জিয়াউদ্দিন আহমেদ এমপি, নাসিমা ফেরদৌসী এমপি, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া এমপি, অধ্যাপক মো,নুরুল ইসলাম মিলন এমপি, ফাতেমা তুজ জোজরা এমপি, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও এটিএম ফজলে কবির, আওয়ামীলীগের বাহাউদ্দিন নাছিম, ধর্মমন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএ হান্নান, পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল। মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিসের কনসাল জহিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ভাষাগত সমস্যায় হাজিদের দুর্ভোগ

হেরেম শরীফের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের ভাষা হচ্ছে আরবি। ্ইংরেজী ভাষার দখল নেই তাদের! ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ হাজিকে হেরেমের ভেতরে ঢোকার সময় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। আন্তাজার্তিক ভাষা ইংরেজী ও বাংলার কোন কর্ণার না থাকায় এবং হজ উপলক্ষে হেরেম শরীফ ও এর আশপাশে কোন তথ্য কেন্দ্র না থাকাতেও হাজিদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। বাংলাদেশী হাজি এ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চন্নু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় মিলন কেন্দ্র মক্কার হেরেমের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ইংরেজীতে দক্ষ পুলিশ মোতায়েন ও বাংলাস হ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার আলাদাকর্ণার কিংবা তথ্য কেন্দ্র থাকলে হাজিদের এই দুর্ভোগ কমে আসবে।

ফুটপাতে হকারদের ভয় পুলিশ!

হজকে ঘিরে জমজমাট হয়ে উঠেছে ফুটপাতের হকারদের বাণিজ্য। মক্কার ব্যস্ততম রাজপথের হিজরা রোডে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর চলছে এই ফুটপাতের বেচাবিক্রি। এছাড়া বিভিন্ন অলিগলিতেও চলছে এই হজ মৌসুমের বাণিজ্য। সুদানী নারী ও শিশুরাই মূলত এই ফুটপাতের ব্যবসায়ী। টুপি, তসবিহ, পাঞ্জাবী, হিজাব ও ওড়নাসহ বাহারিসব পন্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে ক্ষূদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে পুলিশ দেখলেই মালামাল গুটিয়ে ছুট দিচ্ছে ফুটপাতের এই নারী ও শিশুর হকার। এক রিয়েল থেকে ৫ রিয়েলে চলে এই বেচাবিক্রি।

মোবাইল সিম ও রিচার্জ কার্ডে মনোপলি

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ থেকে হজ পালনে মক্কায় এসেছেন ব্যবসায়ী মোসলম উদ্দিন। ঢাকা থেকে জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌছে এসটিসি মোবাইল কোম্পানির সিম কার্ড কেনেন। ২৫ রিয়েলের টক টাইমসহ এর দাম নেয় ৩০ রিয়েল। মক্কার হোটেলে আসার পর এই ফোনে আরও ৩০ রিয়েল রিচার্জ করার পরও কথা বলতে পারেননি। কল দিলেই বলা হচ্ছে ব্যালেন্স নেই! আরেক হাজী সারোয়ার মন্ডল নিয়েছিলেন জেন কোম্পানির সিম কার্ড। ১০ রিয়েল রিচার্জ করার পরও তার ব্যালেন্স শুন্য। মোবিলি কোম্পানির সিমকার্ডে কল ড্রপ হচ্ছে যখন তখন। তারপরও ব্যালেন্স থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে রিয়েল। হিজরা রোডের আল বারাকা স্টোর থেকে ১০ রিয়েলের রিচার্জ কার্ড এর দাম রাখা হচ্ছে ১১ রিয়েল। রিচার্জ কার্ডের সঙ্কটের অজুহাতে এখানে বাড়তি দাম নিচ্ছেন অনেক দোকানি। মোবাইল ফোনের কার্ড যেখানে সেখানে মিলছে না। এছাড়া ইন্টারনেট মোডেমও সহজলভ্য নয় এখানে। তারওপর দুর্বল নেটওয়ার্ক সমস্যার কারনে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলো হাজিদের জন্য যেসব প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেটি সাধ্যের বাইরে। হাজিদের সব মিলিয়ে একমাসের মত অবস্থান হলেও তিন মাসের নিচে কোন প্যাকেজ নেই ফোন কোম্পানিগুলোর। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হাজিরা অভিযোগ করে জানান, মোবাইলের মনোপলি ব্যবসার কারনেই এমন অবস্থা।

বাঙালি হোটেল রেস্তরায় উপচে পড়া ভিড়

হজ উপলক্ষে প্রচুর বাংলাদেশী মক্কায় আসায় এখন বাংলাদেশী মালিকানার হোটেল রেস্তরাগুলোর রমরমা অবস্থা। তবে দেশীয় সব টাটকা খাবারই মিলছে সাশ্রয়ী মূল্যে। দুপুরের খাবারে ভাত মাছ কিংবা মাংসের সাথে ডাল ও সবজিসহ মিলছে মাত্র ১৬০ টাকা মূল্যমানের ৮ রিয়েলে। সকালের নাস্তায় রুটি আর সবজিসহ দাম রাখা হচ্ছে ৪ রিয়েলে। মাংসের মধ্যে গরু খাসি দুম্বা ও মুরগী মিলছে। রসনা বিলাসি হাজিরা মুখরোচক খাবারের জন্য বাংলাদেশী রেস্তরায় ভিড় করায় রমরমা হয়ে উঠেছে ব্যবসা। নামাজের আজান পড়ার সাথে সাথে খাবারসহ সব দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। পচাবাসি খাবার বিক্রির ঘটনা নেই মক্কায়-এমন দাবি বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের।