১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাদাসিধে কথা ॥ মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা ॥ একটি দীর্ঘশ্বাস

  • মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এই বছর আমার পরিচিত একজন মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষে আমি তাকে ফোন করেছি, জিজ্ঞেস করেছি পরীক্ষা কেমন হয়েছে। সে বলল, পরীক্ষা যথেষ্ট ভাল হয়েছে। এই রেজাল্ট দিয়ে তার কোন একটা পাবলিক মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার হবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন হবে না? সে বলল মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, যারা সেই প্রশ্ন পেয়েছে তারা নব্বই এক শ’ করে উত্তর করেছে। আমরা যারা লেখাপড়া করে পরীক্ষাতেই তারা খুব বেশি হলে সত্তর আশি উত্তর দিই।

ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর আমি তার একটি টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। সেই টেলিফোন এলো না। আমি বুঝে গেলাম সে যেটা আশঙ্কা করেছিল সেটাই ঘটেছে। যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দিয়ে নব্বই এক শ’ করে উত্তর করেছে তারা বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে। যারা পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়েছে তারা প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে। হয়তো শব্দটা প্রতিযোগিতা নয়, হয়তো শব্দটা নৃশংসতা। যারা এই বয়সের কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়, যারা জেনে শুনে সেটা সহ্য করে, এই দেশে তাদের থেকে বড় নৃশংস অপরাধী আর কে আছে?

পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আগে আমি অনেক চেঁচামেচি করেছি, কোন লাভ হয়নি। মন্ত্রণালয় কখনও স্বীকার করেনি, কোন পরীক্ষা কখনও বাতিলও করেনি- যদিও কিছুদিন আগে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সংসদে বলেছেন যে, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এই সরকারের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা! যদি সত্যি এটা এই সরকারের ‘জীবন-মরণ’ সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে কেন এর সমাধানে কোন চেষ্টা নেই? জীবন-মরণ সমস্যা সমাধানের জন্যে কি জীবন-মরণ চেষ্টা করতে হয় না? আমরা কি সেটা দেখছি? যেন কিছুই হয়নি, ঠিক সেইভাবেই কি দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন না?

পরীক্ষার পর থেকে আমার কাছে অসংখ্য টেলিফোন এসেছে, এসএমএস এসেছে। ই-মেইল এসেছে। আমি যখন আশায় টেলিফোন ধরেছি, তখন শুনেছি অন্য পাশে একজন হাউমাউ করে কাঁদছে। সরকারের নির্লিপ্ততার সুযোগ নিয়ে যখন কিছু দুর্বৃত্ত কারও সারাজীবনের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়, তখন তার কান্নার শব্দ থেকে কষ্টের আর কিছু থাকতে পারে না। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর এসএমএস আর ই-মেইলের হাহাকার আমি শুনে যাচ্ছি, দেখে যাচ্ছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না। একটি অভুক্ত শিশু যখন তার হতদরিদ্র মায়ের কাছে খাবার চায়, মা যখন তার মুখে কিছু তুলে দিতে পারেন না, তখন সেই অসহায় মায়ের কেমন লাগে আমি সেটা অনুভব করতে পারি।

আমি নিজে সারাজীবন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এসেছি। আমার জীবনে সেই স্বপ্নকে সত্যি হতে দেখেছি। স্বপ্ন পূরণের আনন্দের কথা আমি যে রকম জানি, ঠিক সে রকম স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্টের কথাও আমি জানি। মানুষ কষ্ট সহ্য করে একসময় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ যদি হতাশায় রূপ নেয়, তখন সে আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। এই সরকার পুরো দেশের দায়িত্ব নিয়েছে। দেশের এই তরুণ প্রজন্মের দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। প্রশ্ন ফাঁসের এই ভয়ঙ্কর অন্যায় মেনে নিয়ে তারা এই প্রজন্মকে হতাশায় ঠেলে দিতে পারে না। এখন পুরো ব্যাপারটি অস্বীকার করে দুই বছর পরে তারা বলতে পারবে না এটি ছিল ‘জীবন-মরণ’ সমস্যা! দেশের সবাই জানে, কী ঘটেছে। ইন্টারনেটে প্রশ্ন ফাঁসের অসংখ্য প্রমাণ আছে। কিছু দুর্বৃত্তকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। ঠিক করে তদন্ত করা হলে তার সবকিছু বের করা যাবে। একটি রাষ্ট্র প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে পারবে না কিংবা প্রশ্ন ফাঁস হলে যারা এটি ঘটিয়েছে তাদের ধরতে পারবে না, আমি সেটা বিশ্বাস করি না। যেসব বড় বড় কর্মকর্তা এই দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের সাধারণ ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে কোন ভাবনা নেই। অর্থ আর ক্ষমতার জোরে তারা ঠিকই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যায়তনে লেখাপড়া করবে। তাই দেশের সাধারণ ছেলেমেয়ে নিয়ে তাদের এত বড় অবহেলা।

একটা দেশের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করা সম্ভব সেই দেশের তরুণ সমাজকে হতাশার মাঝে ঠেলে দিয়ে। এই সরকার কি জানে, জেনে হোক না জেনে হোক তারা ঠিক এই কাজটি করে ফেলেছে? আমি আশাবাদী মানুষ, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখে এসেছি। আমি সরকারের কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করি, উটপাখির মতো বালুর ভেতর মাথা গুঁজে থাকবেন না। কী ঘটেছে সেটা তদন্ত করে দেখুন। যদি সত্যি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে তাহলে দুর্বৃত্তদের ধরুন। পরীক্ষা বাতিল করে আবার পরীক্ষা নিন। এ জন্যে যে বাড়তি যন্ত্রণাটুকু পোহাতে হবে, সেটি এই দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের তুলনায় কিছুই নয়। এই দেশটি আমাদের অনেক ভালবাসার দেশ, যে তরুণ-তরুণীরা এই দেশটিকে গড়ে তুলবে, তাদের হতাশার মাঝে ঠেলে দেবেন না। এই পৃথিবীতে সত্যের জয় হয়, অসত্য অন্যায় যত ক্ষমতাশালীই হোক ধুলায় মিশে যায়Ñ তাদের সেই বিশ্বাস নিয়ে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিন। দোহাই আপনাদের।

২১-৯-১৫