২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সব কিছুতে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে কেন

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

লেখাটি পড়ে কেউ ভাবতে পারেন কারও প্রতি বৈরিতাবশত লিখছি অথবা আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত রয়েছে। অর্থাৎ এবারের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তিচ্ছু আপন কেউ পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে বলে লিখছি। অত্যন্ত বিনীতভাবে বলব, না, কারও প্রতি আমার বৈরিতাও নয় এবং আপন কেউ মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষায়ও বসেনি। সাম্প্রতিককালে কিছু ঘটনা দেখে মনে হলো কিছু বলা দরকার। সেই নাগরিক দায়িত্ব পালন করছি মাত্র।

একটা ব্যাপার বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন কোন সঙ্কট সৃষ্টি হয় তখন সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দৌড়াতে হয়। জীবন যখন আছে সঙ্কট হতেই পারে এবং সঙ্কট উত্তরণের মধ্যেই জীবনের গতিধারা। প্রসঙ্গক্রমে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। কিছু মানুষ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জটলা পাকিয়ে কথা বলছে, তর্কাতর্কিও হচ্ছে, অথচ কেউ কারও গায়ে হাত তুলছে না বা খারাপ গালিও দিচ্ছে না। তিন চারটি ছেলে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা বিষয়টি লক্ষ্য করল। ভাবল এতগুলো মানুষ এক জায়গায় অথচ হাতাহাতি/গালাগালি হচ্ছে না, এ হতে পারে না। এক ছেলে একটা ঢিল নিয়ে জটলার মাঝখানে ছুড়ে মারল। কোথা থেকে ঢিলটা এলো কেউ দেখেনিÑ তাই এ-ওকে দোষারোপ করছে, ও-একে, এভাবে ঝগড়া বেঁধে গেল এবং এক পর্যায়ে গালাগাল এবং গালাগাল থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াল। ওই ছেলেগুলো খুব এনজয় করল। মনে হয় ঢিল মারার দুষ্টু ছেলেরা সক্রিয় আছে।

কয়েকদিন আগে দেখলাম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ভ্যাট বসিয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের জীবনযাত্রা স্থবির করে দেয়া হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করে সঙ্কটের সমাধান করতে হয়েছে বলে জেনেছি। প্রশ্নটি হলো কেন সব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে? তাহলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদফতর বা কর্তৃপক্ষ কেন আছে? যেমন সরকারী কর্মচারীদের জন্য বেতন স্কেল দেয়া হলো। তাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকগণ মনে করছেন (যৌক্তিকও) তাদের কর্মকর্তাদের তুলনায় অনেক নিচে নামিয়ে মর্যাদাহানি করা হয়েছে। তারা আন্দোলন করছেন। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড মর্যাদা দিয়ে আবার প্রত্যাহার করায় তারাও আন্দোলন করছেন। আন্দোলন করছেন প্রাথমিক নিয়োগপ্রাপ্তির জন্য প্যানেলভুক্ত পরীক্ষার্থীরা। সর্বশেষ রাজপথে নেমেছে সরকারী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তিচ্ছু প্রার্থীদের একটি বিরাট অংশ। অভিযোগ পূর্বাহ্নে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে যারা ভর্তি পরীক্ষায় বসেছে তারা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের এই অভিযোগের পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

১. দৈনিক প্রথম আলো বলেছে ‘রাজধানীর মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গত মঙ্গলবার র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে এক কোটি ২১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা মূল্যমানের বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, নগদ টাকা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন, উত্তরপত্র এবং ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধনপত্র উদ্ধার করা হয়। এ চক্রের প্রধান জসিম উদ্দিন ভুঁইয়াকে ২০১১ সালেও একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

২. বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) মেডিক্যাল কলেজ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ইউজিসির সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে নিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে তাদের মনেও সন্দেহ জমেছে।

৩. পরীক্ষা হয়েছে গত শুক্রবার এবং ফল প্রকাশ হয়েছে রবিবার বেলা ১১টায়। ডিজিটালাইজেশনের ফলে সম্ভব হলেও এই সুপারসনিক গতি সন্দেহের কারণ।

৪. সবচেয়ে বড় কথা হলো এবার প্রাপ্ত সর্বোচ্চ নম্বর হলো ৯৪ দশমিক ৭৫ ও সর্বনি¤œ ৭৭ দশমিক ৪ এবং ৮০ থেকে ৯০ নম্বর পেয়েছে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। গত বছর সর্বোচ্চ নম্বর ছিল ৮১ দশমিক ৫০।

এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটি একেবারে অমূলক নয়।

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (শিক্ষা) এবিএম আবদুল হান্নান বলেছেন, এবার ‘ছেলেমেয়েরা ভাল লেখাপড়া করেছে। তাই ফল ভাল হয়েছে’ (প্রথম আলো)। এই যেখানে প্রেক্ষাপট সেখানে কর্তৃপক্ষ কিভাবে সঙ্কট নিরসন করবেন। তবে তিনি বলেছেন, ‘ছেলেমেয়েরা ভাল লেখাপড়া করেছে।’ তার অবগতির জন্য বলছি, এ যাবত দেখা গেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে শিবিরের ভূমিকা থাকে। অতীতেও ছিল, এবারও নেই বলা যাবে না।

কাজেই বেশিদূর গড়াবার আগেই সমাধানের পথ বের করা দরকার, যাতে এবারও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ না হতে হয়।

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও

সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব