২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হজ কাফেলা মিনায় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ

  • নিরাপত্তা জোরদার, রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট, আকাশে বিমান টহল

বাবুল হোসেন, মক্কা থেকে ॥ পবিত্র মক্কানগরী ছেড়ে মিনায় হাজির হয়েছে এখন লাখ লাখ হজযাত্রীর কাফেলা। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে এহরামের কাপড় পরে হেঁটে ও গাড়িতে করে ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ তালবিয়ার ধ্বনি তুলে মক্কা থেকে মিনায় পৌঁছেছে এসব কাফেলা। ৮ জিলহজ মঙ্গলবার থেকে মূলত হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে মিনার তাঁবুতে অবস্থানের সুবিধার্থে সোমবার সন্ধ্যা থেকেই হজযাত্রীদের মক্কা ছাড়তে হয়েছে। আগামীকাল ৯ জিলহজ বুধবার আরাফাতের ময়দানে দিনভর অবস্থান শেষে রাতে হাজীরা মুজদালিফায় রাত কাটিয়ে ১০ জিলহজ বৃহস্পতিবার ফিরে আসবেন মিনায়। এখানে বড় শয়তানকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে পশু কোরবানি করে মাথা মুন্ডনের পর সাধারণ পোশাক পরতে পারবেন হাজীরা। ১২-১৩ জিলহজের মধ্যে বড় শয়তান, মেজো শয়তান ও ছোট শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে কাবা শরীফ তাওয়াফ ও বিবি হাজেরার স্মৃতিবিজড়িত সাফা মারওয়া পাহাড় সায়ীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী হজের আনুষ্ঠানিকতা। এদিকে হজকে শান্তিপূর্ণ রাখতে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বাড়তি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মক্কাসহ মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের ব্যাগ তল্লাশির পাশাপাশি আকাশ থেকে বিমানেও নজরদারি বাড়াতে দেখা গেছে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় থেকে মক্কার আকাশে একাধিকবার বিমান টহল দিয়েছে। মক্কার বিভিন্ন রাস্তায় ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট।

মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিস সূত্র জানায়, এ বছর রেকর্ডসংখ্যক এক লাখ এক হাজার ৭৫৮ হজযাত্রী মক্কায় পৌঁছেছেন। এর মধ্যে সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৯০ এবং সরকারের খরচে হজযাত্রীর সংখ্যা ২৬৭। হজ শেষে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বিমানের ফিরতি হজ ফ্লাইট। বাংলাদেশী হজযাত্রীদের খোঁজখবর রাখতে শনিবার রাতে ঢাকা থেকে জেদ্দা হয়ে রবিবার ভোরে মক্কায় পৌঁছেছেন ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। মক্কায় পৌঁছে ধর্মমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা ওমরাহ হজ সম্পন্ন করেছেন। রবিবার বিকেলে মন্ত্রী এখানকার দশটি বাসাবাড়ি ও হোটেলে অবস্থানরত হজযাত্রীদের খোঁজ নিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য কর্মকর্তা বুলবুল আহমদ। সরকারী হজযাত্রীদের থাকার জন্য মক্কার ইব্রাহীম খলিল রোড ও হিজরা রোডসহ মিছফালা এলাকার আশপাশে ১০টি বাসাবাড়ি ও হোটেল ভাড়া করেছে সরকার। হোটেলের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক হজযাত্রী। অনেক হোটেলের টয়লেটে সাবান, বালতি, মগ ও খাবার পানি না থাকায় শুরুতে বিপাকে পড়েছেন অনেকে। ব্যালটি হজযাত্রীদের গাইড থাকলেও সরকারী খরচে আসাদের থাকতে হচ্ছে অভিভাবকহীন অবস্থায়। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অনেক হোটেলে হজযাত্রীদের খোঁজ নিয়েছেন ধর্মমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য কর্মকর্তা বুলবুল আহমদ, মন্ত্রীর পিএ রেজাউল হাসান বাবু ও ব্যালটিদের প্রধান গাইড শামছুল হুদা। এদিকে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মনভোলানো প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে নিম্নমানের বাসায় রাখা হয়েছে। হজযাত্রীদের মক্কা থেকে মদিনায় পরিবহনেও কষ্ট দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন। মাহমুদুল্লাহর মালিকানাধীন হজ এজেন্সি নওশাদ ট্রাভেলসসহ একাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে হজযাত্রীদের সঙ্গে এরকম প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান মক্কায় জনকণ্ঠকে জানান, কোন এজেন্সির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সর্বত্র নিরাপত্তা জোরদার ॥ শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে হজযাত্রীদের জন্য কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সৌদি সরকার। দিনে-রাতে মক্কার কাবা শরীফ ও এর আশপাশের এলাকাসহ প্রতিটি রাস্তায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। মক্কার রাস্তায় ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশী চেকপোস্ট। মক্কার পাশাপাশি রবিবার থেকে মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফাতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হাসপাতালে মর্টার হামলার পর থেকে সৌদি সরকার হজ উপলক্ষে আরও বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হারাম শরীফে ঢোকার পথে ও মক্কার বিভিন্ন রাস্তায় সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে মক্কার আকাশ থেকেও নজরদারি করা হচ্ছে মিনা, আরাফাত ময়দান ও মুজদালিফা। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হজযাত্রীরা যে কোন ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, তারা আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছেন। এখানে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া এ মুহূর্তে তারা কাউকে পরোয়া করছেন না। হজযাত্রী মজিবুর রহমান জানান, তাদের জানমাল রক্ষার মালিক একমাত্র আল্লাহ।

ভাষাগত সমস্যায় হজযাত্রীদের দুর্ভোগ ॥ হারাম শরীফের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তার ভাষা হচ্ছে আরবী। ইংরেজী ভাষার দখল নেই তাদের! ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ হজযাত্রীকে হারাম শরীফের ভেতরে ঢোকার সময় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজী ও বাংলার কোন কর্ণার না থাকায় এবং হজ উপলক্ষে হারাম শরীফ ও এর আশপাশে কোন তথ্য কেন্দ্র না থাকাতেও অনেককে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। এ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চন্নু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় মিলনকেন্দ্র মক্কার হারাম শরীফের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ইংরেজীতে দক্ষ পুলিশ মোতায়েন ও বাংলাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার আলাদা কর্ণার কিংবা তথ্যকেন্দ্র থাকলে এ দুর্ভোগ কমে আসবে।

এক ডজনের বেশি ভিআইপি মক্কায় ॥ বরাবরের মতো এবারও হজে ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব ও পদস্থ কর্মকর্তাসহ এক ডজনের বেশি ভিআইপি হজ পালনে মক্কায় এসেছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে এসেছেন স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখন পর্যন্ত মক্কায় পৌঁছেছেন এমন ভিভিআইপিরা হচ্ছেন- ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া, ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, পিরোজপুর-১ আসনের এমপি একেএমএ আউয়াল, সাইদুর রহমান এমপি, সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী এমপি, আবুল কালাম আজাদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, নাসিমা ফেরদৌসী, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম মিলন, ফাতেমা তুজ জোহরা, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী ও এটিএম ফজলে কবির, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী বাবুল হাসান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএ হান্নান, পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল। মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিসের কনসাল জহিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ফুটপাথে হকারদের ভয় পুলিশ ॥ হজকে ঘিরে জমজমাট হয়ে উঠেছে ফুটপাথের হকারদের বাণিজ্য। মক্কার ব্যস্ততম রাজপথের হিজরা রোডে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর চলছে ফুটপাথের বেচাবিক্রি। এছাড়া বিভিন্ন অলিগলিতেও চলছে এই হজ মৌসুমের বাণিজ্য। সুদানী নারী ও শিশুরাই মূলত এই ফুটপাথের ব্যবসায়ী। টুপি, তসবিহ, পাঞ্জাবি, হিজাব ও ওড়নাসহ বাহারি সব পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে পুলিশ দেখলেই মালামাল গুটিয়ে ছুট দিচ্ছে ফুটপাথের এই নারী ও শিশু হকাররা। এক থেকে ৫ রিয়েলে চলে এই বেচাবিক্রি।

মোবাইল সিম ও রিচার্জ কার্ডে মনোপলি ॥ ময়মনসিংহ থেকে হজ পালনে মক্কায় এসেছেন ব্যবসায়ী মোসলেম উদ্দিন। ঢাকা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছে এসটিসি মোবাইল কোম্পানির সিমকার্ড কেনেন। ২৫ রিয়েলের টকটাইমসহ এর দাম নেয় ৩০ রিয়েল। মক্কার হোটেলে আসার পর এই ফোনে আরও ৩০ রিয়েল রিচার্জ করার পরও কথা বলতে পারেননি। কল দিলেই বলা হচ্ছে ব্যালান্স নেই! সারোয়ার ম-ল নিয়েছিলেন জেন কোম্পানির সিমকার্ড। ১০ রিয়েল রিচার্জ করার পরও তার ব্যালান্স শূন্য। মোবিলি কোম্পানির সিমকার্ডে কল ড্রপ হচ্ছে যখন তখন। তারপরও ব্যালান্স থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে রিয়েল। হিজরা রোডের আল-বারাকা স্টোর থেকে ১০ রিয়েলের রিচার্জ কার্ডের দাম রাখা হচ্ছে ১১ রিয়েল। রিচার্জ কার্ডের সঙ্কটের অজুহাতে এখানে বাড়তি দাম নিচ্ছেন অনেক দোকানি। মোবাইল ফোনের কার্ড যেখানে সেখানে মিলছে না। এছাড়া ইন্টারনেট মডেমও সহজলভ্য নয় এখানে। তার ওপর দুর্বল নেটওয়ার্ক সমস্যায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলো হাজীদের জন্য যেসব প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেটি সাধ্যের বাইরে। সব মিলিয়ে এক মাসের মতো অবস্থান হলেও তিন মাসের নিচে কোন প্যাকেজ নেই ফোন কোম্পানির। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হজযাত্রীরা অভিযোগ করেন, মোবাইলের মনোপলি ব্যবসার কারণেই এমন অবস্থা।

বাঙালী হোটেল রেস্তরাঁয় উপচেপড়া ভিড় ॥ হজ উপলক্ষে প্রচুর বাংলাদেশী মক্কায় আসায় এখন বাংলাদেশী মালিকানার হোটেল রেস্তরাঁগুলোর ব্যবসা রমরমা। দেশী সব টাটকা খাবারই মিলছে সাশ্রয়ী মূল্যে। দুপুরের খাবারে ভাত মাছ কিংবা মাংসের সঙ্গে ডাল ও সবজিসহ মিলছে মাত্র ১৬০ টাকা মূল্যমানের ৮ রিয়েলে। সকালের নাস্তায় রুটি আর সবজিসহ দাম রাখা হচ্ছে ৪ রিয়েলে। মাংসের মধ্যে গরু, খাসি, দুম্বা ও মুরগি মিলছে। রসনাবিলাসী অনেকেই মুখরোচক খাবারের জন্য বাংলাদেশী রেস্তরাঁয় ভিড় করায় রমরমা হয়ে উঠেছে ব্যবসা। নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবারসহ সব দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। পচা-বাসি খাবার বিক্রির ঘটনা নেই মক্কায়- এমন দাবি বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের।