২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শাহজালালে জমেছে লাগেজের পাহাড় ॥ যাত্রী বিড়ম্বনা

শাহজালালে জমেছে লাগেজের পাহাড় ॥ যাত্রী বিড়ম্বনা
  • সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ফিরতি খালি ফ্লাইটে লাগেজ আসছে ভূরি ভূরি ;###;গত এক সপ্তাহ ধরে এ জটিলতা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ টানা চার ঘণ্টা ধরে মাথা নিচু করে লাগেজ খোঁজেন রিয়াদ থেকে আসা যাত্রী সেলিম। সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত খুঁজেও পাননি তিন দিন আগে আসা লাগেজ। হাজার হাজার লাগেজের স্তূপের মধ্যে কিভাবে লাগেজ পাওয়া যাবে- সে বুদ্ধি পরামর্শও দিচ্ছে না সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের কোন কর্মকর্তা। অথচ গত ১৭ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে তিনি রিয়াদ থেকে দেশে ফেরেন। সেদিন চার ঘণ্টা বেল্টে দাঁড়িয়েও তিনি লাগেজ পাননি। শেষ পর্যন্ত তাকে বলা হলো- আপনার লাগেজ আসেনি। চলে যান। পরে খোঁজ নিয়েন। সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের উপস্থিত কর্মকর্তাদের আশ্বাসে সেলিম সেদিন লাগেজ ছাড়া বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। তিন দিন পর রবিবার তিনি নিজের তাগিদেই আবার শাহজালালে এসে দেখেন ওই বেল্টের পাশে হাজার হাজার লাগেজ। তিনি ওই ফ্লাইটের কর্মচারী মিজানের কাছে লাগেজ চান। তখন তাকে বলা হয়, দেখেন ওই দিকটায় লাগেজের স্তূপ। ওখান থেকে খুঁজে নিন।

সেলিমের সব চেষ্টা বৃথা। চার ঘণ্টা পরও লাগেজ না পেলেও দেখা পান এই প্রতিবেদকের। রবিবার দুপুর একটার সময় শাহজালাল বিমানবন্দরের আগমনী ইমিগ্রেশনের দক্ষিণে বেল্টের কাছে খোলা জায়গায় হাজার হাজার লাগেজের স্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে লাগেজ না পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। ওখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, শুধু সেলিম একা নন, তার মতো শত শত লোককে ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন লাগেজ খুঁজতে দেখা যায়। তারা সবাই সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদ ও দাম্মাম থেকে দেশে ফেরেন সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে। সেলিমের মতো দুর্ভাগারা প্রতিদিনই লাগেজ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে এই জটিলতা দেখা দেয়। সৌদিয়ার প্রতিটি ফ্লাইটেই লাগেজ ছাড়া যাত্রী পাঠানোর কারণেই এ সঙ্কট দেখা দেয়। হজ মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই জেদ্দা থেকে ফিরতি ফ্লাইট খালি আসায় তারা বিশেষ পাকেজ শুরু করে। এতে অতি মুনাফা লাভের আশায় অতিরিক্ত লাগেজ আনার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদিয়া। কিন্তু শাহজালালের নানা সীমাবদ্ধতা ও ক্যাপাসিটির বিষয়টি বিবেচনা না করেই সৌদিয়া একতরফা এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়ায় এই সঙ্কট। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রবিবার এ নিয়ে জরুরী বৈঠকে বসেন সিভিল এ্যাভিয়েশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সৌদিয়ার কর্তারা। ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকের পরও আশাব্যঞ্জক তেমন কিছুই শোনাতে পারেনি সৌদিয়া কর্তৃপক্ষ।

বৈঠক শেষে শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কেএম জাকির হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘বৈঠক হলেও আশাব্যঞ্জক কিছু বলার মতো নয়। কারণ এতে সৌদিয়া কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্টেশন ম্যানেজার কেউই না থাকায় কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি অন্যরা। বৈঠকে তারা তাদের জনবল সঙ্কটের কথা তুলে ধরেন। তখন আমরা তাদের লাগেজ সরিয়ে পাশের একটা খোলা জায়গায় নিতে বলেছি। এখন যদি তাতেও তারা সাড়া না দেয় তাহলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভযাবহ হবে। কারণ এখনই বেল্ট এরিয়ায় জায়গা নেই। সামনের দিনগুলোতে সিডিউল ফ্লাইটের পাশাপাশি ফিরতি হজ ফ্লাইট শুরু হলে তখন পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না।’

আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ বলেছেন, বৈঠকের পর সৌদিয়া লাগেজ সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে। দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হঠাৎ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সৌদি এয়ারলাইন্সের ডাবল ডেকার ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে এসব লাগেজ আনতে শুরু করে গত মঙ্গলবার থেকে। হজের ফিরতি খালি ফ্লাইটে বিশেষ প্যাকেজ সুবিধা দেয়ায় প্রতিদিনই আসছে বিপুলসংখ্যক লাগেজ। অনেকক্ষেত্রে যাত্রী ছাড়াই আনা হচ্ছে লাগেজ। এতে বিমানবন্দরের এয়ারসাইট, কনভয় বেল্ট, আগমনী হল ও কাস্টমস চ্যানেলের আশপাশের এলাকায় লাগেজের স্তূপ জমে। যে হারে লাগেজ আসছে সে হারে ডেলিভারি দেয়া হচ্ছে না। এতে সামনের দিনগুলোতে আশঙ্কা আঁচ করতে পেরে পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কেএম জাকির হাসান এ বিষয়ে সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে এসব মালামাল অবিলম্বে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন। এতেও সৌদি এ্যারাবিয়া কোন উদ্যোগ নেয়নি। ফলে গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরের বেল্ট এরিয়ায় হাজার হাজার লাগেজ আটকা পড়ে স্তূপ জমে যায়।

গতকাল রবিবার সকালে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, যেভাবে লাগেজের পাহাড় জমেছে তাতে এখন যাত্রীরাও খুঁজে পাচ্ছে না তাদের কাক্সিক্ষত লাগেজ।

নরসিংদী সদর থেকে আসা মমিন খানকে তিন ঘণ্টা ধরে লাগেজ খুঁজতে দেখা যায় কনভয় বেল্টে। সকাল আটটায় লাগেজ খোঁজা শুরু করেও দুপুর অবধি খুঁজে পাননি তার লাগেজ। কখন নাগাদ পাবেন সেটাও অনিশ্চিত।

‘জানি না পাব কি-না। তারপরও খুঁজে চলেছি’Ñ বললেন তিনি। জানালেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রিয়াদ থেকে সৌদিয়ার ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন। সেদিন একটা লাগেজ পেলেও আরেকটি না পেয়ে চলে যান। সৌদিয়ার কর্মচারীরা তাকে পরে লাগেজ পেলে ফোনে ডেকে এনে হস্তান্তর করার আশ্বাস দিলে তিনি চলে যান। কিন্তু তাকে বিমানবন্দর থেকে কেউ ফোন না করায় রবিবার নিজে থেকেই আসেন। কাস্টমস পেরিয়ে বেল্ট এরিয়ায় গিয়ে লাগেজ কোথায় জানতে চাইলে সৌদিয়ায় কর্তব্যরত এক লোক তাকেই লাগেজ খুঁজে বের করতে বলেন।

তিনি বলেন, ‘তারপর থেকেই খুঁজছি। এখানে কয়েক শত লাগেজের স্তূপের মধ্যে একটা একটা করে খুঁজছি। না পেয়ে ওই দিকের ৫ ও ৬নং বেল্টের কাছে গিয়েও দেখি শত শত লাগেজ। সেখানকার সবগুলো খুঁজেছি। কিন্তু দেখা মিলেনি।’

কেন এই সঙ্কট জানতে চাইলে বিমানবন্দর সূত্র জানায়, চলতি হজ উপলক্ষে সুপরিসর বিমান বোয়িং ৭৪৭ দিয়ে ঢাকা থেকে জেদ্দায় হজযাত্রীদের বহন করছে সৌদিয়া এয়ারলাইন্স। যাওয়ার সময় ঢাকা থেকে ফ্লাইটে যাত্রী পূর্ণ করে গেলেও জেদ্দা থেকে ফিরতে হয় খালি। এই অবস্থায় সৌদিয়া সুলভমূল্যে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করে। জেদ্দা থেকে হজ চলার সময় কোন যাত্রী ঢাকায় এলে তাদের জন্য বিশেষ ডিসকাউন্টে টিকেট ও বিপুল পরিমাণ লাগেজ বহনের প্যাকেজ ঘোষণা করে। এতে জেদ্দা থেকে ফিরতি উড়োজাহাজেও বিপুল যাত্রী ও লাগেজ আসতে শুরু করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যাত্রী না এলেও বুকিংয়ে লাগেজ পাঠাচ্ছে। সেই মাল শাহজালাল বিমানবন্দরে এলেও তা গ্রহণ করছে না কেউ। লাগেজ বেল্টের পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায় দিনের পর দিন। গত ১০ দিন আগে আসা এমন কয়েক শ’ লাগেজ পড়ে আছে ৪ ও ৫নং বেল্ট এরিয়ায়। এসব লাগেজ কেউ সরাতেও পারছে না। বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পালনকারী অথরিটি হলেও সৌদিয়া যাত্রী ছাড়া লাগেজ আনায় এ সঙ্কট দেখা দেয়। রবিবার দেখা যায় একটি সিডিউল ফ্লাইট নামার পর যাত্রীরা ৪নং বেল্টের কাছে দাঁড়ানোরও সুযোগ পাচ্ছেন না। আগে থেকেই সৌদিয়ার লাগেজের স্তূপ জমে থাকার দরুন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

এ সম্পর্কে শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কেএম জাকির হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, এমনিতেই এখানে যাত্রী ও লাগেজের তুলনায় জায়গা কম। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের রয়েছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা। সকালের দিকে যখন একসঙ্গে ৬-৭টি ফ্লাইট নামে তখন পরিস্থিতি খুবই জটিল আকার ধারণ করে। এর ওপর যোগ হয়েছে এখন সৌদিয়ার বাড়তি লাগেজের ঝামেলা। এটা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

এদিকে জরুরী বৈঠকেও সৌদিয়ার নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় কবে নাগাদ কিভাবে এ লাগেজের স্তূপ সরিয়ে নেয়া হবে সে সিদ্বান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে। এ সময় পরিচালক প্রয়োজনে দক্ষিণের নিরাপত্তা শাখার ডিএসও এরিয়ায় লাগেজ রাখার স্থান দিতে রাজি হন। তারপরও সৌদিয়া জনবল সঙ্কটের অজুহাত তোলে।

এসব বিষয়ে সৌদিয়ার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে বলেন, ওভারলোড হচ্ছে সৌদি আরবে। সেখান থেকে হঠাৎ আস্বাভাবিক হারে লাগেজ ও কার্গো দুটোই পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু শাহজালালে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় হঠাৎ লাগেজের স্তূপ জমে গেছে। এ সঙ্কট ধীরে ধীরে কেটে যাবে।

ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ভাষ্য ॥ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত যাত্রীসেবার স্বার্থে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের পাশাপাশি এয়ারলাইন্সগুলোর এ ধরনের অব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়গুলো তদারকি করছে। কারোর কোন গাফিলতি থাকলে আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করছে। ইতোপূর্বে সঠিক সময়ে লাগেজ ডেলিভারি না দিতে পারায় কয়েকটি এয়ারলাইন্সকে আর্থিক জরিমানাও করেছে এ আদালত।

সৌদিয়ার লাগেজ ডেলিভারি সম্পর্কে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন- জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ জনকণ্ঠকে বলেন, হঠাৎ এ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে ডাকা সিভিল এ্যাভিয়েশনের বৈঠকে প্রস্তাবনা করে সৌদিয়াকে অবিলম্বে লাগেজ সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। লাগেজ সরিয়ে কোথায় রাখা হবে অস্থায়ীভাবে সে জায়গাও ঠিক করে দেখা হয়েছে। সৌদিয়া ইতোমধ্যে লাগেজ সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে এবং প্রায় অর্ধেক লাগেজ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ সঙ্কট দু-একদিনের মধ্যেই কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।