২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রাম বন্দরে এবার কন্টেনারে ধরা পড়ল ভারতীয় মুদ্রা

চট্টগ্রাম বন্দরে এবার কন্টেনারে ধরা পড়ল ভারতীয় মুদ্রা

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ এবার জঙ্গী কর্মকা-ে সরাসরি অর্থ যোগানের ভারতীয় রুপীর বিশাল চালান আটকের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। সোমবার রাত আটটার দিকে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সৈয়দ মোকাদ্দেস হোসেন জানান, শনাক্ত চার কার্টনের নোটগুলো গণনা করে পৌনে তিন কোটি রুপী পাওয়া গেছে বলে বিডিনিউজ জানায়। তিনি বলেন, এছাড়া পাঁচ শ’ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে বিদেশী মুদ্রা পাচারের ঘটনা এই প্রথম ধরা পড়ল। একটি গোয়েন্দা সংস্থার খবরের তথ্যের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর অবৈধভাবে মিথ্যা ঘোষণায় আসা এত বিপুল অঙ্কের ভারতীয় রুপী আটক করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ভারতীয় এসব রুপী আসল না নকল তা সুনির্দিষ্টভাবে কর্মকর্তারা জানাতে পারেননি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দর থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর ঘুরে একটি কন্টেনারযোগে এই চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। রুপীর চালানটি আসল না নকল তা প্রক্রিয়াগতভাবে শনাক্তকরণ ছাড়া বলা যাবে না বলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে সর্বশেষ জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সিএন্ডএফ এজেন্ট মালিকসহ ৫ জনকে আটক করে একজনকে বন্দর পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৪ জনকে গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ভারতীয় রুপীর এ ঘটনা ঘিরে ব্যাপক গোপনীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইতোপূর্বে ঢাকার পাকিস্তানী দূতাবাস থেকে বহিষ্কৃত এক কর্মকর্তার মুদ্রা পাচারের এ ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কিছুদিন আগে গাজীপুর থেকে এক আইএসআই এজেন্ট গোয়েন্দাদের হাতে আটক হয়। মূলত ওই আইএসআই এজেন্টের কাছ থেকে আমিরাত হয়ে এই চালান আসার তথ্য পায় গোয়েন্দারা। সে থেকে বিষয়টি তীক্ষè পর্যবেক্ষণে ছিল। শেষপর্যন্ত গোয়েন্দাদের ওই চেষ্টা সফল হয়।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী একেবারে নতুন ঝকঝকে তকতকে ভারতীয় ১ হাজার, ৫শ’ ও ১শ’ রুপী মূল্যমানের এসব নোট কোথায় মুদ্রিত হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। যেখানেই এই রুপী মুদ্রিত হোক না কেন আমিরাত হয়ে তা চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এ বন্দরে ওই রুপী খালাস করা গেলে এর কিছু অংশ হিযবুত তাহরীরসহ কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনের কাছে পৌঁছানো হতো বলে গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে। রুপীর অবশিষ্ট অংশের গন্তব্য ছিল ভারত। সেখান থেকে তা জঙ্গী সংগঠন আইএসের কাছে পৌঁছার চক্রান্তও ছিল। গোয়েন্দা সূত্রে আরও বলা হয়েছেÑ এটি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ঘিরে জঙ্গী নেটওয়ার্কের তৎপরতার একটি অংশ হতে পারে।

জানা গেছে, ঢাকার একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি গোপন সূত্রে অবহিত হয়ে ১২ দিন আগে থেকে তা পর্যবেক্ষণে রাখে। বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাটির পক্ষ থেকে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে অবহিত করা হয়। গত ১৬ সেপ্টেম্বর আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে ‘গৃহস্থালি ব্যবহার্য পণ্য’ ঘোষণায় এক কন্টেনারবোঝাই হয়ে এ চালান আসে। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে অবৈধপথে সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ কোটি ভারতীয় রুপী পাচারের চালান ধরা পড়েছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

রবিবার রাত পৌনে আটটার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ৮ নম্বর শেডে পণ্য খালাসের সময় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা, কাস্টমস, বন্দর ও পুলিশের সহায়তায় কন্টেনারের অভ্যন্তরে তল্লাশি চালায়। কন্টেনারে মোট ১৬৫ কার্টন ছিল। সোমবার সকাল থেকে কার্টনগুলো খোলা শুরু হয়। সব কার্টন তল্লাশির পর চার কার্টনে বিপুল ভারতীয় রুপী পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে আটক ভারতীয় রুপী নকল না জাল তা নিয়ে কোন ধারণা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে যেসব ভারতীয় মুদ্রা পাচারকালে ধরা পড়েছে এর অধিকাংশই ছিল জাল।

বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দর মাদকসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। ভোজ্যতেলের সঙ্গে তরল কোকেনের চালান এসে ধরা পড়ার পর রবিবার রাতে এ বন্দরে এবার বিদেশ থেকে আসা এত বিপুল ভারতীয় মুদ্রা (রুপী) আটক করার ঘটনা ঘটল। তবে এ ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত এখনও রহস্যাবৃত রয়েছে। কেননা এই মুদ্রার কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও হয়নি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্ট মালিকসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন চিহ্নিত এক যুদ্ধাপরাধীর ছেলেও রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি শুরু হবে পুলিশী তদন্ত। এই বন্দরে প্রথমবারের মতো কোকেনের চালান ধরা পড়ার পর বিদেশী মুদ্রা আটকের ঘটনাও এই প্রথম।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় এসব রুপী পাচারের কাজে জঙ্গীদের একটি গ্রুপ জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে ভারতে বিভিন্ন জঙ্গী গ্রুপের কাছে বিভিন্নভাবে রুপী পৌঁছানোর কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে। বর্তমানে এর সঙ্গে জড়িত হয়েছে বাংলাদেশের কিছু জঙ্গী সদস্য। যাদের সঙ্গে ভারতীয় জঙ্গীদের যোগাযোগ রয়েছে।

রবিবার রাত পৌনে আটার দিকে বন্দরের ৮ নম্বর শেড থেকে পণ্য খালাসকালে একটি কন্টেনার থেকে চার কার্টনবোঝাই ভারতীয় মুদ্রা আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর। এর দুই দিন আগে শুক্রবার গোপন সূত্রের মাধ্যমে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বিষয়টি অবগত হয়। রবিবার রাতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খানের নেতৃত্বে কাস্টমস, পুলিশ ও বন্দরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ৮ নম্বর ইয়ার্ডে রক্ষিত ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কন্টেনারটি খুলে এর অভ্যন্তর থেকে চার কার্টন ভারতীয় রুপী উদ্ধার করা হয়।

বন্দর ও কাস্টমস সূত্র জানায়, মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘এমভি প্রসপার’ নামে একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফুজাইরাহ বন্দর থেকে কলম্বো হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকার মেসার্স ফ্ল্যাশ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি সিএন্ডএফ এজেন্টস প্রতিষ্ঠান এ কন্টেনার খালাসকারী প্রতিষ্ঠান। ঘোষণা অনুযায়ী এই কন্টেনারে থাকার কথা গৃহস্থালি পণ্য।

দুবাই প্রবাসী শহিদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি ‘পরিবারের ব্যবহার্য সামগ্রী’ ঘোষণা দিয়ে কন্টেনারযোগে বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে চার কার্টন ভারতীয় মুদ্রা প্রেরণ করে অবৈধভাবে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান রবিবার রাতেই বন্দর এলাকায় গিয়ে পুরো ঘটনা পরিদর্শন করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের প্রাথমিক ব্রিফ করেন। সোমবার বিকেলে শুল্ক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে পুনরায় ব্রিফিং করা হয়। রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে আসা একটি কন্টেনারে ১৬৫টি কার্টন রয়েছে। এর মধ্যে ৪টি কার্টনে ভারতীয় মুদ্রা পাওয়া গেছে। বন্দরে এ ধরনের বিদেশী মুদ্রা ধরা পড়ার ঘটনা এই প্রথম। তিনি ঘটনাটিকে এলার্মিং বলে সাংবাদিকদের জানান।

এর আগে বলিভিয়া থেকে আসা কোকেনের চালান ধরা পড়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই অবৈধভাবে মুদ্রা পাচার হয়ে আসার ঘটনা ধরা পড়ল চট্টগ্রাম বন্দরে। সোমবার সকালে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের নেতৃত্বে কাস্টমস, বন্দর, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কার্টন তল্লাশি চালিয়ে এর চারটির অভ্যন্তরে পাচার হয়ে আসা ভারতীয় মুদ্রা পাওয়া যায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার মোঃ শহিদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি থাকেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। এমভি প্রসপার নামের জাহাজযোগে তার গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে চার কার্টনে তিনি এসব ভারতীয় মুদ্রা প্রেরণ করেন। জাহাজটি গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। পণ্য খালাসের দায়িত্ব পায় ফ্ল্যাশ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে সিএন্ডএফ এজেন্ট।

শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাদের ধারণা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব ভারতীয় মুদ্রা অবৈধভাবে অন্য কোথাও পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। বিভিন্ন অপরাধ কর্মকা-ে এই অর্থ ব্যবহারই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তিনি জানান, ইতোপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ভারতীয় রুপী পাচারের ঘটনা ধরা পড়লেও দেশের একটি সমুদ্রবন্দরে এ ঘটনা প্রথম।

এ ঘটনার পর সিএন্ডএফ এজেন্ট সংস্থা ফ্ল্যাশ ট্রেডের মালিক শামীমুর রহমান, তার তিন কর্মচারী আসাদুল্লাহ, আহমাদুল্লাহ, কাউসার আলম এবং পণ্যের প্রেরক শহিদুজ্জামানের ভাই তৌহিদুল আলমকে গ্রেফতার করে বন্দর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।