১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টাঙ্গাইলে দুই থানার ওসি প্রত্যাহার

  • আতঙ্কে গ্রামবাসী

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল, ২১ সেপ্টেম্বর ॥ কালিহাতীতে পুলিশের গুলিতে ৪ জন নিহতের ঘটনায় কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম ও ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেছুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রবিবার গভীর রাতে তাদের ঢাকা ডিআইজি অফিসে প্রত্যাহার করা হয়। টাঙ্গাইলের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় শনিবার কালিহাতী থানার উপ-পরিদর্শক আবুল বাশার, সলিম উদ্দিন, কনস্টেবল জিয়াউল হক, আমিরুল ইসলাম এবং ঘাটাইল থানার উপ-পরিদর্শক মুনছুফ আলী, কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও লিয়াকত আলীকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় মোট ৯ জন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হলো। এদিকে গুলিবর্ষণ করে ৪ জনকে হত্যার ঘটনার চারদিন অতিবাহিত হলেও এলাকাবাসীর আতঙ্ক এখনও কাটেনি। ঘাটাইলের হামিদপুর ও কালিহাতী বাসস্ট্যান্ডে দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কম। দুই থানায় অজ্ঞাতনামা ৯শ’ জনের বিরুদ্ধে মামলা করায় এদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রামবাসীদের কেউ সাহস করে বাজারে আসছেন না- কখন গ্রেফতার হবেন এই ভয়ে। আবার গ্রেফতারের ভয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সোমবার দুপুরে কালিহাতীর দক্ষিণ বেতডোবা গ্রামে নিহত রুবেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সবাই শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন। রুবেলের মা ও ভাইয়েরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। তাদের সান্ত¡না দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। রুবেলের পিতা ফারুক মিয়া শোকে মুহ্যমান। চার ভাই এক বোনের মধ্যে ফারুক ছিল তৃতীয়। সে কালিহাতী কলেজে একাদ্বশ শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। সঙ্গে সে কালিহাতী বাজারে একটি কম্পিউটার দোকানে চাকরি করত। রুবেল মিছিলের সময় বিবেকের তাড়নায় মিছিলে যোগ দেয়। পুলিশ তার মাথায় গুলি চালায়। চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সোমবার রাতে জানাজা শেষে রুবেলের লাশ বেতডোবা কবরস্তানে দাফন করা হয়। এদিকে সোমবারও থানা সংলগ্ন উপজেলা গেট, হামিদপুর বাজার, কালিহাতী বাজারসহ বিভিন্নস্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়াও উপজেলা শহরে পুলিশ টহল বাড়িয়েছে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি সোমবারও কালিহাতী ও ঘাটাইল উপজেলার গ্রামবাসীদের সাক্ষ্য নিয়েছেন।

প্রত্যাহার নয়, সাজা দিতে হবে ॥ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনায় শান্তিপূর্ণ একটি সমাবেশে পুলিশ যেভাবে গুলি চালিয়েছে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, মেনে নেয়া যায় না। পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে বিচার করতে হবে, আইনের আওতায় এনে সাজা দিতে হবে। তা না হলে তারা বার বার এই কাজটাই করবে। পুলিশকে সরকার অস্ত্র দিয়েছে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে। অন্যায়ভাবে নিরীহ জনগণের ওপর গুলি চালানোর জন্য নয়। অস্ত্র হাতে থাকলেই অযৌক্তিকভাবে গুলি করা যায় না। তা হলে পুলিশ ও সন্ত্রাসীর মধ্যে কোন তফাত থাকে না। আমরা এর দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখতে চাই।

সোমবার দুপুরে টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঘাটাইলের সেই নির্যাতিত মা-ছেলের সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে এ ঘটনার পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা হবে এবং কমিশনের পক্ষ থেকে নির্যাতিতদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করা হবে বলেও মন্তব্য করেন ড. মীজানুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আমি যদি ওইদিন থাকতাম তাহলে আমিও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিতাম। মানুষ কত পাষ- হলে এমন পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে। আমরা এখন এক অসভ্য সমাজে বসবাস করছি। যেভাবে মা-ছেলেকে সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করে তাদের মানসম্মান ধুলিসাৎ করা হয়েছে, তা দেখে পুরো জাতি স্তম্ভিত। এসময় টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার উপস্থিত ছিলেন।

পরে তিনি কালিহাতীতে পুলিশের গুলিতে নিহত ৪ জনের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের সান্ত¡না ও সমবেদনা জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ড. মীজানুর রহমান বলেন, সাজানো কোন গল্পের অবতারণা করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। কার নির্দেশে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কি কারণে গুলি করে জীবন কেড়ে নেয়া হলো কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে হবে। গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে সন্দেহ হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নতুন করে তদন্ত করতে বাধ্য হবে বলেও জানান ড. মিজানুর রহমান।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট ॥ স্টাফ রিপোর্টার জানান, কালিহাতীতে পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে কেনো সাধারণ মানুষের ওপর গুলি করা হয়েছে এবং গুলি করার আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অনুমতি নেয়া হয়েছে কি-না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জাফর আহমেদের অবকাশকালীন বেঞ্চ এ বিষয়ে আংশিক শুনানি করে ৩০ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ঠিক করে দিয়েছে। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন সমিতির প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ফাওজিয়া করিম ফিরোজ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, টাঙ্গাইলের ডিসি ও এসপি, কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহ সংশ্লিষ্ট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন চায় বিএনপি ॥ টাঙ্গাইলের ঘটনায় স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলের মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ওই ঘটনায় পুলিশের গুলিবর্ষণে চারজন নিহত হয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব মানুষ মারা নয়। জনগণ মানুষ হত্যাকারী পুলিশ দেখতে চাই না। জনগণের বান্ধব হিসেবে পুলিশকে পাশে দেখতে চায়। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি গুলি করার যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আইনানুগ নয়। আমরা তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করছি। সোমবার দুপুরে পল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিপন এই দাবি জানান।