২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রজন্মের ঈদ ম্যানিয়া আর আমাদের কথকতা...

  • পান্থ আফজাল

আর ক’দিন বাদেই আমরা সবাই মেতে উঠব ঈদের রঙিন আনন্দে। ক’দিন পরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সয়লাব হয়ে যাবে ঈদ উদযাপনের ছবিতে। সেসব ফ্রেমে যত না থাকবে বর্ধিত পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সনাতনি ঈদ আড্ডা আর সামাজিকতার ছবি, তার চেয়ে ঢের বেশি থাকবে ফ্যান্টাসি কিংডম, নীলগিরি কিংবা দীর্ঘতম সমুদ্র অভিযানে স্নানরত অবকাশের চিত্র। এদিকে যারা জীবন বাজি রেখে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে, স্টিমারে কিংবা ট্রেনে-বাসে চেপে ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যান প্রিয় মানুষদের কাছে, ঈদ আসবে তাদেরই দোরগোড়ায়। ঈদের আগমনী বার্তায় আমরা অনেকেই আমাদের শৈশব আর কৈশোরে ফিরে যাই আনন্দে, উচ্ছ্বাসে। কিন্তু আমাদের শৈশব আর কৈশোরের ঈদের লৌকিকতাটুকু আর সেভাবে ফিরে পাই না। অধুনা পরিবর্তনের জোয়ারে আমাদের চিরচেনা ঈদও তার আঙ্গিক বদলেছে অনেকটাই। সেই ছোটবেলা থেকেই ঈদকে কেবল ধর্মাচার হিসেবেই নয়, দেখে এসেছি একটি সর্বজনীন সামাজিক উৎসব হিসেবেও। ঈদের নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি, তারাও এসেছেন। ঈদ পরিণত হয়েছে বর্ধিত পরিবার আর বন্ধু-বান্ধবদের সামাজিক মিলনমেলায়।

ঈদ মানে আনন্দ খুশি। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের যে ক’টি দিবসকে আনন্দের দিন নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে প্রধানতম দিবসটি হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আযহা।

আমাদের সমাজে ঈদের দিনে হরেক রকমের আয়োজন থাকে। বিশেষ করে পবিত্র কোরবানির জন্য হন্যে হয়ে কাক্সিক্ষত গরু বা পশু কেনা থেকে শুরু থেকে আরম্ভ হয়ে যায় ঈদ উদযাপনের নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি। তবে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ঈদ ও বর্তমান প্রজন্মের ঈদে দেখা যায় অনেকটাই ফারাক।

হালে টিভিতে আর অনলাইন মিডিয়ায় দেশে ঈদ প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে আমরা আমাদের সন্তানদের ঈদ উদযাপনের যে ঐতিহ্য শিখিয়েছি, তা এখন সাবেকি হয়ে গেছে। সংবাদপত্র, টিভি রিপোর্টিং আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে, সেলিব্রেটিদের সাক্ষাতকারে, বন্ধুদের পোস্ট পড়ে জানতে পারি যে, দেশে এখন ঈদ উদযাপিত হয় ভিন্ন মাত্রায়। নামাজ শেষে অনেকের ‘লম্বা ঘুম’ দেয়া এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ঈদের দিনে ছেলেমেয়েরা বেড়াতে যাচ্ছে ফ্যান্টাসি কিংডমে কিংবা শিশুপার্কে। বর্ধিত পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সামাজিক আতিথেয়তা বিনিময়ের কথাটি আর তেমন শোনা যায় না। ঈদের প্রধান আকর্ষণ ঘুমানো, ফেসবুকিং, পাশ্চাত্য অনুষ্ঠান গলধকরণ কিংবা বাইরে বেড়াতে যাওয়া।

আধুনিকতার ছোঁয়া

পোশাকের বেলায় দেখা যায়, বর্তমানে নায়ক নায়িকা বা মডেল তারকাদের পোশাক অনুসরণ করে নতুন নতুন ডিজাইন আমদানি করার প্রতিযোগিতা। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বেড়ানোর প্রবণতা কমিয়ে পার্ক, অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্ট, কফি বার, পিকনিক বা বিনোদন স্পটে ভিড় করতে দেখা যায় বর্তমান প্রজন্মের। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পরিবর্তে অনেকেই ঘরে বসে দেশী-বিদেশী চ্যানেলের ঈদ অনুষ্ঠান উপভোগেই বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকেন। এছাড়া আগের দিনে ঈদ কার্ড ডাকযোগে প্রেরণের যে একটা সংস্কৃতি ছিল, তা বর্তমান ডিজিটাল যুগে হ্রাস পেয়ে এসএমএস, ই-মেইলে বা ফেসবুকের মাধ্য বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের দাওয়াত করতে দেখা যায়। ঈদের দিনে বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়দের সঙ্গে ফোনালাপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে চ্যাটিং বেড়েছে বর্তমান যুগে।

আগে দেখা যেতো মা-বাবাসহ গুরুজনকে পায়ে ধরে সালাম করতেন, যা এখন যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অনেকেই পাড়া বা মহল্লার মসজিদ বা ঈদগাহের পরিবর্তে জেলা সদরের বড় ঈদগাহ মাঠ বা বাংলাদেশের বৃহত্তম ঈদগাহ মাঠে গিয়েও ঈদের জামাত পড়তে যান। আবার কোথাও কোথাও কোলাকুলি করার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। ঢাকা শহরে মহল্লায় মহল্লায় শপিংমলের সংখ্যা বেড়েছে। এসব স্থান দিনমজুর, শ্রমজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, মধ্য আয়ের মানুষ, বিত্তবানদের কেনাকাটায় মুখরিত। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার দেয়া-নেয়ায় ব্যস্ত নাগরিক কি তার মানবিকতা, কল্যাণচিন্তা, সৌহার্দ্যরে হাত সম্প্রসারিত রাখতে পারছে? বাইরের চাকচিক্য, লৌকিকতার আড়ালে পরশ্রীকাতরতা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন।

সমবেত পরিবারপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। কেউ বা পাহাড়সম অট্টালিকায় বসে এয়ারকুলারের বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে ডিসের মাধ্যমে বিনোদনে মত্ত আবার পাশের বাড়িতে তার আত্মীয় বা পড়শী নতুন জামা কেনা দূরের কথা, দুমোটো ভাতও জোগাড় করতে পারছে না! এ ধরনের দৃশ্য বর্তমান সমাজে প্রায় অধিকাংশ জায়গায় দেখা যায়।

এখন ফ্ল্যাটবন্দী মানুষ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবর রাখে না। যন্ত্রসভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচরণগত দিকের পরিবর্তন হয়েছে। শহরগুলোয় শুধু নয়, গ্রামগঞ্জের মানুষের বিনোদনসামগ্রীর সংখ্যা অগণন। ফাস্টফুড, চাইনিজ, বিদেশি খাবারের দোকান যততত্র গজিয়ে উঠেছে। কেউ কারোর আগমন উপলক্ষে নিজ হাতে রান্না করে না। দোকানের খাবার দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। লোকজ উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে। পিঠাপুলির পরিবর্তে নতুন খাবার রসনা নিবৃত্ত করছে। ঈদ যে বার বার ফিরে আসে তাতে নতুন খাবারের তালিকা দেখা যায়। ফিরনি, সেমাই পোলাও আছে। আছে আরও পাঁচ পদ। ঈদে নতুন জামার জন্য আমাদের প্রতীক্ষা ছিল। কখন নতুন জামা কেনা হবে। জুতা, স্যান্ডেল পাওয়া ছিল বাড়তি পাওয়ার তালিকায়। জামা-কাপড় যখনই কেনা হোক, লুকিয়ে রাখা হতো, জুতা-স্যান্ডেল পুরনো হয়ে যাবে বলে পরা হতো না। এখনকার ছেলেমেয়েরা নতুন কাপড়ের কদর বোঝে না। নিত্যনতুন প্রাপ্তি তাদের আনন্দ দেয় না। ফ্যাশন সচেতন একটি জনগোষ্ঠী বার বার ফ্যাশন পরিবর্তন করছে। যান্ত্রিকতার আবরণে ঢাকার ঈদ তার প্রথাগত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে বটে, কিন্তু সামাজিক আর পারিবারিক আবেদন এখনও বাংলার ছবির মতো গ্রামে বা মফস্বলে আজো খুব বেশি কমেনি।

রাস্তায় মানুষের ভিড় ক্রমাগত বাড়ছে। ঈদের কেনাকাটার লম্বা কিউ, শপিংমল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। যার সামর্থ্য আছে সে ঈদ উৎসব করে; যার নেই সেও ধার করে ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, স্বামী এবং স্বজনদের হাসি দেখতে চায়। উৎসব আসে। দেনা বাড়ে। সর্বজনীন ঈদ উৎসব উদযাপন করার আয়োজন চলে।

আমাদের সন্তানরা মিশ্র এক সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠছে। তারা ভবিষ্যতে আইডেনটিটি সঙ্কটে ভুগবে। যৌথ পরিবার ভেঙে যে একক পরিবার তৈরি হয়েছে সে পরিবারের নিয়ন্ত্রক পিতা-মাতার দৌড় ও চারপাশে ডিশএন্টেনা, হোয়াটস আপ, মোবাইল আত্মকেন্দ্রিক ও ঘরমুখো করে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। মায়া-মমতাহীন আমাদের সন্তানরা মোটা হয়ে রোগ-ব্যাধি, ফাস্টফুড ম্যানিয়ায় ভুগছে।

মানুষ নস্টালজিক। পুরনো দিনের কথা মনে পড়বেই। তার মানে এই নয় নতুন শতাব্দিতে যন্ত্রসভ্যতার উন্নতির দিনে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের চিন্তাধারার ফারাক আগেও ছিল, এখনও আছে। মধ্য আয়ের দেশের মানুষ আনন্দময় ঈদ পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করুক। নীতিনির্ধারক ও জনগণকে এক কাতারে আসতে হবে। আলস্য, হানাহানি আমাদের গণতন্ত্র, অর্থনীতি, জীবনযাপনকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। ঈদ-উল-আজহা থেকে শুরু“হতে পারে অগ্রযাত্রা। স্থিতিশীল গণতন্ত্র বাঙালীর আরাধ্য।

উন্নয়নশীল অর্থনীতির দিকে পরিকল্পনা অগ্রসর হতে পারে। সুশাসন, গণতন্ত্রচর্চা, পরমসহিষ্ণুতার ধারায় প্রত্যাবর্তন হতাশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। ‘নেই’ অনেক কিছুই। মেধা, শ্রম, স্বপ্ন বেঁচে আছে। একজন স্বপ্ন জাগানিয়া নেতার প্রয়োজন। তরুণপ্রজন্ম থেকে সে নেতা সৃষ্টি হতে পারে। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি...