২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অসাধারণ এক উদ্যমী তরুণ

  • রীতেশ আগরওয়াল

ভারতের বৃহত্তম হোটেল নেটওয়ার্কের প্রধান রীতেশ আগরওয়াল মাত্র ২১ বছরের এক যুবক। তাঁর মতো এত অল্পবয়সী এন্টারপ্রিনিয়ার বা ব্যবসায় উদ্যোক্তা দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। তাঁর ‘অয়ো রুমস’ নামক হোটেল নেটওয়ার্কের অধীনে ভারতের ৩৫টি নগরীতে রয়েছে এক হাজার হোটেল। এই এক হাজার হোটেলের মাসিক আয় ৩৫ লাখ ডলার। রীতেশ এমন এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে বসবেন এবং তা-ও আবার এত অল্পবয়সে এমনটি বোধ হয় তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। একটা ছোট্ট দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছিল।

রীতেশের বয়স তখন ১৮ বছর। এক রাতে দিল্লীতে তাঁর এ্যাপার্টমেন্টে তালা মেরে তিনি বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলেন। একটা হোটেল খুঁজে পেতে নিতে বাধ্য হয়ে তিনি এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়লেন, যে অভিজ্ঞতা ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সময় তার বেশ কয়েকবার হয়েছে। দেখতে পেলেন রিসেপশনিস্ট ঘুমাচ্ছে। রুমের সকেটগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। ম্যাট্রেস শতছিন্ন। বাথরুমের পাইপ লিক করে পানি চোয়াচ্ছে এবং সবশেষে কার্ডে বিল পরিশোধ করা যাবে না।

রীতেশের মনে হলো এই যদি তার সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে এমন সমস্যায় ভোগান্তি আরও শত-সহস্র জনের হচ্ছে। তাঁর মনে প্রশ্ন, যুক্তিসঙ্গত ভাড়ায় ভারতে ভাল মানের হোটেল রুম পাওয়া যায় না কেন? ব্যস, শুরু হলো রীতেশের কাজ। চার বছর পর এক হাজার হোটেলের এক বিশাল নেটওয়ার্কের মালিক বনে গেলেন তিনি। তার মানে কি এই যে, চার বছরে এক হাজার হোটেল নির্মাণ করেছেন তিনি? মোটেও তা নয়।

তাঁর অয়ো রুমস কোম্পানিটি আগে থেকে স্থাপিত এক হাজার ব্রান্ডবিহীন হোটেলকে নিয়ে কাজ করেছে। এসব হোটেলের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে, স্টাফদের ট্রেনিং দিয়েছে, তাঁর কোম্পানির নামে এই হোটেলগুলোর নতুন নামকরণ করা হয়েছে এবং এসব করে ওই হোটেলগুলোর আয়ের একটা পার্সেন্টেজ পেয়েছে তাঁর কোম্পানি। আর হোটেলগুলোর লাভ এই যে, অয়ো ব্রান্ড নামের সুবাদে হোটেলে বোর্ডারের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। এতে তাদের আয়ও বাড়ছে।

ব্যবসার অংশ হিসেবে রীতেশ একটা এ্যাপ-ও তৈরি করেছেন। সেটাকে কাজে লাগিয়ে অতিথিরা রুমের বুকিং দিতে পারে, কোথায় কোন পথে কিভাবে হোটেলে পৌঁছানো যায় জানতে পারে এবং হোটেলে পৌঁছার পর সেখানকার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, যেমন রুম সার্ভিসের ব্যবহার করতে পারে।

রীতেশ আজ বিশাল হোটেল নেটওয়ার্কের মালিক বটে। কিন্তু কথাগুলো যত সহজে বলা হলো, আসলে ব্যাপারটা মোটেও অত সহজে হয়নি। এজন্য যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে। শুরুর দিকটা ছিল অত্যন্ত কঠিন । কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি যে, এটাই হতে পারে ভবিষ্যতের একটা প্রযুক্তি ব্যবসা। তবে কিছু কিছু লোক যে তাঁর কথায় বিশ্বাস করেনি, তা নয়। একই রকমের একটা ধারণা পোষণ করেছিলেন নেপালের যুগ্ম স্রষ্টা ও ফেসবুকের প্রথম দিকের বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল। তিনি থিয়েল ফেলোশিপ নামে এক কর্মসূচীর পৃষ্ঠপোষক। এই কর্মসূচীর অধীনে প্রতিবছর ২০ জন কিশোরকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ব্যবসায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করার জন্য অর্থ জোগান দিয়ে থাকে। রীতেশ পরম আকাক্সিক্ষত এই ফেলোশিপ পেয়ে গিয়েছিলেন। এই অর্থ কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেন, যা শেষ পর্যন্ত ‘অয়ো রুমস’ নামক হোটেল চেইন নেটওয়ার্কে বিকশিত হয়।

কোম্পানিটি ২০১৩ সালের জুন মাসে চালু হয়। দিল্লীর কাছে গুরগাওয়ে একটি হোটেল নিয়ে এর যাত্রা শুরু। রীতেশ নিজেই এর ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার, রিসেপশনিস্ট। হোটেল রুমগুলোতে জিনিসপত্র পৌঁছানোর কাজও তাঁর। রাতের বেলায় তিনি এ্যাপ তৈরির কোড ঠিক করতেন। ওয়েবসাইট উন্নত করতেন। এর পাশাপাশি শক্তিশালী কিছু টিমও গড়ে তোলেন তিনি।

তাঁর আইডিয়াটা যে অভিনব ও লাভজনক, সেটা বিনিয়োগকারীদের শুধুমাত্র একটা উপায়েই তিনি বোঝাতে পেরেছিলেন। তা হলো, ভারতের কিছু কিছু বাজে হোটেল (অর্থাৎ সস্তা দামের যেসব হোটেলে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা) আসলেই যে কত খারাপ তা দেখিয়ে দেয়া এবং তার পাশাপাশি তাঁর উদ্ভাবিত হোটেলটি দেখানো। তাঁর প্রথম বিনিয়োগকারী এই পার্থক্যটা দেখেই চমৎকৃত হয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়েছিলেন। এরপর ব্যবসার মতো প্রসার ঘটেছে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা ততই সহজ হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর কোম্পানি জাপানের সফটব্যাংক থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ পেয়েছে।

অথচ রীতেশ প্রথম কোম্পানিটা চালু করার সময় অনেকে বলেছিল এ ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কলেজ ড্রপআউট থেকে ব্যবসার মালিক বনে যাওয়া বাহ্যত নির্বিঘœ মনে হলেও রীতেশ বলেন, ১৭ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলা বা স্টাফ সংগ্রহ করার মতো সাধারণ ব্যাপারগুলোই ছিল মস্ত চ্যালেঞ্জের কাজ। সেইসঙ্গে কিছু লোক তার এত কম বয়স দেখে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছিল। নিজেদের কার্যোদ্ধার করতে চেয়েছিল। আবার কিছু কিছু অত্যন্ত ভাল ও অভিজ্ঞ লোকের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়েছিল, যাদের বদৌলতে অন্য সব সমস্যা তার পক্ষে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়।

ছোট বয়স থেকেই সর্বদা উচ্চাভিলাষী ছিলেন রীতেশ। বেড়ে উঠেছিলেন উড়িষ্যার ছোট শহর রায়াগাদায়। মাত্র ৮ বছর বয়সে কম্পিউটার লেখা শুরু করেন। তাঁর যখন ১৩ বছর বয়স ততদিনে তিনি তার শহরের লোকদের ওয়েবসাইট তৈরির কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর ওপর একটা বইও লিখে ফেলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশে সঠিক কোর্স ও সঠিক কলেজটি বেছে নিতে ছাত্রদের সাহায্য করা।

বর্তমানে রীতেশের দৃষ্টি কাস্টমার ফিডব্যাকের ভিত্তিতে হোটেল সার্ভিসের উন্নতি বিধানের ওপর নিবন্ধ। স্বদেশে তাঁর কোম্পানির প্রসার ঘটার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। রীতেশ বলেন স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিদেশেও তার ব্যবসার প্রসার ঘটাতে চান তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম হোটেল রুম নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করবেন, এটাই রীতেশের আশা ও উচ্চাভিলাষ। তবে সেটা যে অত সহজ হবে না, সেটাও মানেন তিনি। তাঁর সাফল্যকে যারা অনুকরণ করতে আগ্রহী তাদের প্রতি রীতেশের উপদেশ, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু কর। দ্রুত কাজে নেমে পড়। ব্যর্থ হলে বরং শিখবে এবং পরবর্তী উদ্যোগের বেলায় সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে।’

সূত্র : বিবিসি