২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব হার্ট দিবস হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসা

বিশ্বের এক নম্বর হন্তারক রোগ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে হৃদরোগকে। প্রতিবছর ১৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন বা প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ মারা যাচ্ছে এই রোগে। অন্যদিকে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি এইডস এবং যক্ষ্মা- এই তিনটি রোগ মিলে প্রতিবছর গোটা বিশ্বে মারা যাচ্ছেন ৩৮ লাখ মানুষ। অথচ এ তিনটি রোগকেই ভয়ঙ্করভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে হৃদরোগের ভয়াবহতার ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা অনুপস্থিত। তাই আন্তর্জাতিক হার্ট দিবসে গোটা বিশ্বেই এ বিষয়টির প্রচারণার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এমন একটি ধারণা প্রায় মিথ হিসেবেই প্রচলিত রয়েছে যে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের শিকার সাধারণত বয়স্কজন এবং মূলত পুরুষেরা। এটি যে সত্য নয় তা বলাই বাহুল্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শিশু এবং নারীরাই অধিকতর হৃদরোগের ঝুঁকির ভেতরে অবস্থান করছে। আর সে কারণেই বারবার শিশু ও নারীর ওপর বিশেষ দৃষ্টি দানের কথা বলা হয়।

ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের হার্ট দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য হলোÑ সর্বত্র সবার জন্য পছন্দ করুন সুস্থ হার্ট। ফেসবুকের প্রচারণার কল্যাণে দুহাতের সাহায্যে হার্টের প্রতীক তুলে ধরে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে গেছে দেশে দেশে। গত বছর ২০১৪ সালের হার্ট দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য ছিলÑ হার্ট-হেলদি এনভায়রমেন্ট, বা বলতে পারি সুস্থ হার্ট-বান্ধব পরিবেশ। অর্থাৎ যেখানেই থাকুন সচল থাকুন, হার্ট সুস্থ রাখুন। এবারও প্রকারান্তরে গত বছরের থিমটিকেই বিশেষভাবে ফোকাস করা হচ্ছে। আমরা যেখানেই বসবাস করি না কেন, আমাদের কর্মক্ষেত্র এবং খেলা বা বিনোদনের স্থান যেখানেই হোক না কেন, তা যেন কোনভাবেই হৃদরোগের ঝুঁকি না বাড়ায়। সুস্থ হার্টবান্ধব পরিবেশ যেন সর্বক্ষেত্রে বজায় থাকে। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ বিনা একজন ব্যক্তির পক্ষে হৃদরোগের ব্যাপারে ঝুঁকিমুক্ত থাকা কঠিন। তাই সকলে মিলেই সুস্থ হার্টবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সুস্থ হার্টবান্ধব এবং স্ট্রোকমুক্ত কমিউনিটি নিশ্চিত করার জন্য আমেরিকায় ইতোমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। হ্যান্ডবুক প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিস্তারিত করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। সমাজে বিরাজমান হেলথ প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তুলে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ব্যক্তির জীবনধারার ওপর নির্ভর করে তার হৃদরোগের ঝুঁকির বিষয়টি। সে স্বাস্থ্যসচেতন হলে ধূমপানের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বর্জন করবে। আর তার পরিবেশকেও ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হবে। এর আগে একবার থিম বা প্রতিপাদ্য ছিলÑ ‘টেক দ্য রোড টু এ হেলদি হার্ট’ বা ‘সুস্থ হার্টের জন্যে যাত্রা’। মূলত হৃদরোগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের ওপরেই জোর দেয়া হয়েছিল। এজন্যে পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। পরিবারের অভিভাবকবৃন্দ, বিশেষ করে নারীদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে বেশি। সন্তানদের ধূমপান থেকে বিরত রাখা, তাদের শারীরিক কর্মকাে উৎসাহিত করা, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এমন খাবার (বেশি চর্বিযুক্ত খাদ্য, টিনজাত খাবার ইত্যাদি) এড়িয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যগ্রহণে উৎসাহিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নিয়মিত ব্যায়ামও হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে দৈহিক ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকখানি কমে আসে। কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদরোগ শিশুর জন্মের আগে থেকেও বিকশিত হতে থাকে বলে অধুনা এ রিপোর্ট থেকে জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বিশ্বে ১০ লাখ শিশু জন্মগতভাবে হৃদযন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এক্ষেত্রে শিশুর দ্বিবিধ সঙ্কট দেখা দিতে পারে। এমনিতে সে নিজেই ত্রুটিযুক্ত হৃদযন্ত্রের অধিকারী বলে হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে বেড়ে ওঠে, অন্যদিকে তার মায়ের হৃদরোগ বর্তমান থাকলে সে তা অবলোকনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। হৃদরোগের শিকার প্রতি তিনজন নারীর ভেতর একজনের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিবছর। সুতরাং সব মিলিয়ে শিশু ও মায়ের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়ে প্রাধান্য পাচ্ছে।

আমরা কথায় কথায় বলে থাকি শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। সেই ভবিষ্যত সচল রাখার জন্য শিশুর সুস্থ হার্টের দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টিদানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। একইভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই হার্ট সুরক্ষার আন্দোলন ও তৎপরতার বাইরে নারীকে রাখা হলে সেটা হবে আত্মঘাতী। নীরব ঘাতক হৃদরোগ থেকে বাঁচতে হলে গোটা জীবনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলা যায় সুস্থ হার্ট অর্জন করার জন্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে হবে। এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল ছবি থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে শিশু-তরুণ-বয়স্কÑ সব বয়সী নারীপুরুষই সুস্থ হার্টের দিকে যাত্রা করেছেন। এজন্যে শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান বর্জন যে অপরিহার্য সেকথা পুনরুক্তির প্রয়োজন পড়ে না। এবছরের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল ফোকাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অসংক্রামক রোগসমূহের ভেতর হৃদরোগকে অন্যতম ভয়াবহ রোগ হিসেবে শনাক্ত করে ২০২৫ সালের ভেতর এসব রোগে মৃত্যুর হার পঁচিশ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ১৯৪টি দেশে কর্মসূচী প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বেও ১০০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হতে চলেছে বিশ্ব হার্ট দিবস। আমরা মনে করি, হার্ট দিবস পালন তখনই সার্থক হবে যখন দেশের অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবান মানুষ হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আওতায় আসতে পারবে। এজন্যে হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসার কথাটিও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।

এই বিকল্প চিকিৎসার ক্ষেত্রে হলিস্টিক চিকিৎসা হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিৎসার মূল চাবিকাঠি দুটি। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম। রোগীর বয়স এবং রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। পুষ্টিকর ও পরিমিত আহার তাকে ফিট রাখে। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাজাগতিক শক্তি থেকে জ্যোতি বা প্রাণরস আহরণের কথাও বলা হয়ে থাকে। এসব অর্জনের কাজটি কিন্তু অত সহজ নয়। তার জন্যে নিয়মিত সময় দিতে হয়, চর্চা করতে হয় সঠিক নিয়ম মেনে। যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, এবং রাজযোগ মেডিটেশন ও নিউরোবিক্স প্রত্যেকটিরই নিজস্ব রীতিনীতি আছে। সংক্ষেপে বলতে পারি হলিস্টিক চিকিৎসা হলো ৭ চিকিৎসা কৌশলের আশ্চর্য সমন্বয়। ইতোমধ্যে দেশে আস্থা অর্জন করেছে। বিগত আট বছর যাবত হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার এক্ষেত্রে দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে হাজার হাজার হৃদরোগীর জীবনে সুবাতাস বয়ে এনেছে।

আজকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশে এই কাজটিই ছয় বছর যাবত নিষ্ঠার সঙ্গে করে আসছে হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার। পাবলিক সেক্টরে চার ধাপে এই কর্মকা চলছে।

এক. স্কুল পর্যায়ে হৃদরোগ প্রতিরোধে কর্মকা- পরিচালনা করা বা সচেতনতা সৃষ্টি করা। এতে ধূমপানবিরোধী প্রচারণা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ ও শারীরিক কর্মকাে র কথা বলা হয়। দুই. মানসিক চাপ ও উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে যারা ভুগছেন তাদের বিশেষভাবে সচেতন করা এবং কিছু হলিস্টিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম দেয়া যাতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে আসে। তিন. যারা ইতোমধ্যে হৃদরোগের শিকার তাদের হলিস্টিক চিকিৎসার আলোর পথে নিয়ে আসা। এবং ৪. বাইপাস সার্জারি করার পরও হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লকেজের ঝুঁকির ভেতেরে যারা আছেন তাদের হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প চিকিৎসা প্রয়োগ করা। এতে হাজার হাজার রোগীর ভাল থাকার সার্বিক প্রমাণ রয়েছে।

মানসিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ, জীবনযাপনের চাপ প্রভৃতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। হলিস্টিক চিকিৎসায় সোল-মাইন্ড-বডি বা আত্ম-মন-দেহ সব কিছুর ওপরেই লক্ষ্য রেখে প্রোগ্রাম দেয়া হয়। অথচ প্রথাগত পদ্ধতির চিকিৎসা ব্যবস্থায় কেবল দেহ বা শরীরের ওপরেই ফোকাস করে থাকে। এখানেই হলিস্টিক চিকিৎসার অগ্রসরতা।

বিশ্ব হার্ট দিবসে আমরা অবশ্যই হৃদয়ের কথা শুনব। ফিরে তাকাব আমাদের হার্টের সুস্থতার দিকে। হার্ট সুস্থ রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করতে সচেষ্ট হব। কিন্তু ইতোমধ্যেই যারা হৃদরোগের শিকার হয়েছেন তাদের সামনে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি বিকল্প চিকিৎসার দিকটিও আমাদের তুলে ধরতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যভান্ডার উন্মুক্ত করে দিতে হবে মানুষের সামনে। হৃদরোগ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সচেতনভাবেই চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। মধ্যবিত্ত, অসচ্ছল এবং দরিদ্র হৃদরোগীরা যাতে যথার্থ চিকিৎসার বাইরে না থেকে যায় সেটাই আজকের প্রধান বিবেচ্য।

ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার

পান্থপথ, মোবাইল : ০১৯২১৮৪৯৬৯৯, ০১৮৪২৭০৮৯৪৫