১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুড়িল-পূর্বাচল খাল খননে কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ অনুমোদন পেল বহুল আলোচিত কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে বালু নদী পর্যন্ত ১০০ ফুট প্রস্থ খাল খনন প্রকল্প। এটিসহ মোট ৬টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৮ হাজার ৮২৫ কোটি দুই লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৬ হাজার ৩১৪ কোটি ৩৫ লাখ, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ২ হাজার ৩৫৮ কোটি ২৮ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। কুড়িল-পূর্বাচল এলাকার অবৈধ দখলে থাকা ভূমি উদ্ধারে তালিকা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে খাল খনন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সফল করতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান প্রয়োজনে সেনাবাহিনী দিয়ে কাজ করা হবে। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হচ্ছে, আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্প, এর ব্যয় ২ হাজার ৯৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক কক্সবাজারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, এর ব্যয় ৩৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সিরাজগঞ্জ সরকারী ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপন প্রকল্প, এর ব্যয় ৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে একশ’ ফুট চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ৫ হাজার ৫৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার শিবপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ-নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প, এর ব্যয় ৪৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়) এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২০৩ কোটি ৬ লাখ টাকা।

বৈঠক সূত্র জানায়, কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে বালু নদী পর্যন্ত ১০০ ফুট প্রস্থ খাল খনন প্রকল্পটি অনুমোদন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানো হবে। আমি জানি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কঠিন হবে। কিন্তু যেসব সরকারী কর্মকর্তা কাজ করবেন তারা ভয়ভীতির উর্ধে থেকে কাজ করবেন, তাদের মনে রাখতে হবে তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আছে। তাছাড়া কুড়িল-পূর্বাচল এলাকার অবৈধ ভূমি দখলদারদের একটি তালিকা দেয়ার জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই তালিকা করতে হবে ব্রিটিশ আমলের সিএস খতিয়ান অনুযায়ী। তিনি বলেন, সেখানে ১০০ ফুট খাল খননের বিষয়ে অনেক পত্রিকা সমালোচনা করেছে, কিন্তু আমিতো চেয়েছিলান সেখানে ৩০০ ফুটের খাল হোক। কেননা আগে ঢাকার প্রত্যেক রাস্তার পাশে খাল ছিল। সেগুলো ভরাট করায় পানি রাস্তায় ভরে যাচ্ছে। এর আগে নিকুঞ্জে ১০০ প্লটের একটি প্রস্তাব আমার কাছে এসেছিল আমি সেটি বাতিল করে ওয়াটার বডি করেছি। ফলে বিমানবন্দরের রানওয়েতে এখন পানি ওঠে না।

এ সময় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, এটি একটি ভাল প্রকল্প। সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে তানা হলে এর ব্যয় বেড়ে যাবে। এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আরাস্তু খান জানান, এর আগে ওই এলাকায় ৩০০ ফুট সড়ক তৈরির জন্য ৬ হাজার ১০০ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছিল ৩৭৬ কোটি টাকা। লিংক রোড তৈরির সময় ১৩৭ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছিল ৪২ কোটি টাকা। যদিও সেটি ছিল অনেক বছর আগের কথা। আর এখন খাল খননের জন্য ৯৮ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ব্যয়টা একটু বেশি হয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, লিংক রোড তৈরির সময়ই খাল তৈরি করলে আজ আর এত ঝামেলা হতো না। ওয়াসার এমডি বলেন, শুধু টাকার পরিমাণ দেখলেই চলবে না। এর কস্ট বেনিফিট দেখতে হবে। জমির দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।

কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের দুপাশে খাল খনন সংক্রান্ত প্রকল্পের বিস্তারিত হচ্ছে, সরকারের নিজস্ব তহবিলের অর্থায়নে আগামী তিন বছরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সূত্র জানায়, ইউএনডিপি/ইউএনসিএইচএস এবং বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় রাজউক ২০ বছর মেয়াদি (১৯৯৫-২০১৫) ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্লান (ডিএমডিপি) প্রণয়ন করে। এই ডিএমডিপির তিনটি অংশ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান। স্ট্রাকচার প্ল্যান ও আরবান এরিয়া প্ল্যানের স্ট্র্যাটিজিগুলো ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমডিপি এলাকাকে পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত করে রাজউক ২০০৪ সালে ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু করে। ২০১০ সালে ডিএমডিপি এরিয়ার ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন সমাপ্ত করা হয় এবং ওই বছরে ২২ জুন তা গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

রাজউক এলাকায় সরকারী-বেসরকারী সংস্থাসহ ব্যক্তি খাতে যে কোন উন্নয়ন কর্মকা- রাজউক প্রণীত এই ড্যাপ অনুসরণ করে বাস্তবায়নের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ড্যাপে কুড়িল পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে কুড়িল হতে বালু নদী পর্যন্ত দুটি ১০০ ফুট প্রস্থের খাল খননের নির্দেশনা থাকায় সে মোতাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ড্যাপে বলা হয়েছে প্রস্তাবিত খাল দুটি ঢাকা মহানগরীর নিকুঞ্জ, বারিধারা, জোয়ার সাহারা, ডিওএইচএস, ক্যান্টনমেন্ট, আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট ও কালাচাঁদপুরসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের একমাত্র উপায়। তবে এর উদ্দেশ্য শুধু পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং ঢাকা মহানগরীর ওয়াটার এন্ড ল্যান্ড রেশিও ঠিক রেখে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ড্যাপে খাল দুটির প্রশস্ততা কমপক্ষে ১০০ ফুট রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয় খাল দুটি খননেন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্পটির ওপর গত ২৯ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে সেগুলো হচ্ছে, ৯৮ দশমিক ৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ, সাত লাখ ২৮ হাজার ৫২২ ঘন মিটার মাটি খনন, দুই লাখ সাত হাজার ৯২৪ বর্গমিটার রক্ষাপ্রদ কাজ, ৮৭ হাজার ৬৬৩ ঘন মিটার মাটির কাজ, ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৯২ ঘন মিটার মেকানিক্যাল কম্প্যাকশন, পাঁচ হাজার ৯৪৫ দশমিক ৫০ বর্গমিটার ব্রিজ নির্মাণ, ছয় হাজার ৫৩০ বর্গমিটার প্যালিসেডিং ওয়ার্ক এবং তিন লাখ ১৫ হাজার ৩৮৯ ঘন মিটার মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে।

এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) নির্দেশনা অনুযায়ী কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে খাল দুটি খনন করার মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর নিকুঞ্জ, বারিধারা, জোয়ার সাহারা, ডিওএইচএস, ক্যান্টনমেন্ট, হযরত শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কালাচাঁদপুরসহ ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর ওয়াটার বডি এ্যান্ড ল্যান্ড রেশিও ঠিক রেখে পানি সংরক্ষণ ও গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিংয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।