১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নগরীতে সামান্য বৃষ্টিতেই সীমাহীন জলাবদ্ধতা

ফিরোজ মান্না ॥ সামান্য বৃষ্টি হলেই মহানগরী ঢাকার রাস্তায় হাঁটু পানি। সদর রাস্তা থেকে শুরু করে অলিগলি সব পথেই ময়লা নোংড়া পানি আর পানি। বৃষ্টি নামলেই নগরবাসীর কপালে চরম দুর্ভোগ। এক দিকে রাস্তায় পানি- অন্যদিকে যানবাহন সঙ্কট। কি যে এক ভয়াবহ চিত্র ঢাকা নগরীর তা বৃষ্টি হলেই বোঝা যায়। এই দুর্ভোগ দূর করার জন্য সরকারের চারটি সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু কোন কোন সংস্থাই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলে নগরবাসীর বিস্তর অভিযোগ। ঢাকা মহানগরীকে বসবাস উপযোগী রাখতে ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই চারটি সংস্থার মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে রাজধানী ঢাকা দিন দিন অযোগ্য শহরে রূপ নিচ্ছে। এমন এক অবস্থায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র দাবি তুলেছেন, নগরীকে বসবাস উপযোগী রাখতে একটি আলাদা সংস্থা গঠন করতে হবে। যে সংস্থার মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশন উন্নয়ন কাজ করে যাবে। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনকে কাজ করতে ৫৭টি সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয়।

পানি বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত সম্প্রতি বলেন, দিনে দিনে ঢাকা শহর বসবাসের উপযুক্ততা হারাচ্ছে। বিশ্বের বসবাস যে কয়েকটি নোংরা শহর রয়েছে তার মধ্যে ঢাকার স্থান এখন দুই নম্বরে। এই শহরকে বসবাসের উপযোগী রাখতে হলে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। জলাবদ্ধতা কোনভাবেই ঢাকায় হতো না। কারণ ঢাকার চারপাশ দিয়ে চারটি নদী বহমান। এই নদীগুলো হচ্ছে বালু, বুড়িগঙ্গা, শীতালক্ষ্যা ও তুরাগ। এত সুন্দর একটি অবস্থানে শহরটি গড়ে উঠেছে যে, এটি হতো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহর। কিন্ত মুশকিল হচ্ছে সেই ব্যবস্থাটি আমরা অনেক আগেই ধ্বংস করে ফেলেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে নগরীতে ৬৫টি খাল ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খালের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪২টিতে। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খালগুলো বেদখলে চলে গেলেও ২৬টি খালের অস্তিত্ব থেকে যায়। এখন এই ২৬টির মধ্যে ১৩টি খাল কোন রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। খালগুলো উদ্ধার করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতের ঢাকা কি হবে চিন্তাই করা যায় না।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র (দক্ষিণ) সাঈদ খোকন ও উত্তরের মেয়র আনিসুল হক এক সুরেই বলেন, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কোন কিছু একা করার নেই। ৫৭টি সংস্থার সঙ্গে তাদের কাজ করতে হয়। এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। একমাত্র ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা ছাড়া একক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সিটি কর্পোরেশনগুলো। এমন পরিস্থিতিতে তারা দাবি করেন, ঢাকাকে বসবাস উপযোগী রাখতে পৃথক একটি সংস্থা গঠনের। এই সংস্থা সব বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মহানগরের উন্নয়ন কাজ দ্রুত গতিতে শেষ হবে। তখন এতগুলো সংস্থার কোন অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বলেন, গত কয়েক বছর আগেও রাজধানীতে ৩শ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও জলাবদ্ধতা বেশি সময় থাকত না। কিন্তু এখন ৩০ থেকে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই মহানগরী পানির নিচে চলে যায়। এটার মূল কারণ হচ্ছে রাজধানীর খালগুলো বেদখল হয়ে যাওয়া। খালগুলোর মূল মালিক ডিসি অফিস। তারা যদি খাল উদ্ধার না করে তাহলে সিটি কর্পোরেশন এককভাবে এই খালগুলো উদ্ধার করতে পারবে না। আনিসুল হক বলেন, ঢাকা আসলে কার্যত অচল শহরে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে এই শহর আইসিইউতে পরিণত করা হয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যত পরিনাম ভয়াবহ হবে।

ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান বলেন, ওয়সার কাজ পানি সরবরাহ ও স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপন করা। ড্রেনেজ ওয়াসার মধ্যে পড়ে না। ড্রেনেজের কাজ করে সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরপরও ৩২৫ কিলোমিটার ড্রেন ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী ওয়াসা হতে পারে না। গোটা ঢাকা শহরে আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি ড্রেন রয়েছে। এগুলোর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধাতা সৃষ্টি হলে দোষ দেয়া হয় ওয়াসাকে। এটা সাধারণ মানুষ না জানলেও সংশ্লিষ্টরা তো জানেন। এরপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য। ঢাকা ওয়াসা একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছে। যে প্ল্যান বাস্তবায়ন হলে ঢাকা একশ’ ভাগ স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ কাভারেজের আওতায় আসবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রধান প্রকৌশলীকে পাওয়া যায়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, নগরীর কিছু ড্রেন তাদের আওতায় রয়েছে। বাকি ড্রেনগুলো সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও ওয়াসার আওতায় রয়েছে। এককভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে না। এটা আসলে যে কোন একটি সংস্থার হাতে থাকলে কাজের গতিও বাড়ত। আবার জবাবদিহিতাও থাকত। এখন কোন সংস্থাকেই এককভাবে দোষ দেয়ার কিছু নেই।

অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক) কিছু কিছু এলাকায় ড্রেন ও রাস্তার কাজ করে আসছে। তারাও এককভাবে ড্রেন বা রাস্তার কাজ করে না। বিষয়টি জানতে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে রাজউকের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজউক তার প্রকল্প এলাকাগুলোতে রাস্তা, ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইন স্থান করে থাকে। অল্প কিছু কাজ প্রকল্প এলাকার বাইরেও করা হয়েছে। ওইসব ড্রেন ও রাস্তা সচল রয়েছে। রাজউকের কাজ নিয়ে কোন সমস্যা নেই। তবে রাজধানীর জলাবদ্ধার পিছনে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। যদি সমন্বিত উদ্যোগ থাকত তাহলে সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা ডুবে যেত না।

ওয়াসা তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীতে ওয়াসার ২৬ খালের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ খাল সচল আছে। বাকি খালের অনেকাংশই গিলে খেয়েছে প্রভাবশালীরা। এ কারণে সামন্য বৃষ্টি হলেই নগরীতে তৈরি হচ্ছে সীমাহীন জলাবদ্ধতা। দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারে ওয়াসা চেষ্টা করেও পারছে না।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকার খালগুলো উদ্ধার করার বিকল্প নেই। খাল উদ্ধার না করতে পারলে ঢাকা শহর ভবিষ্যতে বসবাসের উপযুক্ততা হারাবে। এক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তখন হাজার চেষ্টা করেও নগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না।

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন অংশে প্রবাহিত ১৩টি খাল ক্রমান্বয়ে অবৈধ দখলমুক্ত করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের সহায়তায় খালগুলো থেকে সিএস দাগ অনুযায়ী অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। পুনর্দখল ঠেকাতে খালগুলোর পাড় বাঁধানোর প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। রাজধানীতে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বৃষ্টির পানি সহজে নিষ্কাশনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার খাল উদ্ধারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। খালগুলো উদ্ধার হলে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে। ডিসি অফিসের মালিকানাধীন ২৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ করে যাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা।

এদিকে, গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীকে একশ’ ভাগ স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ কাভারেজের আওতায় আনার জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে বসে আছে। বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ এখনও নেয়া হয়নি। টাকার অভাবে এই মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া সামন্য বৃষ্টিপাতে নগরীর বিভিন্ন রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে। এতে মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে নগরীতে মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ এলাকা ড্রেনেজ কাভারেজের আওতায় রয়েছে। এ মাস্টার প্ল্যানের আওতায় ঢাকা ওয়াসা সার্ভিস এরিয়া প্রায় ৪শ’ বর্গ কিলোমিটার। রাজউকের ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি)-এর মোট ১৫২৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের মধ্যে নিতে ঢাকা ওয়াসা এই প্ল্যান তৈরি করছে।

ঢাকা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। নগরীর মধ্য দিয়ে আগে ৬৫টি খাল জালের মতো বিস্তৃত ছিল। বৃষ্টি হলেই জমাট পানি খাল দিয়ে নদীতে চলে যেত। এই খালগুলোর এখন আর কোন অস্তিত্ব নেই। হাতেগোনা কয়েকটি খালকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। এত বড় শহরের পানি সামান্য কয়েকটি খাল দিয়ে বের হতে পারে না। ফলে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করতে হচ্ছে। কৃত্রিম ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ভাগ। বাকি পানি জলাবদ্ধার সৃষ্টি করে। নগরীর জলাবদ্ধতা স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাকে শতভাগ নিশ্চিত করার জন্য ওয়াসা মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পর্যায়ক্রমে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়েন করা হবে।