২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লন্ডন থেকে ফিরে কি করেন খালেদা জিয়া দেখার অপেক্ষায় নেতাকর্মীরা

  • কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অনেকেই তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত

শরীফুল ইসলাম ॥ লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কী করেন তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দলের নেতাকর্মীরা। গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবীপ্রত্যাশী কোন কোন নেতা দেশে বসেই বিভিন্ন মাধ্যমে লন্ডনে মা-ছেলে সাংগঠনিক বিষয়ে কী করছেন সে ব্যাপারে খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের আশা, ঢাকা ত্যাগের আগে সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের যে আশ্বাস দিয়ে গেছেন তারেক রহমানের মতামত নিয়ে দেশে ফিরে খালেদা জিয়া তা দ্রুত বাস্তবায়ন করবেন।

উল্লেখ্য, ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগের দিন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠককালে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেন, যত দ্রুত সম্ভব তিনি সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন করে দল ঢেলে সাজাতে চান। এজন্য দলের সব কেন্দ্রীয় নেতাকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জেলা-উপজেলাসহ সকল ইউনিট কমিটি পুনর্গঠনের কাজ তদারকি করতে বলেন। তিনি দেশে ফিরে তৃণমূলপর্যায়ে দল পুনর্গঠনে কে কতটুকু ভূমিকা পালন করেছেন সে বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন বলেও তাদের জানান। দলের সিনিয়র নেতারাও খালেদা জিয়াকে আশ্বস্ত করেন, তিনি লন্ডনে থাকাকালে তারা তার এ নির্দেশ পালন করবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালেদা জিয়ার নির্দেশ মেনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অনেকেই এখন তৃণমূলপর্যায়ে দলের কমিটি পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এ কারণে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি জেলায় ওয়ার্ড ও ইউনিয়নপর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষপর্যায়ে। কোন কোন জেলায় উপজেলা ও পৌরসভা কমিটি পুনর্গঠনের কাজও শেষপর্যায়ে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তৃণমূলপর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজ আরও এগিয়ে যাবে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালেদা জিয়া দেশে ফিরেই একে একে সব জেলা কমিটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৃণমূলপর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে জানতে চাইবেন। আর তিনি লন্ডন থেকে ফেরার আগেই যেসব সাংগঠনিক জেলায় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও থানা কমিটি পুনর্গঠন শেষ হচ্ছে সেসব জেলায় কাউন্সিল করে কমিটি পুনর্গঠন করে দেবেন। এভাবে একে একে বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা ও ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন শেষ করে দলের জাতীয় কাউন্সিল করে জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করবেন খালেদা জিয়া।

পৌনে ছয় বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করে বিএনপি। তবে জাতীয় কাউন্সিলের আগে সারাদেশের সকল জেলা-উপজেলার কমিটিও কাউন্সিলের মাধ্যমে করার চেষ্টা করে দলীয় হাইকমান্ড। কিন্তু ছয় মাসেরও বেশি সময় ব্যয় করে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সকল জেলা-উপজেলায় কেন্দ্র থেকে কমিটি করে দেয়া হয়। এমনকি তৃণমূলপর্যায় থেকে জাতীয় কাউন্সিলে আগত কাউন্সিলরও কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দেয়া হয়। তাই ২০০৯ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে এবার যাতে জাতীয় কাউন্সিলের আগে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের কমিটি করা সম্ভব হয় সেজন্যই খালেদা জিয়া বার বার দলের সিনিয়র নেতাদের তাগিদ দিয়েছেন।

বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন, তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করে দলের ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির বেশ কয়েকজন নেতাই এখন নিষ্ক্রিয়। কয়েকজন নেতা মারাও গেছেন। আরও কয়েকজন নেতা অসুস্থ। আর ২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। এদিকে তৃণমূলপর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন শেষে জাতীয় কাউন্সিল করে নতুন জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করলে কাকে দলের মহাসচিব করা যায় এ বিষয়টিও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থানকালেই ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নেবেন। তারেক রহমানের সম্মতি পেলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারমুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে যাওয়ার আগেই দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ও সাংগঠনিক জেলা কমিটিসহ বিভিন্ন স্তরের কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি মাথায় রেখে ফাইলওয়ার্ক করে গেছেন। নতুন কমিটিতে কাদের স্থান দেয়া যায়, কাদের পদোন্নতি দেয়া যায় এবং কাদের বাদ দেয়া যায় এমন একটি খসড়াও তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। অপরদিকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডনে বসেই তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন স্তরে কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। তাই লন্ডনে দলের বিষয়ে মা-ছেলের আলোচনার মধ্য দিয়ে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে ভাল কিছু হবে বলে দলের নেতাকর্মীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে দলের নতুন কমিটি গঠনের ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যতবার চেষ্টা চালিয়েছেন ততবারই তারেক রহমানের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে তাকে দেখিয়ে যেন নতুন কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না হওয়ায় খালেদা জিয়া কমিটি গঠনের কাজ স্থগিত রাখেন। এখন লন্ডনে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্তে বেশ কয়েক দিন সময় কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে খালেদা জিয়ার। তাই এ সুযোগে খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক রহমানের সহযোগিতা নিয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন স্তরের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ গুছিয়ে আনবেন।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নসহ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন তারেক রহমান। এছাড়া দল ক্ষমতায় থাকাকালে সারাদেশে ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা করে তিনি সর্বস্তরের নেতাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করলেও দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই দলের কমিটি গঠনের ব্যাপারে খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক রহমানের সহযোগিতা নিচ্ছেন। আর এ কারণেই দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এবার দল পুনর্গঠনের বিষয়ে ভাল কিছু হবে বলে আশাবাদী হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান জনকণ্ঠকে বলেন, চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশে আমরা তৃণমূলপর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করলেও দলের মঙ্গলে কাজ করছেন। খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থানকালে অন্যান্য বিষয়ের মতো বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়েও তারেক রহমানের মতামত নেবেন। তাই আমরা আশা করছি, লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু বলেন, তারেক রহমান বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। বিএনপির কল্যাণে তিনি রাজনীতি করেন। খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থানকালে তারেক রহমান নিশ্চয়ই তাকে সুপরামর্শ দেবেন। তাই খালেদা জিয়া দেশে ফিরে বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে ভাল কোন বার্তা দেবেন বলে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মতো আমিও আশাবাদী।