২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুসলিম উম্মাহর সেবায় সৌদি আরব

  • ৮৫তম সৌদি জাতীয় দিবস

‘মুসলিম ও আরব দেশের ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আমরা সকল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব এবং মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করব।’

সাবেক খাদিমুল হারামাইন আল শরিফাইন বাদশাহ ফাহদ বিন আব্দুল আযীযের উপরোল্লিখিত বক্তব্যে ইসলাম এবং সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য সৌদি আরবের ত্যাগের স্বরূপ প্রতিবিম্বিত হয়েছে। সৌদি আরব বিভিন্নভাবে মুসলিম উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত। আর্থিক সাহায্য হিসেবে রাজকীয় সৌদি আরব শত শত কোটি ডলার সারাবিশ্বে খরচ করেছে। প্রতিবছর পবিত্র মক্কা নগরীতে মুসলমানদের নির্বিঘেœ ও নিরাপত্তাসহকারে হজ, উমরাহ ও জিয়ারত সম্পাদনের নিমিত্তে ব্যাপকভাবে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে মক্কায় পবিত্র মসজিদুল হারাম এবং মদিনায় মসজিদে নববীর বিস্তৃতি সাধন করা হয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য উল্লিখিত বৃহৎ প্রকল্প ছাড়াও সৌদি আরবের অসংখ্য মানবসেবামূলক প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে অমুসলিম দেশে অবস্থিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের নানাবিধ সেবা প্রদান করা। পরিচিত মুসলিম বিশ্বের বাইরেও কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে নিজ নিজ দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করছে এবং ক্রমে তাদের সংখ্যা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামের সূতিকাগার হিসেবে সৌদি আরব শুধু মুসলিম বিশ্বের প্রতি নয়, বরং এর বাইরে অবস্থিত মুসলমানদের প্রতিও বিশেষ দায়িত্ব অনুভব করছে। এ দায়িত্ব পালনার্থে গত কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব অমুসলিম সমাজে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জোরদার করতে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের পুরোভাগে রয়েছে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্রসমূহ নির্মাণ করা। এ ধরনের প্রকল্প বহু পূর্ব থেকে শুরু হলেও আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসব প্রকল্প ব্যাপকতা লাভ করে। যার ফলে বিশ্বজুড়ে ১৫০০ মসজিদ ও ২১০টি ইসলামী কেন্দ্র সৌদি সরকারের খরচে নির্মিত হয়েছে। এ কেন্দ্রগুলো বহুমুখী ভবনরূপে নির্মিত হয়েছে, যা শুধু ধর্মীয় চাহিদাই নয়, বরং মুসলমানদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য চাহিদাও মেটাতে সক্ষম হয়েছে। উক্ত ইসলামী কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ নিউইয়র্ক, লস এ্যাঞ্জেলেস, সানফ্রান্সিসকো, শিকাগো, মাদ্রিদ, লন্ডন, রোম, প্যারিস, বন, ব্রাসেল্স, জেনেভা, টোকিও, টরেন্টো, ভিয়েনা, লিসবন, বুয়েনস আয়ারস, এডিনবরা এবং রিওডি জেনিরো। এর পাশাপাাশি তুলনামূলক ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রয়োজনমাফিক ছোট আকারের মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্রসমূহ নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলো সাধারণত এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত। মুসলিম ও আরব বিশ্বের মধ্যে সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী দা’ওয়াত প্রচারের লক্ষ্যে সৌদি আরব জাতীয় ও আন্তর্জাতিকমানের কয়েকটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। সেগুলো হলোÑ

(১) ইসলামী সহযোগিতা (সম্মেলন) সংস্থা (ওআইসি) (২) রাবেতা আল আলম আল ইসলামী (৩) বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশন। সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বে ইসলামী ভাবধারা সমৃদ্ধকরণ ও ইসলাম, আরবী ও ইসলামী খিদমতকে ত্বরান্বিত করা জন্য বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধায়নে কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার ঘোষণা করেন ১৯৭৯ সাল থেকে এবং এ পর্যন্ত এ পুরস্কার অব্যাহত রয়েছে। এ পুরস্কার ইসলামের খিদমত, ইসলামী শিক্ষা, আরবী সাহিত্য, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের ওপর দেয়া হচ্ছে, যা মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে প্রাপ্ত হচ্ছে। (৪) ওয়ার্ল্ড এ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইউথ (ওয়ামি) (৫) আন্তর্জাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থা (আইআইআরও) (৬) বাদশাহ ফাহদ কোরান প্রিন্টিং কমপ্লেক্স। এটি বাদশাহ ফাহদের নিজস্ব উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে মদিনা মুনাওয়ারার তাবুক রোডের পাশে ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর নির্মিত হয়। এ কমপ্লেক্স শুরু থেকে অদ্যাবধি ১৫ কোটির অধিক মুসহাফে মদিনা কপি পবিত্র কোরান, লাখ লাখ কপি অডিও ক্যাসেট এবং বাংলাসহ পৃথিবীর প্রধান প্রধান ৫৭টি ভাষায় ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। (৭) বসনিয়া-হারজেগোভিনার মুসলমানদের জন্য সাহায্য সংগ্রহের উচ্চ কমিটি।

উক্ত সংস্থাসমূহের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছেÑ

১. বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট নানাবিধ দুর্যোগে আক্রান্তদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আর্থিক সাহায্য দান ও পুনর্বাসন ২. কৃষি সম্প্রসারণ ৩. বাঁধ নির্মাণে কারিগরি সহায়তাদান ৪. কূপ খনন ৫. বিচ্ছিন্ন স্থান সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ৬. ক্লিনিক স্থাপন ও ৭. স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি মানবিক সেবা প্রদান।

নির্যাতিত মুসলিম জনতার পাশে সৌদি আরব

সৌদি আরব শুধু বিশ্বব্যাপী মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্র নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং যেখানেই মুসলমানরা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, সেখানেই তাদের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছে। যেমনÑ

(১) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সৌদি আরব এবং এর ইসলামী সংস্থাসমূহ মধ্য এশিয়ার নব সৃষ্ট মুসলিম প্রজাতন্ত্রসমূহকে সাহায্যের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়ার কমিউনিজমের শাসনামলে বৃহত্তর রাশিয়ার কোটি কোটি মুসলমান নির্যাতিত হয়েছিল এবং তাদের মুসলিম বিশ্ব থেকে সাত দশক বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। এ সময় মুসলমানরা কোনক্রমে আত্মরক্ষা করলেও অধিকাংশ মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং পবিত্র কোরান শরীফের প্রকট অভাব দেখা দিয়েছিল। সৌদি আরব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ৬টি মুসলিম প্রজাতন্ত্রের রাজধানীতে বিশাল বিশাল ইসলামী কেন্দ্র স্থাপন করেছে এবং প্রজাতন্ত্রসমূহের ছোট শহরগুলোতে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় অনূদিত এবং মদিনার বাদশাহ ফাহদ কোরান প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে মুদ্রিত লাখ লাখ কপি পবিত্র কুরআনুল কারীম বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বিমানযোগে ঐ সব দেশের মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্রসমূহে প্রেরণ করা হয়েছে।

(২) সৌদি আরবের জাতীয় কর্মসূচীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মুসলিম বিশ্বের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিশু ও যুবকদের জন্য ইসলামী ও আরবী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্রসমূহকে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি সৌদি আরব উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে বিভিন্ন ইসলামী একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব একাডেমি পরিপূর্ণ স্কুল হিসেবে আরবী ও ইসলামী শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে স্থানীয় ভাষায় অন্যান্য সিলেবাস ও পাঠদান করে থাকে। এ ছাড়া সৌদি আরব সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ছাত্রদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে বিভিন্ন সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার ছাত্র এ ধরনের বৃত্তির সুযোগ নিয়ে মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে।

(৩) ইসলামের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এবং ইসলামের সঠিক জ্ঞান প্রচারার্থে সৌদি আরব নিজস্ব অর্থায়নে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী শিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ’ল স্কুল এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী বিভাগ। এসব প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রের মাধ্যমে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত মুসলমানদের বিবিধ প্রয়োজন মেটানো এবং মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের মধ্যে উত্তম সমঝোতার আবহ সৃষ্টি করাই সৌদি আরবের মূল লক্ষ্য।

(৪) বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মুসলমানরা যখন সার্ব বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার শিকার হয় তখন সৌদি আরব সেখানকার মুসলমানদের সৌদি আরবে এনে রক্ষা করে এবং তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়।

(৫) ২০১২ সালে মিয়ানমারের মুসলমানরা গণহত্যার শিকার হলে সৌদি আরব ওআইসির চতুর্থ বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে এবং তাদের জন্য ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা দেয়। সৌদি আরবে অবস্থিত ৫০ হাজার আরাকানির নাগরিকত্ব প্রদান করে। বর্তমানে আরও ৫ লাখ আরাকানি মুসলমান সৌদি গমনে প্রক্রিয়াধীন আছে।

ড. আব্দুল আযীয হুসাইন আসসুওয়াইগ তার রচিত ‘সৌদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন’ পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর সেবায় সৌদি আরব যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা মূলত চার প্রকার। ১. রাজনৈতিক কারণে ২. সাংস্কৃতিক কারণে ৩. অর্থনৈতিক কারণে ও ৪. মানবিক কারণে। এসব বিষয় বিবেচনায় দেখা যায় যে, সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করছে।

পরিশেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সৌদি আরব বিশ্বের মুসলমান ও নিপীড়িত জনগণের জন্য যে প্রভূত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে তা এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে। ত্রিশের দশকে সমৃদ্ধির পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলা দেশটি অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কর্মসূচী দিয়ে মুসলিম বিশ্বকে খানিকটা এগিয়ে দিয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সৌদি আরব বিশ্বের মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার যে রোডম্যাপ সৃষ্টি করেছে তা অমুসলিম উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাসের সৌজন্যে