২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ববিদ্যালয় কেন শেষ ইউটোপিয়া

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শেষ ইউটোপিয়া : বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে অস্থির, সংক্ষুব্ধ, বিভিন্নপন্থী, সমাজ ও রাষ্ট্রের গতানুগতিক ভূমিকার প্রতিরোধকারী, সমাজ ও রাষ্ট্রের গতানুগতিক ভূমিকার বিরোধী। এখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় সমালোচনা করে সবকিছুর, ব্যাখ্যা করে সবকিছুর; সমালোচনা পছন্দ করে না সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কিংবা রাজনৈতিক দল, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা তৈরি হয় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে, আমলাতন্ত্র থেকে, আমলাতন্ত্রের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাজনৈতিক দল থেকে।

ছাত্ররা প্রধানত গরিব সমাজ থেকে আসেন। এক হিসেবে ছাত্রদের বলা যায় ইমিগ্রান্ট কমিউনিটি, তারা শহরের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডেনটিটি তৈরি করে দেয়, ছাত্রাবাসগুলোর র‌্যাডিক্যাল রাজনীতি ও শৈল্পিক জীবনযাপনের কেন্দ্র, একই সঙ্গে তারা সমাজতান্ত্রিক, নৈরাজ্যিক আন্দোলনের কিংবা বিভিন্ন আন্দোলনের সূতিকাগার, এখান থেকেই তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেনেসাঁ। হারলেম রেনেসাঁর কথা ভোলা যায় না। এ্যান ডগলাস তাঁর টেরিবল অনেস্টি বইটিতে এই কথাটি বার বার বলেছেন। পেইন্টিং, ফটোগ্রাফি, সঙ্গীত, নাটক, নৃত্য এবং ভাস্কর্যের বিভিন্ন পায়োনিয়ার এবং উদ্ভাবকরা বিশ্ববিদ্যালয় আলো করে রেখেছেন। এ হচ্ছে শহুরে অভিজ্ঞতা, শহুরে আখ্যান ছাত্র ও শিক্ষক ধরে রেখেছেন। এর মানে এই নয় যে, গ্রামীণ অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে কিংবা দেশজ অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্বশীলতা তৈরি করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের অভিজ্ঞতাই পড়ানো হয়, সেই পড়ানোর ভিত্তি নান্দনিকতা এবং ঐতিহাসিকতা। এই দুই মিলে বেঁচে থাকার মতাদর্শ আমাদের ঘিরে ধরে। এই হচ্ছে ইতিহাসের নিয়ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে শেখানো হয় কী করে বড় মাপের বই পড়তে হয়। এই পড়াটা হচ্ছে বাস্তব জীবনে বাস্তব ব্যবহার। বেঁচে থাকার হেরিটেজ বার বার আদায় করে নিতে হয়। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকে, সকল দুর্যোগে বেঁচে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ জ্ঞানচর্চা করা। আর আমলাতন্ত্রের কাজ জ্ঞানচর্চার বিরোধিতা করা। জ্ঞানের মটো হচ্ছে, লুকাচ যেমন তার বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : হিস্ট্রি এ্যান্ড ক্লাস কনসাসনেস, মানুষকে অনবরত চিন্তার মধ্যে বাস করতে হয় সেজন্য চিন্তার মধ্যে বসবাস জরুরী, এ জায়গাটা ধরিয়ে দেন আডর্নো, বেনজামিন, ব্রক, হরখাইমার এবং হ্যাবারমাস; আর আমলাতন্ত্র হুকুমের অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকারকে নিয়ে আসে। আমলাতন্ত্রের প্রজেক্ট হচ্ছে মানুষকে পরাজিত করা, আর বিশ্ববিদ্যালয় এই পরাজয় কিছুতেই মানে না। সমালোচনামনস্ক প্র্যাকটিস যদি পাঠ করা হয়, তাহলে স্পষ্ট হয় ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তি যোগায়, অন্যপক্ষে আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা একটি রাষ্ট্র ও সরকারকে পেছন দিকে হাঁটতে শেখায়। এই শেখানোর ফলে আমলাতন্ত্রীরা কিছুই শেখে না। একটা বড় উদাহরণ হচ্ছে : নারীবাদী লেখক। সান্দ্রা গিলবার্ট ও সুসান গুবার-এর : দ্য ম্যাড ওম্যান ইন দি এটিক বইটি। বইটি আমাদের জানায় যে, একটি নারীবাদী উপস্থিতি চিলেকোঠায় নির্বাসিত হয়ে আছে। সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমলাতন্ত্র এই কাজটি নিপুণভাবে করে।

এই অভিজ্ঞতা মনের মধ্যে রেখে আমরা তাকাই আমলাতন্ত্রের দিকে। রাষ্ট্র ও সরকারের (অথবা আমলাতন্ত্রের) দিকে তাকালে বোঝা যায় জনসাধারণের আধ্যাত্মিক মুক্তি এক্ষেত্রে কোথাও নেই। আমলাতন্ত্র সব কিছু থেকে সরে থাকে, সেখান থেকে সৃষ্টি করতে চায় স্বাধীনতা। কিন্তু সে কি সম্ভব? শিক্ষকদের সমস্যা আমলাতন্ত্রের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। শিক্ষকরা কি নেহাৎ উচ্চহারে বেতন চাচ্ছেন? এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও দুই মন্ত্রীর (অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী) মধ্যে তফাৎ। দুই মন্ত্রী বেতনের দিক থেকে সমস্যাটা বুঝতে চাচ্ছেন। আর প্রধানমন্ত্রী সমস্যাটা সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের সমস্যা হিসেবে বুঝতে চাচ্ছেন। দুই মন্ত্রীর কাছে সমস্যাটা কলোনিয়ালিজমের অভিজ্ঞতা বলে মনে হয়েছে। জীবনযাত্রার ডিবেসমেন্ট হিসেবে দুই মন্ত্রী কিছুতে দেখতে চান না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা এবং শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে ডিবেসমেন্ট হিসেবে দেখেছেন। তিনি মানুষের ডিবেসমেন্টের বিরোধী। আমলাতন্ত্রের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্যে ক্রিয়াশীল সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিরোধ করা। সেজন্য জ্ঞানের মুক্তির বিরোধী সর্বক্ষণ আমলাতন্ত্র। মানুষ আমলাতন্ত্রের কাছে অধস্তন জীব। সেজন্য আমলাতন্ত্রের কাছে সাধারণ মানুষের জন্য (কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য) কোন সাংস্কৃতিক স্পেস নেই। জ্ঞান যে মানুষের অধিকার এই বোধ অস্বীকার করে আমলাতন্ত্র জাতীয় বাস্তবতা তৈরি করতে সচেষ্ট। এ ধরনের জাতীয় বাস্তবতার ভিত্তি হচ্ছে কলোনিয়াল আমলাতন্ত্র। এই আমলাতন্ত্রের মধ্যে আশা নেই, দাক্ষিণ্য নেই, সাহস নেই। বিশ্ববিদ্যালয়, এই কারণে রাষ্ট্র ও সমাজের শেষ ইউটোপিয়া, বেঁচে থাকার শেষ সম্বল, বিশ্ববিদ্যালয়, সেজন্য বিভিন্ন বাস্তবতার ঐতিহাসিক এসার্সসন। এই এসার্সসনকে অস্বীকার করার সাহস আমলাতন্ত্রের নেই। আমলাতন্ত্রের কাজ সরকারের জন্য সাহস সৃষ্টি করা, সরকারকে পশ্চাৎপদ করে রাখা নয়। আমরা সাহসী আমলাতন্ত্র চাই, ভীরু আমলাতন্ত্র চাই না, সাধারণ মানুষের বিরোধী আমলাতন্ত্র চাই না।