২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘জাতীয় দলের রেজাল্টে দেশের ফুটবলের মূল্যায়ন ঠিক নয়’

  • রুমেল খান

বাংলাদেশের ফুটবল এখন পার করছে ক্রান্তিকাল। ফুটবলের এই দুঃসময়ে শক্ত হাতে হাল ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সভাপতি কাজী মোঃ সালাউদ্দিন। বড় স্বপ্ন দেখা এবং সেটার বাস্তবায়ন করতে ভালবাসেন তিনি। সারাবছর মাঠে ফুটবল রাখা, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি, মেসিদের ঢাকায় আনা, জেলা ফুটবল লীগের সম্প্রসারণ, সিলেট বিকেএসপি নির্মাণসহ অনেক কিছুই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি। তার আরেকটি স্বপ্ন আছে, যা অনেক বড়। সেটা যদিও সুদূরপ্রসারী। আর তা হলো, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলবে বাংলাদেশ। যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘ভিশন ২০২২।’ তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কেমন করছে ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে? সেটা খুব একটা আশাপ্রদ নয়। এশিয়া জোনের ‘বি’ গ্রুপে পাঁচ দলের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে আছে মামুনুলরা। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলেছে চার ম্যাচ। ১টিতে ড্র (তাজিকিস্তানের সঙ্গে ১-১) করেছে। হেরেছে বাকি ৩টিতেই (কিরগিজস্তানের কাছে ১-৩, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ০-৫ এবং জর্দানের কাছে ০-৪ গোলে)। সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর জর্দানের সঙ্গে ম্যাচ খেলার পর বাংলাদেশ দলের ডাচ্ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফের সঙ্গে চুক্তি আর নবায়ন করেনি বাফুফে। তার জায়গায় আপাতত চার মাসের জন্য আনা হয়েছে নতুন ইতালিয়ান কোচ ফ্যাবিও লোপেজকে। সময় অনুযায়ী লোপেজ পাবেন বাছাইপর্বের তিন ম্যাচ এবং আগামী বছরের জানুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের এ্যাসাইনমেন্ট।

বাছাইপর্বে বাংলাদেশের চার খেলা দেখে কী মনে হয়েছে? ‘দেখুন, জাতীয় দলের খেলা দেখে আমি সন্তুষ্ট নই। তাছাড়া শুধু জাতীয় দলের ফলের ওপর দেশের ফুটবলের মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। ফুটবলের অবকাঠামো কোন পর্যায়ে আছে, সেটাই হচ্ছে আসল বিষয়।’ কথাগুলো জুয়েল রানার। যতদিন ফুটবল খেলেছেন, ততদিন তিনি দেশ ও ক্লাবের জন্য আসলেই ‘জুয়েল’ হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়নÑ এক আবাহনী ছাড়া সব বড় ও প্রতিষ্ঠিত দলেই খেলেছেন দাপটের সঙ্গে। স্টপার ব্যাক পজিশনে তাকেই বলা যায় দেশীয় ফুটবলের সর্বশেষ তারকা। তার মতো এমন তুখোড় ডিফেন্ডার এখন পর্যন্ত সেভাবে তৈরি হয়নি। কায়সার হামিদ ও প্রয়াত মোনেম মুন্নার মতো তারকা ডিফেন্ডারদের সঙ্গে যথাক্রমে মোহামেডান ও জাতীয় দলে দীর্ঘদিন খেলেছেন সুনামের সঙ্গে। তার খেলোয়াড়ি জীবনের স্বর্ণসময় কেটেছে মোহামেডানে। খেলা থেকে অবসর নেয়ার পরও (শুরু করেন ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধার হয়ে, শেষ করেন ২০০৭ সালে মোহামেডানের হয়ে) খেলার সঙ্গেই আছেন। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্লাব শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।

জুয়েলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বন্তু ছিল ফিফা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ দলের চার খেলা, অনুষ্ঠিতব্য চার খেলা, ক্রুইফের বিদায় ও নতুন কোচের আগমন এবং অনুশীলন ক্যাম্প থেকে হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাসের বহিষ্কার হওয়া নিয়ে। কিন্তু ওসবের ধারে কাছেও গেলেন না জুয়েল। বরং যা বললেন, তা পরিণত হলো লেখার নতুন বিষয়বস্তুতে!

সত্তর থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশের ফুটবলের ছিল স্বর্ণযুগ। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা। তবে সালাউদ্দিন মৃতপ্রায় ফুটবলকে আবারও বাঁচিয়ে তুলবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার কল্যাণেই মাঠে এখন বারো মাসই ফুটবল থাকে, ফুটবলারদের পারিশ্রমিক আগের চেয়েও বেড়েছে, ফুটবলাররা এখন বিদেশী ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন ... কোন সন্দেহ নেই, এসবই ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু জুয়েল মনে করেন দেশের ফুটবলের উন্নতি ঘটাতে গেলে এগুলোই যথেষ্ট নয়। তার ভাষ্য, ‘টেম্পারমেন্ট, সুযোগ-সুবিধা এগুলো দেখতে হবে। ফুটবলে শতভাগ পেশাদারিত্ব আনতে হবে। দেশের কোন ক্লাবের নিজস্ব জিম নেই, অধিকাংশ ক্লাবেরই নিজস্ব মাঠ নেই। এগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।’ দেশজুড়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, স্কুল ফুটবল, জেলা ফুটবল নিয়মিত আয়োজন, বিলুপ্তপ্রায় শেরেবাংলা ফুটবল, সোহরাওয়ার্দী ফুটবল টুর্নামেন্ট আবারও চালু করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন জুয়েল। ভাল দেশী কোচের দরকার তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলে, সেটাও তিনি পরামর্শ দেন। তাছাড়া তিনি বলেন, ‘সিলেটের বাফুফে ফুটবল একাডেমি চালু হয়েছে, খুবই ভাল কথা। কিন্তু শুধু এই একটি একাডেমি করেই এদেশের ফুটবলের রাতারাতি উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। তৈরি করতে হবে এ রকম আরও কয়েকটি একাডেমি। তবে আমি জানি, আমাদের সম্পদ ও সামর্থ্য সীমিত। এজন্য আমাদের করতে হবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। সেটা কমপক্ষে ৫০ বছরের। সালাউদ্দিন ভাই চেষ্টা করছেন, তবে যতটা এগুনোর কথা, ততটা তিনি এগুতে পারেননি। এর কারণ বাফুফেতে এখন রাজনীতি ঢুকে গেছে। তাছাড়া জেলা ফুটবল এ্যাসোসিয়েশনের অনেক কর্মকর্তার বেশিরভাগই রাজনীতি করেন, ফুটবল বোঝেন কম!’

ক্লাব ফুটবলে ভাল খেলা, বিদেশী ফুটবলার আধিক্য কমানো ... এগুলো নিয়েও কথা বলেন জুয়েল, ‘আামদের লীগে বিদেশী ফুটবলার বেশি পরিমাণে খেলে বলে স্থানীয় ফুটবলাররা সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না। এজন্য বিদেশী ফুটবলাররা আমদানী বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে প্রতিভাবান ফুটবলারদের কোন কমতি নেই। আমাদের ফুটবলারদের যে সামর্থ্য আছে, সেটা বুঝে অগ্রসর হতে হবে।’ জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত ফুটবলারদের যোগান দিতে ‘ট্যালেন্ট হান্ট’-এর কোন বিকল্প নেই। এই প্রসঙ্গে জুয়েলের অভিমত, ‘বাফুফের প্লেয়ার হান্ট কর্মসূচীর অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। কিন্তু দেখা যায়, পরবর্তী পর্যায়ে এদের অনেকেই যথাযথ পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এয়ারটেল রাইজিং ট্যালেন্ট হান্টের কথা। এখানে নির্বাচিত কিশোর ফুটবলারদের ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য। কিন্তু পরে দেখা যায় এদের খুব কমই টিকে গেছে। এদের কাজে লাগাতে হবে যথাযথভাবে। তাদের জন্য তৈরি করে দিতে হবে খেলার ক্ষেত্র।’

বাংলাদেশের ফুটবল যেন ক্রমেই ‘ঢাকা নির্ভর’ হয়ে না পড়ে, এ বিষয়েও অভিমত ব্যক্ত করেন জুয়েল। সেই সঙ্গে বলেন, ফুটবলটা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়াতে ঢাকাতেই ফুটবল সমর্থকদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। অথচ ঢাকার বাইরে সিলেট, রাজশাহী, যশোরে খেলা হলে দর্শক-সমর্থকদের কোন কমতি হয় না। এদেরও কাজে লাগাতে হবে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে। ‘পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা ... সবকিছুর মতো যদি ফুটবলও ঢাকা কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে ফুটবলকে বাঁচানো যাবে না।’

সরকার বদল হলে বাফুফের ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনাও যে বদলে যায়, এর সমালোচনা করেন জুয়েল, ‘এসব বন্ধ করতে হবে। সরকার বদল হতেই পারে, কিন্তু ফুটবলের সিস্টেম বদল করা ঠিক নয়। ফুটবলকে চলতে দিতে হবে ফুটবলের মতো। এখানে সরকারী হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, বরং সাহায্য করা উচিত।’ সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিদেরই ফুটবল উন্নয়নে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন জুয়েল। তিনি আরও বলেন, ‘একাডেমি ভিত্তিক কার্যক্রমের পরিধির আরও বিস্তৃতি ঘটাতে হবে। এই যে অনুর্ধ ১৬ দল ক’দিন আগে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের কাছে দুই ম্যাচে ১১ গোল খেল। অথচ আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে অনুর্ধ ১৬ দলের রেজাল্ট মোটেও এমন হতো না। আমার মতে, স্বল্প মেয়াদে বিদেশী কোচ এনে কোন লাভ নেই। আমাদের দেশীয় কোচদেরই দীর্ঘমেয়াদী এবং উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য করে তুলে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলগুলোতে নিয়োগ দেয়া উচিত লম্বা সময়ের জন্য। তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে অবশ্যই এর সুফল পেতে পারে বাংলাদেশের ফুটবল।

জুয়েল রানার এই ভাবনা বাস্তবে কবে ও কিভাবে রূপ নেয়, তার জবাব দেবে ভবিষ্যতের সময়।