২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট সংগঠক ডালমিয়ার চিরপ্রস্থান

  • মোঃ নুরুজ্জামান

নাজমুল হাসান পাপন কি এতটুকু বাড়িয়ে বলেছেন? জগমোহন ডালমিয়ার মৃত্যুশোক জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রধানের মন্তব্য, ‘তিনি ছিলেন মাঠের বাইরের শচীন টেন্ডুলকর।’ এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি। যুগে যুগে কালে কালে এমন সংগঠক ক্রিকেট খুব কমই পেয়েছে। যিনি খেলাটিকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন ভারত, বাংলাদেশ তথা বিশ্বক্রিকেটরই অকৃতিম বন্ধু। রবিবার ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ডালমিয়া। বিশ্ব হারল এক মহান সংগঠককে। আধুনিক ক্রিকেটে যার অবদান লেখনিতে শেষ হওয়ার নয়। ভারত তো বটেই, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনও যুগে যুগে এমন ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খুব কমই পেয়েছে। ডালমিয়ার মৃত্যু তাই ছুঁয়ে গেছে গোটা বিশ্বকে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে তুলে আনার বিচারে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের একজন অগ্রপথিক, ভক্ত বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। যাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় দুর্বল অবকাঠামো নিয়েও টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছিল বাংলাদেশ।

শোক জানাতে গিয়ে তাই আবেগে আপ্লুত হয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক বস সাবের হোসেন চৌধুরী, বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান চৌধুরী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার, আইসিসির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল। ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটে ডালমিয়ার অবদান বলে বোঝানো যাবে না। টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তিতে সেসময় আইসিসির প্রোসিডেন্ট হিসেবে প্রত্যক্ষ অবদান তার। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট একদিন ঠিকই বিশ্ব কাঁপিয়ে দেবে। এক অর্থে, তিনি ছিলেন আমাদের অকৃতিম বন্ধু। তার স্মরণে বোর্ডের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত।’ বলেন সাবের হোসেন। শোক প্রকাশ করেছেন এক সময়ের কিংবদন্তি ফুটবলার ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। শোকসন্তপ্ত বিওএ-র মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজাসহ আরও অনেকে। বলতে গেলে গোটা বাংলাদেশই আজ শোকাতুর। স্মৃতিতে-শোকে বিহব্বল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিং থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, গ্রেট শচীন টেন্ডুলকর থেকে কলকাতার রাস্তার সাধারণ চা বিক্রেতাও।

বিসিবি বস নাজমুল হাসান বলেন, ‘ডালমিয়া চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট হারাল সত্যিকারের এক বন্ধু ও শুভাকাক্সিক্ষকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সামনে এগিয়ে নেয়ায় ডালমিয়ার সহযোগিতা আমরা সবসময় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব। বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়াও ছিল তার দূরদৃষ্টি ও আন্তরিক সহযোগিতার ফল।’ সংগঠক হিসেবে ডালমিয়ার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্ব ক্রিকেট অবশ্যই তার ক্ষুরধার নেতৃত্ব ও দূরদৃষ্টির অভাব বোধ করবে। তবে ক্রিকেট প্রশাসনে যে উজ্জ্বল ছাপ তিনি রেখে গেছেন, তা বেঁচে থাকবে সবসময়।’ বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বোর্ডের সবচেয়ে পুরনো কর্মকর্তাদের একজন। সেই সময় খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে ডালমিয়ার ভূমিকা। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরও ডালমিয়ার সহযো-গিতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র যে আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাসে ভূমিকা ছিল, তা নয়। পরবর্তীতেও উনি আমাদের বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়েছেন। কথা বলতেন। খোঁজখবর রাখতেন। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের শুভা-কাক্সিক্ষ ছিলেন।’

শেষ হয়ে গেল একটি অধ্যায়। রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় কলকাতার একটি বেসরকারী হাসপা-তালে প্রয়াত হন ৭৫ বছর বয়সী ডালমিয়া। বৃহস্পতি-বার রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। মাঝে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও শেষ পর্যন্ত জীবনের লড়াইয়ে হার মানতে হয় ভারতীয় ক্রিকেটের এই অজেয় সংগঠককে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অনিল মিশ্রর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। তাদের সুপারিশে প্রথমে এনজিওগ্রাম, পরে এনজিওগ্রাফি করা হয়। বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে যকৃতে দুটি অস্ত্রোপচার। ডাক্তার জানিয়েছিলেন গত কয়েকদিন ধরেই বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন ডালমিয়া। ভুগছিলেন হাইপার টেনশনে। মাঝে-মাঝে শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল। ডাক্তার-স্টাফদের সকল প্রচেষ্ট ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে চলে যান ‘মাস্টার অব রিয়ের পলিটিক’ ও ‘মাস্টার অব কামব্যাকস খ্যাত’ ভারতীয় ক্রিকেটের তুখোড় এই সংগঠক।

খবর পেয়ে রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। ক্রিকেট কলকাতার কোষাধক্ষ্য বিশ্বরূপ দে, যুগ্মসচিব সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেকে। ‘আমরা সবাই মর্মাহত। ডালমিয়া ক্রিকেটকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতেন। শুনেছিলাম একটু ভাল আছেন। কিন্তু রাজার মতো রাজমুকুট মাথায় নিয়ে চলে গেলেন। আমরা সবাই মিলে ওনার বাকি কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করব।’ ভারতীয় গ্রেট শচীন টেন্ডুলকর ডালমিয়াকে স্মরণ করে বলেন, ‘জুনেই দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না ওটাই শেষ দেখা হবে। প্রশাসক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ, ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করে গেছেন।’ আরেক সাবেক বিষেন সিং বেদী বলেন, ‘ভারতীয় ইতিহাসের সেরা প্রশাসক ছিলেন, ক্রিকেটের প্রতি তার ভালবাসার তুলনা হয় না।’ ভিভিএস লক্ষণের মতে, ভারতীয় ক্রিকেট, এমন কি বিশ্ব ক্রিকেটকেই নতুন পথ দেখিয়েছেন ডালমিয়া। বলিউড বাদশাহ শাহুরুখ খান বলেন, ‘খবরটা শোনার পর খুবই খারাপ লাগছে। তাঁকে খুব মিস করব। এটা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা।’

অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ডালমিয়ার জন্ম কলকাতার এক মারোয়ারি পরিবারে। উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্লাব ক্রিকেটে খেলেছেন স্থানীয় স্কটিশ চার্চ কলেজের হয়ে। রয়েছে ডাবল সেঞ্চুরি। ষাটের দশকে খেলা ছেড়ে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন।

অতঃপর এক দশকের মধ্যে ক্রিকেটে প্রশাসক হিসেবে হাতেখড়ি। ১৯৭৯ সালে ভারতীয় বোর্ডে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে হন কোষাধক্ষ্য। ডালমিয়ার চেষ্টাতেই ১৯৮৭ ও ১৯৯৬ সালে উপমহেমেশে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ক্রিকেট।

১৯৯৬Ñএ ব্যর্থ হলেও ১৯৯৭ সালে সর্বসম্মতিক্রমে বিশ্বক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির প্রেসিডেন্ট হন ডালমিয়া। ২০০৪Ñ২০০৭ পর্যন্ত একাধিক রাজনীতির মারপ্যাচে পড়লেও ২০০৮Ñএ ফের সিএবির প্রেসিডেন্ট দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন। ২০১৩ সালে আইপিএলে স্পটফিক্সিংয়ের দায়ে এন শ্রীনিবাসন সরে দাঁড়ালে পুনরায় বোর্ডের (বিসিসিআই) অন্তর্বর্তী প্রধানের দায়িত্ব পান। এ বছরই (২০১৫) প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি।