১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সামরিক শক্তির প্রসার ঘটাচ্ছে চীন

  • এনামুল হক

গত ৩ সেপ্টেম্বর বেজিংয়ে মহাসাড়ম্বরে উদযাপিত হলো জাপানের বিরুদ্ধে চীনের প্রতিরোধ যুদ্ধে বিজয়ের ৭০তম বার্ষিকী। এ উপলক্ষে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ। এমন কুচকওয়াজ বরাবরই ১ অক্টোবরের প্রতিষ্ঠাার্ষিকীতে হয়ে এসেছে। এবার সেই ঐতিহ্য ভেঙ্গে দেয়া হলো। এবারের বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজ, ট্যাঙ্কের চাকার ঘর্ঘর আওয়াজ এবং আকাশের বুক চিড়ে জঙ্গী বিমানের সগর্জনে ছুটে চলার মধ্য দিয়ে এই বার্তাই সবার কাছে পৌঁছে দেয়া হলো যে, এককালের সেই পদানত, হতদরিদ্র ও অনুন্নত চীন আজ রূপান্তরিত হয়ে গেছে বিশ্বমানের এক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে।

চীন আজ বিশ্বের সর্ববৃহৎ সশস্ত্রবাহিনীর অধিকারী। এর সদস্য সংখ্যা ২৯ লাখ ৯০ হাজার। এরপর ভারতের স্থান। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীতে আছে প্রায় ২৭ লাখ লোক। তারপর যুক্তরাষ্ট্র। সশস্ত্রবাহিনীর মোট সদস্য ১৪ লাখ। চতুর্থ স্থানে আছে উত্তর কোরিয়া ১৩ লাখ। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয়ও সেইভাবে বেড়েছে। চীন আজ প্রতিরক্ষা খাতে সর্বাধিক অর্থ বরাদ্দকারী দেশ। ২০০০ সালে এর প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৭শ’ কোটি ডলার। সেটাই ক্রমশ বাড়তে বাড়তে আজ ২০১৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৬শ’ কোটি ডলার। এত বিশাল অঙ্কের সামরিক ব্যয় ও বিশাল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে চীন গড়ে তুলেছে এমন এক সামরিক শক্তি, যা যে কোন দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চীনের প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক জি জিনপিংয়ের মতো শক্তিমান নেতা গত কয়েক দশকের মধ্যে চীনের দৃশ্যপটে আর আসেননি। চীনের জনগণকে তিনি ‘চায়না ড্রিম’ বা চীনের স্বপ্ন দেখান। সেই স্বপ্নের অন্তর্নির্হিত অর্থ যা-ই থাক, সেই স্বপ্নের সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর আশা-আকাক্সক্ষার সংঘাত দেখা দিচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দক্ষিণ চীন সাগরে বিভিন্ন ছোট ছোট প্রবাল দ্বীপের ওপর মালিকনা ৬টি সরকারের। এ অবস্থায় চীন এই বিরোধীয় জলরাশিতে দ্বীপ গঠনের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। মাটি ফেলে ফেলে সেই ক্ষুদে দ্বীপগুলোকে এমন ভূখ-ে পরিণত করছে, সেখানে চীনের জঙ্গী বিমান সহজেই ওঠানামা করতে পারবে। এতে করে দক্ষিণ চীন সাগর ও তার আশপাশের এলাকার রাজনৈতিক আবহাওয়া যথেষ্ট উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

এমন পটভূমিতে চীনের এই সামরিক কুচকাওয়াজ যথেষ্ট তাৎপর্যবহ। শোকেসে যে ৫শ’টি সামরিক সরঞ্জাম দেখানো হয়েছে, তাতে পাশ্চাত্যের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার কথা নয়। এসব সরঞ্জামের বেশির ভাগ আগে কখনও দেখা যায়নি। কুচকাওয়াজের ঠিক আগে চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ প্রথমবারের মতো আলাস্কার কাছাকাছি গিয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা ঐ রাজ্য সফরে ছিলেন। চীনা জাহাজের সেখানে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চীন তার ক্ষমতার প্রতীকী প্রদর্শন করেছে। প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে শান্তি বিরাজ করলেও মনে রাখতে হবে যে, জাপানের শাসন ক্ষমতায় এখন রয়েছে একজন যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী। অপরদিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এই মহাসাগরে বিচরণ করে, যার পিছনে সমর্থন রয়েছে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতমান ও ফিলিপিন্সের। এ অবস্থায় চীন নিজের সামরিক বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিকে গুরুত্ব না দিয়ে পারে না।

৩ সেপ্টেম্বর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে প্রেসিডেন্ট জিন জিনপিং ঘোষণা করেছেন যে, চীনের জনগণ শান্তিকামী। তিনি ‘শান্তি’ শব্দটা ১৭ বার ব্যবহার করেছেন। শান্তির সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে ৭০ হাজার কপোত মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৩ লাখ কমানোর ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি আবার দেখা যাচ্ছে যে, চীন আপোস ও সমঝোতার নীতিতে আগ্রহী নয়। বরং চীন আগ্রাসিভাবে তার ভূখ- প্রসারিত করে চলেছে।

করার কারণও আছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যে চীন এখনও তার ১৩০ কোটি মানুষের সবাইকে খাওয়াতে সক্ষম। মানব জাতির এক-পঞ্চমাংশের মুখে অন্ন জোগানো এক দারুণ কৃতিত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশেষ করে যে দেশটিতে আবাদী ভূমির অভাব রয়েছে। কাজেই এটা অস্বাভাবিক নয় যে, চীন তার ভূখ- বিস্তারের দিকে মনোযোগ দেবে।

কুচকাওয়াজে ১২ হাজার সৈন্য, ২শ’ জঙ্গী বিমান ও ২শ’ ট্যাংক অংশগ্রহণ করে। গত ২৫ বছরে চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ডাবল ডিজিট বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের আজ রয়েছে জে-১৫ জঙ্গী, জেট বিমান, জেড-১৯ এ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ট্রাক মাউন্টেড ডিএফ-৪১ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর সর্বশেষ নির্মিত জঙ্গী জেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত হয়, যার মধ্যে দিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি ও উচ্চাভিলাষ প্রতিফলিত হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো দেখানো হয়েছে মাঝারি পাল্লার ডিএফ-২১ ডি জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘ক্যারিয়ার কিলার’ বলে থাকে। কারণ সামনে এগিয়ে আসা মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে টার্গেট করেই এগুলো সুনির্দিষ্ট ডিজাইনে বানানো। আর ডিএফ-২৬ ক্ষেপণাস্ত্র ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো মূল ভূখ- থেকে প্রচলিত বোমা নিয়ে লঞ্চারযোগে উৎক্ষিপ্ত হয়ে গুয়েতেনামো মার্কিন নৌঘাঁটিতে আঘাত হানার সামর্থ রাখে।

চীনের সশস্ত্র বাহিনীতে ট্যাঙ্কের সংখ্যা ৯১৫০। জঙ্গী, বোমারু, পরিবহন বিমানসহ মোট বিমান ৩ হাজারের কাছাকাছি। এ ছাড়া আছে ৯০৮টি হেলিকপ্টার ও ১৯৬টি এ্যাটাক হেলিকপ্টার। নৌবাহিনীর মোট জাহাজ আছে ৬৭৩টি। বিমানবাহী রণতরী ১টি, ফ্রিগেট ৪৭টি, ডেস্ট্রয়ার ২৫টি, সাবমেরিন ৬৭টি। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুুক্তিতে চীনের যেরূপ বিকাশ ঘটেছে, তাতে আমেরিকান সামরিক শক্তির প্রধান প্রধান সকল ভিত্তিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে একজন প্রাক্তন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন।

এই কর্মকর্তা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের পর থেকে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর নির্ভর করছে যথা উন্নততর স্ট্র্যাটেজিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার সামর্থ, বিশ্বময় নিজের শক্তি ও সামর্থকে পৌঁছে দেয়ার ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিক দিয়ে ব্যাপক প্রাধান্য। চীন এখন এই তিনটি ভিত্তির প্রতিই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত চীন ইতোমধ্যে স্বল্প উচ্চতায় পৃথিবীর কক্ষ প্রদক্ষিণরত স্যাটেলাইটকে নিজের স্যাটেলাইট বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করার ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন সেই ক্ষমতার আরও বিকাশ ঘটেছে, যার ফলে দেশটি এখন মহাকাশে আমেরিকার সকল সম্পদ টার্গেট করতে পারে। দ্বিতীয়ত আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী বহর। আক্রমণোদ্যত শত্রুকে প্রতিহত করা এবং দরকার হলে সেই শত্রুর ভূখ-ে আঘাত হানার সামর্থ্য এদের আছে। কিন্তু ডিএফ-২১ ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করে চীন এসব রণপোত বহরকে ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র অতি উন্নত প্রযুক্তির পরিচায়ক এবং মার্কিন নৌবহরের জন্য তা এক বিশাল হুমকি স্বরূপ।

তৃতীয়ত চীন আমেরিকার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে দ্রুত ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গত বছরের জুন মাসে চীনের ডব্লিউইউ-১৪ হাইপারসোনিক যানের সফল পরীক্ষা তারই প্রমাণ। এটি শব্দের গতির ১০ গুণ বেশি গতিতে চলতে পারে। যে কোন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এটা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এইভাবে চীনের সামরিক শক্তি ও সামর্থ বৃদ্ধি ভবিষ্যতে অনেক বিশ্বশক্তির জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সূত্র : টাইম ও অন্যান্য।