২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইয়েমেন যুদ্ধে পুরো ফায়দা লুটছে আল কায়েদা

  • মুসান্না সাজ্জিল

ইয়েমেনে চলছে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের স্থল ও বিমান হামলার ধ্বংযজ্ঞ। এর পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ছায়ার আড়ালে এই দেশটির মাটিতে বেড়ে উঠছে আল কায়েদা ও আইএসের মতো র‌্যাডিকেল শক্তিগুলো। তারা নিজেদের অস্ত্রে শাণ দিচ্ছে, শক্তিবৃদ্ধি করে চলেছে। মোক্ষম সময়ে চরম আঘাত হানার অপেক্ষায় থাকছে।

ইয়েমেনে আজ চলছে ক্ষমতা দখলের রক্তারক্তি লড়াই। এ লড়াইয়ে প্রধান দুটি পক্ষ। একদিকে রাজধানী সানার ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির অনুগত বাহিনী। অন্যদিকে ইরান সমর্থিত হুথি নামক জায়েদি শিয়া বিদ্রোহী বাহিনী, যারা সরকার নিয়ন্ত্রণ দখলে নিয়েছে। এই হুথিদের বিরুদ্ধে এবং প্রেসিডেন্ট হাদির পক্ষ নিয়ে সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত ও বাহরাইনী সৈন্যরা নেমে পড়েছে। তারা স্থল ও বিমান হামলা চালাচ্ছে। বিভিন্ন শহরে এই দু’পক্ষের মধ্যে লড়াই চলছে। এলাকার নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হচ্ছে।

ইয়েমেনের এই রক্তারক্তি অবস্থার সুযোগ নিয়ে আল কায়েদা ও আইএসের মতো হিংস্র্র শক্তিগুলো জোরে সোরে ফিরে এসেছে বাইবেলে বর্ণিত রানী সেবার এই রাজ্যে। হাতে তাদের উদ্যত অস্ত্র ও বোমা। তাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে বিষিয়ে উঠেছে বাতাস।

ওয়াহাবী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এই উগ্রপন্থীদের ইয়েমেনে উপস্থিতি অবশ্য আজকের নয়। একদশক আগে আল কায়েদা আজকের এই দক্ষিণাঞ্চলে পদার্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে একটু একটু করে সৌদি আরবের দিকে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রই শুধু তৈরি হয়নি, উপরন্তু এই র‌্যাডিকেল শক্তি ইয়েমেনে হুথি প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সৌদি সামরিক স্ট্যাটেজিরও অংশীদার হয়ে পড়েছে। শত্রুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য সৌদি আরব এই র‌্যাডিকেল গ্রুপগুলোকে কাজে লাগাবে কিংবা তাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত হবে। এমন বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ উদ্ভট মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, সৌদি আরব প্রকৃতপক্ষে সেই খেলাই খেলছে এবং তা বেশ কিছুকাল ধরে চলছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার র‌্যাডিকেল পদচিহ্নের ক্রমপ্রসারে সৌদি আরবের যে সাহায্য সহযোগিতা আছে, ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি সেটাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

এরপরও কারও মনে এ নিয়ে সংশয় সন্দেহ থেকে থাকলে তারা লক্ষ্য করতে পারেন যে, ইয়েমেন দ্রুত এক নতুন সিরিয়ায় পরিণত হতে চলেছেÑ অন্তত ওয়াহাবী অনুপ্রাণিত র‌্যাডিকেল ভাবধারার বিস্তারের দিক দিয়ে। তবে এ মুহূর্তে ইয়েমেনে আল কায়েদার বা আইএসের তৎপরতা অত মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। ২০০৯-১০ সালে আল কায়েদার তৎপরতার বিরুদ্ধে তৎকালীন ইয়েমেন সরকার দমননীতির আশ্রয় নিয়েছিল। সরকারী বাহিনীর অভিযানে বেশকিছু আল কায়েদার সদস্য নিহত হয়েছিল এবং ধরা পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে কিছুদিন নিষ্ক্রিয় ও নিশ্চুপ থাকার পর আল কায়েদা শক্তি বৃদ্ধি করে আবার নতুন করে আঘাত হানতে থাকে। আর আজকের পরিস্থিতিতে সৌদি, আমিরাতী, বাহরাইনী, কাতারী সৈন্য ও তাদের সমর্থনপুষ্ট স্থানীয় মিলিশিয়া এবং আল কায়েদা সবাই একত্রে ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের কবল থেকে ইয়েমেনের অধিকাংশ এলাকা মুক্ত করার জন্য লড়ছে। ফলে এই সংঘাতে গড়ে উঠছে এক জটিল ও বিপজ্জনক জোট। আল কায়েদা এই গোলমেলে বা বিশৃঙ্খল অবস্থার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে ইয়েমেনে তার শক্তি ও প্রভাবের প্রসার ঘটাচ্ছে। তবে আল কায়েদা জঙ্গীরা সৌদি সমর্থনপুষ্ট স্থানীয় মিলিশিয়াদের সঙ্গে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে লড়ছে নাকি আলাদাভাবে লড়ছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এটা ঠিক যে, অনেক লড়াইয়ে স্থানীয় মিলিশিয়ারা আল কায়েদার সাহায্য পেয়েছে। ২০১১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র আল কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইয়েমেনের নিরাপত্তা বাহিনীকে সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত করার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু আল কায়েদা নির্মূলে তাদের এই পরিকল্পনা কার্যত ভেস্তে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তারাই এখন স্বীকার করেন যে, ইয়েমেনের এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে আল কায়েদা।

ইরান সমর্থিত হুথিয়াও বার বার অভিযোগ করছে যে, সুন্নি সৌদি আরব আল কায়েদার জঙ্গীদের সঙ্গে একত্রে কাজ করছে। এ ব্যাপারে সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা নাকি বলেছেন, আল কায়েদা তো আসলে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এ অঞ্চলে নিযুক্ত পাশ্চাত্যের এক কূটনীতিক স্বীকার করেছেন যে, সৌদি সমর্থিত মিলিশিয়ারা আল কায়েদা জঙ্গীদের কাছ থেকে সাহায্য সমর্থন নিচ্ছে। অনেক এলাকাতেই স্থানীয় মিলিশিয়া ও উপজাতিরা হুথিদের মোকাবেলায় আল কায়েদার মুখাপেক্ষী হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে আল কায়েদার শক্তি ও প্রভাব প্রতিপত্তি রেড়ে চলেছে।

বস্তুতপক্ষে আল কায়েদার জঙ্গীরা বন্দরনগরী এডেনের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিয়েছে। তারা এডেনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ক্রেটারের অংশবিশেষ এবং দারসাদ শহরের কিছু এলাকাও দখলে নিয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ওয়াশিংটন আল কায়েদার ইয়েমেন শাখাটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বলে মনে করে।