২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘুরে এলাম বিপ্লবী বাঘা যতীনের আত্মবলিদান ভূমি (শেষ পর্ব)

লিটন আব্বাস

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫

প্রেসক্লাব, কলকাতা

১০ সেপ্টেম্বর প্রোগ্রাম সিডিউলে বিকাল চারটায় কলকাতা প্রেসক্লাবে প্রেস কনফারেন্স। তার আগে সকাল সাড়ে নটায় আমরা হোটেল থেকে নাস্তা সেরে তৈরী হয়ে জিপে চেপে প্রথমে গেলাম বিপ্লবী বিপিনি চন্দ্র লাহেড়ি রোড পার হয়ে রবীণ্দ্র সরণীতে ঘেষে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। যেটা এখন বিশ্বভারতী অর্থাৎ রবীণ্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ঘন্টাখানিকের বেশি সময় সেখানে কাটিয়ে বিচিত্রা ভবন, রথীন্দ্রনাথ মঞ্চ, অন্দর মহল, বিভিন্ন সংগ্রহশালা প্রদর্শন করে ফটোশ্যুট না বাদ দিয়ে আবার ছুটে চললাম বিখ্যাত ঐতিহাসিক গিরীশ চন্দ্র এন্ড দে এন্ড নকুর চন্দ্র নন্দী মিস্টির দোকানে।

২০১১ সালে কেকেআরের কেক বানানো হয় এ দোকান থেকে। মিস্টির দোকানটি ১৮৪৪ সালে স্থাপিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলোতে এই মিস্টির সুখ্যাতির কথা উলে¬খ আছে। এখান থেকে আমরা মিস্টি নিয়ে গাড়িতে চেপেই চকলেট, পারিজাত আর কি-কি যেনো খেতে খেতে ছুটে চললাম ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার বিপ্লবী অরবিন্দ ভবনে। যেখান থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমাদের জাতীয় চার নেতারা যুদ্ধ পরিচালনা ও পরিকল্পনা করতেন। সেখানে সবাই ছবি তুললো। অনেকক্ষণণ সেখানে থাকবার পরে এবার গেলাম ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম ১৮১৪ সালে। এটা ভারতবর্ষের সবথেকে বড়ো মিউজিয়াম। এখানে দেখবার বিয়ষ ফসিল ও মমি। দেড় লাখ বছরের ফসিল এবং চারশো বছরের মমি। সবাই দেখলো ঘন্টা খানিকের মতো। এর মারকুয়েস স্ট্রিটে ঢাকাইয়্যা হোটেল কস্তুরী তে অপেক্ষা করছেন লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও কাজী মুকুল। আমরা সেখানে যেয়ে হাত ধুয়ে দোতলায় খেতে বসলাম। বিশাল সাইজ পাবদা মাছ সন্দেহপ্রবণ মন নিয়ে খেলাম। কেউ বলে বোয়ালের বাচ্চা। এ নিয়ে হাসাহাসি আমি তো গত দুদিন শুধু ডাল আর বাসুমতি ভাতে ব্রাত্য ছিলাম। কলার মোচা ভরতা, সবজি, লাল চিংড়ি, করলা, শাক ভাজি সবাই পরম তৃপ্তির সাথে উদরপূর্তি সারলো। তারপর ছুটে চলা পুরো কলাকাতার পরিচয় যেটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পার্ক। কলকাতা এলে এটা না দেখলে কলকাতার চরিত্র বোঝা যাবেনা বা পরিচয় পাওয়া যাবেনা। সব এলাকার একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে যেটা তাদের মূল মার্গ। এটাও ঠিক তাই। যেখানে তাজ মহলের অবিকল প্রতিকৃতি দাঁড়িয়ে। সেখানে যখন আমরা যাই সাড়ে তিনটার মত বাজে। আবার কলকাতা প্রেসক্লাবে ফিরতে হবে চারটার মধ্যে। যে কারণে ভিতরে আর এবার যাওয়া হলোনা একটু বাদেই রোনাল্ড রস রোডের পাশে দাঁড়িয়ে অগ্নিযুগের মহানায়ক বিপ্রবী বাঘা যতীন এর একমাত্র প্রতিকৃতি। সেখানে যথারীতি সবাই ছবি উঠালো। কয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়ার মানুষেরা এমন আবেগপ্রবণ হয়ে গেলো যে বাঘা যতীনের প্রতিকৃতি দেখে আবেগে আত্মহারা পাগলপ্রায়। তাড়া ছিল চারটায় অনুষ্ঠানে যেতে হবে। কলকাতা শহরে অবশ্য জ্যাম খুব একটা নেই বলে চিন্তা খুব একটা ছিলনা আমাদের কারো মাঝে। রাস্তায় দাঁড়ানো সুদর্শন ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কখন কে চড়বে বলে। আমরা প্রচন্ড দুর্গন্ধের মধ্যে নাকচেপে কিছুক্ষণ হেঁটে আসি সেসময় কাকফাটা গরমের মধ্যে এক পশলা বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে মাত্র। আমরা হাঁটা দৌঁড় গাড়িতে চেপে এবার কলকাতা প্রেসক্লাবে যেতে যেতে ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ড পেলাম। কলকাতা শহরের গ্রীনল্যান্ড দেখলাম।

এসে গেলাম প্রেসক্লাব কলকাতায়। ওদের সময় জ্ঞান এতো অটুট যা না দেখলে বোঝা যাবেনা। ঠিক চারটায় শুরু হলো কনফারেন্স। বাঘা যতীন মৃত্যু শতবার্ষিকীর আলোচনা অনুষ্ঠান। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, বাংলাদেশ ও কমিটি ফর আপহোল্ডিং সেকুলারিজম, ভারত এর যৌথ উদ্যোগে বিপ্লবী বাঘা যতীন মৃত্যু শত বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠান শুরু হলো অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর নাসরীন এর বাঙময় সঞ্চালনার মধ্য দিয়ে। সভাপতিত্ব করলেন বিশিষ্ট লেখক গীতেশ শর্মা তিনি। স্বাগত বক্তব্য দিয়ে মাইক ছেড়ে দেন, ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মইনুল কবির শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন। বক্তব্য দিলেন সপ্তাহ পত্রিকার সস্পাদক দিলীপ চক্রবর্ত্তী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, উত্তর প্রদেশের ত্রিপুরার রাজমাতা বিভূ রাণী দেবী। প্রধান অতিথি ছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সভাপতি লেখক, সাংবদিক শাহরিযার কবির। তিনি যথারীতি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিলেন। এরপর সভাপতি লেখক গীতেশ শর্মা প্রজ্ঞা লাবণ্য ছড়িয়ে বক্তৃতা দিলেন। অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ গূঢ়কথা গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে নানা প্রশ্নোত্তর চললো। কলকাতার সাংবাদিকদের দেখে বোঝা যাবেনা তাদের জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা কত গভীর। তাদের প্রশ্নের ধরন, কখন, বলন অন্যরকম। শাহরিয়ার কবির যথারীতি তাদের উত্তর দিলেন। ঠিক ছটায় শেষ আলোচনা।

দেরী না করবার জন্য মজনু চাচাকে বললেন কাল তো যাওয়া এখনই নিউমার্কেট গিয়ে যারা কেনাকাটা করবে চলে যান। ব্যস মেয়েরা তো আগে থেকেই প্রস্তুত। বায়না ধরে বসে আছে চারদিন। কতজনের কত রকম স্বপ্ন। শাড়ি, শাল, চাদর। মজুন চাচা তো বলে, তোমরা এসেছো অনুষ্ঠানে-কেনাকাটার জন্য নয়। সেই ত্রি ছুটে গেলেন নিউ মার্কেটে। শুধু আমি আর রাশেদ থেকে গেলাম আমার ব্যাগে থাকা গত কয়েকদিন ধরে টানা বেনেবউ গল্পের বই ত্রিপুরার রাজমাতাকে একখানা দিলাম। আরেকখানা অধাপক সৈয়দ তানভীর নাসরীনকে। ব্যস হক আকেল এসে রেগে আগুন। অবশ্য তিনি এসবের স্বাক্ষী হিসাবে আমাদের ছবি তুলে রাখলেন। আমরা তিনজন কলকাতা প্রেসক্লাব পার হয়ে রাস্তায় এসে দেখি কেউ নেই। সবাই নিউমার্কেট ঢুকে গেছে-আমরাও গেলাম। রাস্তা ধরে। কখনো মার্কেটের ভিতরে। রাস্তা থেকে বিশাল সাইজের দুটো ব্যাগ কিনলেন রাশেদ আর আব্দুল হক সাহেব। আমিও একটা ছোটমোটো কিনলাম। বিগবাজার থেকে অনেকেই কিছুকিছু কেনাকাটা করেছিল আমি শুধু চকলেট। সঙ্গীদের না পাওয়ায় হক সাহেব রেগে আগুন। আমরা ফিরে আসি দুজন যেখানে গাড়ি রাখা কলকাতার প্রেসক্লাবের সামনে। প্রেসক্লাবের সামনে কলকাতা রেফারিজ এসোসিয়েশনের স্টোরে বসে চা খেতে শুরু করি। কলকাতার চা এতো গরম যে অন্তর্ময়ী জ্বালাও হার মানিয়ে দেয়। প্রথম যেদিন বর্ডার ক্রস করি সেখানে চা খেয়ে জিভ পুড়িয়ে ফ্রাই করে রেখেছি। সাহস হয়না তবু খাওয়া। হক আংকেলের মেজাজ ভর্তি ক্রোধের আগুন ফুঁসছে কিছু কিনতে না পারায়। কলকাতা রেফারিজ এসোসিয়েসনের এই পুরোনো টিনসেডের দোকানে চা, পুড়ি সব পাওয়া যায়। চাস্টলের পাশ ঘেষে লেকের মতো কিছুদূর চলে গেছে সবুজ বৃক্ষের সাথে পাল্রা দিয়ে পানিপুকুর। অপেক্ষা যতই বাড়ছে আমাদের ক্ষোভ ততই ফুটছে ফোন করা হলে নিউমার্কেটে বাজার করা পার্টি বলে, এইতো ৫ মিনিট-সেই ৫ মিনিট খতম হলো দেড় ঘন্টাবাদে। সবার হাতে ব্যাগ ভরতি। মজনু চাচা কিছুই কিনবেনা। চাচীর জন দুটো শাড়ী, শাল চাদর, নাতনির জন জামা কিনে হাসিমুখে ফিরছে। হক আংকেলের ক্ষোভ দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। আমরা মনে কিছুটা কষ্ট নিয়ে গাড়িতে চেপে যেতে যেতে দেখলাম টিপু সুলতান মসজিদ, মানিকতলা রুম্তমজী কাওয়াজ ও মানিক পীরের নামে এ রাস্তা-দুমতের পরিচয় দিলেন আমাদের সাথে থাকা নিরেট ভদ্রলোক লেখক অর্নব নাগ। একেবারে সরল সোজা, সৎ মানুষ তিনি। চেহারায় বলে দেয় অন্তত ৫দিনে তা বোঝা গেছে তার অভিব্যক্তি দেখে। মানিকতলায় এসে মজনু চাচা রুমাল রুটি খাবেন বলে বায়না ধরেন। অর্নব নাগ তাকে সাথে নিয়ে পনের মিনিটের কথা বলে পোনে এক ঘন্টায় কাবাব বানিয়ে আসলেন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শেষবারের মত বিগবাজারে ঢুকে অন্তত কিছু কেনাকাটা করা। বিশেষ করে হক সাহেবের জন্য বেশি মন খারাপ। বিগবাজারের সামনে যখন গাড়ি এসে থামে। ক্লোজ হয় যাচেছ। আমরা দৌড়ে সেখানে যেয়ে বিদেশী বলাতেও মন গলেনা তাদের। একাউন্টস ক্লোজ হওয়ায় অনুনয় বিনয় খারিজ হয়ে গেলো। মেয়েরা দুজন কিনে ব্যাগ ভরতি করে আবার আমাদের পিছনে পিছনে বিগবাজারের দিকে দৌড়ে আসলো। কিন্তু সকলের মন বিষণ্ন করে হতাশ চিত্তে অতিথি ইনে ইন হওয়া। রুমে এসেই হক সাহেব জ্বরে হঠাৎ আক্রান্ত। ভীষণ মন খারাপ। রাত এগারটোর দিকে ডিনার সেরে রুমে এসে বিশ্রাম পরের দিন ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় জিপ এসে হাজির হবে আমদের আসতে হবে বেনাপোল বর্ডারে।

ঠিকঠাক সকাল সাতটায় আমরা তৈরী হয়ে বাসী পেটে বিটলবন ছিঠানো চা খেয়ে গাড়িতে চেপে বসি। দুটো জিপ সমানে হাঁকছে। আবার সেই বারাসাতে এসে বামনগাছির হোটেল অর্কিডে গাড়ি থেমে যায়। যথারীতি এবার লুচি সাড়ে চারটার মতো খেলাম। মজনু চাচা আবার মিষ্টির বায়না করলো। তিনি খেলেন একটা আমরাও একটা করে। আমাদের সাথে থাকা একাশি বছরের তরুন খান জালাল তিনটে বসান দিলেন। একবারে চিরসবুজ। একসময়ের হিরো। ব্যস আবার গাড়িতে চেপে বর্ডারে যখন পৌঁছাই সাড়ে দশটার মতো বাজে। বর্ডারে এসে কিছু ফল-চকলেট কিনি। হক সাহেব তিনিও কিছু কিনে প্রসন্ন চিত্তে হাস্যবদনে এগুতো থাকেন। আমরা এমিগ্রেশনে ঢুকে পড়ি। আমাদের ভিআইপি লাইনে যেতে হলো আমরা ভারতে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল হিসাবে ছাড় পেয়ে খুব দ্রুত ভারতীয় বর্ডার অতিক্রম করে বাংলাদেশের এমিগ্রেশনে সেখানেও বেশ তাড়াতাড়ি পার হলাম কাস্টমস কোন চেক করলোনা। জলদি পার হয়ে আগে থেকেই অপেক্ষা করা মাইক্রোবাসে চেপে ঝিনাইদহে এসে দুপুরের খাবার সারলাম তখন তিনটের মতো বাজে। কুষ্টিয়ায় আব্বাস উদ্দিন সুটইস এর সামনে যখন থামি বাজে সাড়ে টারচার মতো। মিষ্টির দোকান থেকে কয়েকজন মিস্টি কিনলো। সেখানে উপস্থিত থাকা সাংবাদিক দীপু মালিক ও ওহাব আমাদের শুভেচ্ছা জানান। হন্তদন্ত গতিতে মাইক্রো ছুটে চলে প্রিয় ভূমি কুমারখালীতে। আলউদ্দিনমোড়ে কয়ার ৫জন নেমে গেলো। সেখান হক সাহেব আমাদের অভ্যথনার ব্যবস্থা করালেন। ফুলের তোড়া দিয়ে আমাদের বরণ করে নিলো। তারপর আমরা পাঁচজন কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড লালন কাউন্টারের সামনে নেমে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি সফরের অভিজ্ঞতা, সম্মান বইয়ে ক্লান্ত শরীরে দ্রুত বাড়িতে যাওয়া যার-যার মতো। যথারীতি বাড়িতে প্রবেশে করার সাথে সাথে ভ্রমণ চিত্রনাট্য পরিসমাপ্তি।

কাঁটাতারের বেড়া বাদ দিলে বাকীটুকু এপার আর ওপারের মধ্যে কোন ফারাক বা ফাঁক ছিলনা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ স্বার্থে দুইবাংলার এমন মধুর মিলন-শেকড়কে সন্ধান করা এবং উত্তর প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীনতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দেয়া অনম্বীকার্য।

ইতিহাস এমনই আপন আলোয় অদ্ভুত আন্ধার। (শেষ)

লেখক ॥ কলামিস্ট, নাট্যকার।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া