১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মনের পশুরে কর জবাই... ত্যাগের মহিমায় জাগো

মনের পশুরে কর জবাই... ত্যাগের মহিমায় জাগো
  • এসেছে কোরবানির ঈদ

জনকণ্ঠ ফিচার

অন্য আলোচনা ভেস্তে গেছে। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে গরু! এখন সব গুরুত্ব গরুতে! গরু হয়ে ওঠেছে একমাত্র আলোচনা। রাজধানী শহরের গাড়ির রাস্তায় দিব্যি চড়ছে গরু। সামনে গরু, পেছনে তার মালিক। রশি হাতে পিছু নিয়েছেন। গোটা রাজধানীজুড়ে এই দৃশ্য। আর গরুর আলোচনা তো সেই কবে শুরু হয়েছিল। এখন তুঙ্গে। সব মিলিয়ে কোরবানি ঈদের প্রস্তুতিটা বেশ দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে শুধু বনের পশু কোরবানি দেয়া নয়, কোরবানির ঈদ মনের পশুত্বকে পাশবিকতাকে কোরবানি দেয়ার শিক্ষা দেয়। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত করে। আজকের বাংলাদেশে, আজকের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই তাৎপর্যটুকু উপলব্ধি করা জরুরী।

প্রেক্ষাপটটা একটু স্মরণ করা যাক। মুসলমানদের ধর্মীয় এই আচার যখন পালিত হবে, দেশে তখন বর্বরতার অসংখ্য উদাহরণ। একটির পর একটি ঘটনা ঘটেই চলেছে। দেখে আতঙ্কিত হতে হয়। মনে হয়, কেবলই কমছে মানুষ। মানুষের বড় অভাব। চেহারায় মানুষ, ভেতরে অন্য কেউ! সমাজ থেকে মানবিকতার বোধ নির্বাসিত। সুকুমার বৃত্তির চর্চা নেই। নির্মম নিষ্ঠুরভাবে মানুষের হাতে মানুষ খুন হচ্ছে। ধর্ষিত হচ্ছে। শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না।

সিলেটের উদাহরণটি টানা যেতে পারে। এই কিছুদিন আগে সেখানে, আহা, কী নির্দয়ভাবে পিটিয়ে মারা হলো রাজন নামের কিশোরটিকে। হাসতে হাসতে মেরে ফেলা হলো। ভিডিওটি সারাদেশের মানুষ দেখেছে। ভিডিওতে পরিষ্কার, যারা মেরেছেন, তারা মানুষের চেহারার। আদতে কি মানুষ? না, এরা হিংস্র হায়েনা। সমাজের বাস্তবতা এমন যে, এখানে মা গলা টিপে সন্তানকে মেরে ফেলছে। গত ২৭ জুলাই সাভারে মাত্র ২৫ দিনের শিশু সন্তানকে ৭ তলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় এক পাষ- পিতা। শিশুর মা ছিলো বাকপ্রতিবন্ধী। শিশুটিও প্রতিবন্ধী হবেÑ এমন আশঙ্কা থেকেই নির্মম হত্যাকা-। ঢাকার মতো আধুনিক শহরে এমনকি জাতীয় দলের ক্রিকেটারটি তার বাসার কাজের মেয়েটিকে মেরে মুখ কিকৃত করে দিল! আরও কত কত পশুর আচরণ! বাংলাদেশ শিশু ফোরামের এক জরিপ তো বলছে, গত দেড় বছরে প্রায় সাড়ে ৫০০ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একইভাবে হায়েনার চরিত্র নিয়ে পুরুষটি ঝাঁপিয়ে পড়ছে দুর্বল নারীর ওপর নির্যাতন করছে। গণধর্ষণ শেষে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে। নারীর গলিত দেহ উদ্ধার করা হচ্ছে এঁদো ডোবা থেকে। গত বছরের ২৯ নবেম্বর রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে সোলমাইদ উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ফারজানা আক্তার লিজার বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার আগের দিন দোকানে ছবি আঁকার রঙ-পেন্সিল কিনতে গিয়ে আর ফিরেনি লিজা। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ধর্ষণের পর নির্মম নির্যাতনে হত্যা করা হয়েছে ৯ বছরের লিজাকে! সর্বশেষ গত কয়েকদিন আগে টাঙ্গাইলে সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষণ করেছে একদল মানুষের চেহারার মানুষ। এখন ধর্মের নামে যখন তখন চাপাতির কোপ। ঘাড় থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে মাথা। এখন সহপাঠী বন্ধুরা সামান্য কথাকাটাকাটির জেরে খুন করে হাত ধুয়ে ফেলছে। এভাবে মানুষ হয়ে ওঠছে পশু।

বাকি দুনিয়ার চিত্র আরও ভয়ঙ্কর। মানুষেরই কারণে আজ দেশে দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ। সাধারণ মানুষ বুলেট বিদ্ধ হয়ে মরছে। ঘরবাড়ি হারা হয়ে দ্বিগি¦দিক ছুটছে। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ের বড় অভাব। এত বড় পৃথিবীতে তাই আইলানের জায়গা হয় না। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত পরিবারের সঙ্গে ইউরোপ অভিমুখে পাড়ি জমিয়েছিল অবোধ শিশু। নৌকায় করে সাগর পাড়ি দেয়ার সময় গ্রিস ও তুরস্কের মাঝামাঝি সাগরে ডুবে মরে সে। লাল টি-শার্ট আর নীল প্যান্ট পরা দেবশিশুর মাটি ছুঁয়ে থাকা মুখ বলেছে, পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা কমছে। এ অবস্থায় আবারও এসেছে কোরবানির ঈদ। সারাদেশেই বসেছে পশুর হাট। চলছে গরু, খাশি, মহিষ উট কেনা। শুক্রবার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এসব পশু কোরবানি দেয়া হবে। এই কোরবানির নানা তাৎপর্য আছে। তবে মূলত বলাÑ পশু কোরবানির আগেই ভেতরের পশুত্বতে চিহ্নিত কর। মনের পশুকে কোরবানি দাও। রুখো। মানুষকে মানুষের স্বরূপে ফেরার তাগিদ দেয় কোরবানি। মানুষের পৃথিবী গড়ার কথা বলে। তা না হলে এতো এতো পশু কোরবানি, প্রাণ দান, বৃথা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম তাই বরেছেনÑ মনের পশুরে কর জবাই,/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই...।