২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উচ্চ আদালতে জালিয়াতি জড়িতরা পার পাচ্ছেন আইনী জটিলতায়

  • বছরের পর বছর কেটে যায় বিচারিক আদালতে

আরাফাত মুন্না ॥ উচ্চ আদালতে বেড়েই চলছে জালিয়াতির ঘটনা। আইনী জটিলতায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারাকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে জালিয়াতি রোধে এসব জালিয়াতকারীদের শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে জামিন নেয়া, রায়ের কপি পরিবর্তন করে আপীল করাসহ নানা ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে হাইকোর্ট থেকে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। এর পরেও কিছু আইনী জটিলতা থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে জালিয়াতকারীরা।

গত এক মাসে উচ্চ আদালতে জালিয়াতি সংক্রান্ত অন্তত ৫ ঘটনা ধরা পড়েছে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয় বলেও সূত্র জানায়।

উচ্চ আদালতে জালিয়াতির তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, আইনী জটিলতায় জালিয়াতকারীরা পার পেয়ে যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের কাছে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পর ওই ঘটনা সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসনের একজন বিচারককে দিয়ে তদন্ত করানো হয়। এরপর তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে মামলা হয়। বিচারিক আদালতে ওই মামলার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর কেটে যায়। তাও বিচারে দোষী সাব্যস্ত হবে কিনা সেটাও সন্দিহান। এ ধরনের ঘটনার বিচার উচ্চ আদালত থেকেই শেষ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নইলে জালিয়াতকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবেন। এ ধরনের ঘটনায় সাজা কম হওয়ায় তারা সহজেই বিচারিক আদালত থেকেও জামিন পেয়ে যান।

জালিয়াতির ঘটনা প্রশ্রয় না দেয়ার কথা বলেন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল হাইও। তিনি বলেন, ‘এটা যে কোন উপায়ে বন্ধ করতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ আইনী জটিলতায় জড়িতদের শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করা যাচ্ছে না- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আইন তো মেনে চলতে হবে। তদন্ত ও বিচার ছাড়া তো কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না।’ এদিকে উচ্চ আদালতে জালিয়াতির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রীমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (বিচার ও প্রশাসন) মোঃ সাব্বির ফয়েজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার দুই মামলায় (২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মামলা নং-১১ এবং জি আর মামলা নং ২৯৬/১৩) কাগজপত্রের জাল সার্টিফাইড কপি দাখিল করে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর হাইকোর্ট থেকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তী জামিন নেন আসামি মোশাররফ হোসেন ও সোহেল হাওলাদার। একই বছরের ২৬ নবেম্বর একই এফআইআরভুক্ত ওই দু’জনসহ অন্য আসামিদের জন্য জামিন চেয়ে আরেকটি আবেদন দায়ের করেন আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ। জামিন শুনানির সময় তিনি উল্লেখ করেন, একই বেঞ্চ থেকে ইতিপূর্বে এফআইআরভুক্ত অপর আসামি মোশাররফ ও সোহেল হাওলাদার জামিন লাভ করেছেন।

আদালত সন্দিহান হয়ে আগে দেয়া জামিন আদেশের নথি তলব করেন। দুটি এফআইআর’র সই মহুরির নকলের মধ্যে পার্থক্য দেখে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর দেয়া জামিন আদেশ বাতিল করেন। পাশাপাশি আসামি মোশাররফ ও সোহেলকে আটকের জন্য কুমিল্লার পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জাল সার্টিফাইড কপি তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই ঘটনার তদন্তে গত ১১ ফেব্রুয়ারি সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। তদন্ত শেষে জাল সার্টিফিকেট সৃজনকারী সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী মোঃ ফরহাদ হোসেন, এ্যাডভোকেট মোঃ খলিলুর রহমান ও তাদের সহকারী হুমায়ুন আহমেদকে অভিযুক্ত করে গত ১ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমতি নিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার সোহাগরঞ্জন পাল ঘটনার আড়াই বছর পর গত ২৪ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।

সাম্প্রতিক ঘটনা ॥ জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দু’জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি একেএম আবদুল হাকিম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়। যাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা হলেন-মামলার তদবিরকারক জাহাঙ্গীর আলম ও ফটোস্ট্যাট মেশিনের দোকানের কর্মচারী ফরহাদ হোসেন।