২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, থামবে না ঈদেও

  • নদী শাসনের জন্য পাঁচ লাখ ব্লক তৈরি হবে অক্টোবরের মধ্যে

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মাওয়া থেকে ফিরে ॥ পদ্মা সেতুর মহাযজ্ঞ চলছে দ্রুতগতিতে। অবিরাম বৃষ্টিতে সব সেক্টরেই মন্থরতা থাকলেও ভিন্ন চিত্র মাওয়ায়। পদ্মা সেতুর সব সেক্টরেই হরদম কাজ চলছে। বৃষ্টি-তীব্র স্রোত-নদী ভাঙ্গন কোন কিছুতেই থামাতে পারেনি কাজের গতি। এমনকি ঈদেও কাজ চলবে। বাংলাদেশী শ্রমিকরা ঈদের ছুটি নিলেও বিদেশীরা কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। আর শ্রমিকদের আনন্দময় কাজ চালাতে উৎসাহ দিতে নানা রকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাই দেশী-বিদেশীরা সম্মিলিতভাবে দেশের সর্ববৃহৎ এই প্রকল্পটি সফলভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোন প্রটোকল ছাড়াই মাঝেমধ্যেই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছেন। এমনকি রাত কাটাচ্ছেন প্রকল্প এলাকায়। তাই প্রকৌশলী-শ্রমিকদের উদ্দীপনা বেড়েছে। বুধবার সরেজমিন পদ্মা সেতু প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে এই চিত্র। কংক্রিট ব্লক তৈরির সর্বাধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ‘জিরো সøাজ’ মেশিন প্রথমবারের মতো ব্যবহার হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে। নদীশাসন প্রকল্পের কাজ এখন রাত-দিন চলছে। গত এক মাসে প্রায় ২ লাখ ব্লক তৈরি হয়েছে তিনটি প্লান্টে। এই তিনটি প্লান্ট জাজিরায়। মাওয়া পয়েন্টে এক প্লান্টে শুরু হয়েছে এই ব্লক তৈরি। আগামী অক্টোবরের মধ্যে ৫ লাখ ব্লক তৈরির লক্ষ্যমাত্র অর্জনে পুরোদমে এখন কাজ চলছে। পদ্মা সেতুর নদী শাসনের ঠিকাদার চীনের সিনো হাইড্রো কর্পোরেশনের ব্লক তৈরি চলছে হরদম। আগামী নবেম্বরে ব্লকগুলো পদ্মা তীরে ডাম্পিং করা হবে। এতে প্রকল্প এলাকায় আর কোন নদী ভাঙ্গন থাকবে। গত বছর এই ব্লক ডাম্পিং করা গেলে এ বছর নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা হতো। নদী শাসনে বর্ষা মৌসুমে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘন মিটার বালু অপসারণ করে পাইনপাড়া চরের কাছে মাঝ নদীতে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, এই ড্রেজিংয়ের আগে সয়েল টেস্টের মাধ্যমে ভারি ধাতু পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় থাকায় ড্রেজিংয়ের অনুমতি দেয়া হয়। বর্ষা মৌসুমের ড্রেজিং সম্পন্ন হওয়ায় আবার অক্টোবরে নতুন করে ডেজিং শুরুর পরিকল্পনা হচ্ছে। জাজিরা প্রান্তে অক্টোবরের প্রথম দিকে আবার ডেজিং শুরু হবে। শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে নাব্য সঙ্কটে নিয়োজিত সিনো হাইড্রোর ড্রেজারটিও এই কাজে যোগ দিবে। নদী শাসনে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর মূল সেতুর কাজ হয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে ২৫ শতাংশ।

সেতুটির ২৮ টেস্টিং মধ্যে ১১ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ট্রেস্টিং পাইলের কাজ চলামান রয়েছে ৩টি। এর মধ্যে মাওয়া পয়েন্টে একটি এবং অপর দুটি জাজিরা পয়েন্টে। দুটি কংক্রিট ট্রায়াল পাইলের মধ্যে মাওয়া পয়েন্টেরটি সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে জাজিরা পয়েন্টে অপর কংক্রিট ট্রায়াল পাই স্থাপন করা হবে। এদিকে সার্ভিস পাইল অর্থাৎ মূল পাইল স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রীর এই মূল পাইলের কাজের উদ্বোধনের কথা রয়েছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড এবং আশের কয়েকটি এলাকায় নদী ভাঙ্গন দেখা দিলেও সেতুর কাজে কোন বিঘœ ঘটাতে পারেনি। পদ্মা সেতুর নদী শাসন হলে কোন ভাঙ্গন থাকবে না বলেও নিশ্চিত করেছে কর্মকর্তারা। মূল পদ্মা সেতুর প্রায় এক কিলোমিটার ভাটিতে কুমারভোগের পদ্মা সেতুর কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড, দেড় কিলোমিটার ভাটিতে খড়িয়া, শিমুলিয়া এবং দক্ষিণ হলদিয়া গ্রামে এবং মূল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উজানে পুরনো মাওয়া ফেরিঘাটে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এছাড়া প্রায় ১০ কিলোমিটার উজানে দোহার এলাকাও এই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। তবে সেতুটির অপর প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শীবচরে কোন ভাঙ্গন নেই। তবে নদী শাসন প্রক্রিয়া আগে শুরু করা গেলে এই ভাঙ্গনে কোন আশঙ্কাই থাকার কথা ছিল না। গত মার্চ থেকে পদ্মা সেতুর নদী শাসনের কাজ শুরু করেছে। নদী শাসনের এই ওয়ার্ক অর্ডার পায় চায় না সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন। ১৩ ফেব্রুয়ারি তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়। কিন্তু কাজ শুরু পরপরই বর্ষা চলে আসে। তাই নদী শাসনের প্রধান কাজ এখনও শুরু হয়নি। তারপরও মূল সেতু এলাকা রক্ষণায় অন্তর্বর্তীকালীন কাজ হয়েছে। আর এ কারণে অস্বাভাবিক স্রোত সত্ত্বেও মূল সেতু এলাকা বা পাইলিং এলাকা রক্ষা হয়েছে। সাধারণত মূল সেতু কাজের আগেই নদী শাসনের কাজ হয়ে থাকে। তবে পদ্মা সেতু পকল্পের ক্ষেত্রে এটি হয়নি। এখন বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর কনস্ট্রকশন ইয়ার্ডসহ সবকিছুই এখন সুরক্ষিত রয়েছে।

এর আগে এই ইয়ার্ডের প্রায় ২০ মিটার দীর্ঘ এবং ৪ মিটার প্রস্থ এলাকা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। তারও আগে বিলীন হয় প্রায় ২শ’ মিটির দীর্ঘ এবং প্রায় ৫০ মিটার প্রস্থ এলাকা। মূল সেতু এলাকা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার ভাটিতে লৌহজংয়ের কুমারভোগস্থ পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের এই ভাঙ্গন প্রথম দেখা দেয় গত ২৭ জুন। সে সময় ১শ’ মিটার দীর্ঘ ও ৫০ মিটার প্রস্থ এলাকায় বিলীন হয়। এবার সে একই স্থানে ভাঙ্গন দেখা দেয় প্রায় দু’ মাস পর। তবে এবারের ভাঙ্গন আগের চেয়ে বেশি ভয়াবহ ছিল। কিন্তু ইতোমধ্যেই তা রোধ করা হয়েছে। এদিকে খড়িয়া গ্রামে ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত ৯২টি পরিবার ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ প্রদান করেছেন।

এদিকে বৈরী প্রকৃতিকে জয় করে পুরোদমে চলছে পদ্মা সেতুর সব অংশের কাজ। রাজধানীর ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সকল প্রকার যোগাযোগ। এদিকে উপজেলার মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে বাস্তবায়িত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্প। এতে খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা ধারণা। সাধারণত বর্ষার বৈরিতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়।