২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তির প্রতীক তিনি

  • এম. নজরুল ইসলাম

দেশের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির মূর্ত প্রতীক তিনি। বদ্ধ জানালার কপাট খুলে দিতে প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন ১৯৮১ সালে। সেদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের অনেক তফাৎ। সেদিনের বাংলাদেশ ছিল কারফিউ গণতন্ত্রীদের শাসনে। তখন জান্তার বুটের তলায় পিষ্ট মানুষের মৌলিক অধিকার। মানুষের স্বপ্ন দেখাও যেন নিষেধের বেড়াজালে বন্দী। ইচ্ছে পাখির ডানা মেলা মানা। রাজনীতি তখন ঘরোয়া একটি ব্যাপার। সেই দম বন্ধ করা পরিবেশ দূর করতেই দেশে ফিরেছিলেন তিনি। তাঁর আগমনে সেদিন উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয় সারাদেশ।

দেশে ফিরে বসে থাকেননি তিনি। এমনকি কর্তব্য বুঝে নিতে একটুও বিলম্ব হয়নি তাঁর। বিধ্বস্তপ্রায় দলের নেতৃত্ব তুলে নেন হাতে। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তিনি দলকে সংগঠিত করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে দল ক্ষমতায় আসে। তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জনগণের বিপুল সমর্থনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের আজকের অবস্থান প্রমাণ করে শেখ হাসিনা অনেক বড় মাপের নেত্রী। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী দশ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছেন। বাংলাদেশের স্বার্থে তিনি যে তাঁর বাবার মতোই আপোসহীন তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসা ও সমর্থনে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের চোখরাঙানি উপেক্ষা করার মতো শক্তি ও সাহস অর্জন করেছেন তিনি। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে তিনি সব সময় ভাবেন। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ পেলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈরী আবহাওয়া কৃষি, শিল্প ও সামাজিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ যে ‘হাত গুটিয়ে’ বসে নেই তা বিশ্বকে জানিয়ে নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি নির্ধারণ এবং প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের গণমানুষের এই নেতা। তাঁর নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোটি কোটি মানুষ পরিবেশ-উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। যদিও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণের কথা বিবেচনা করলে জলবায়ুর এই পরিবর্তনে বাংলাদেশের তেমন কোন দায় নেই।’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে। ফলে ৩ কোটির বেশি মানুষ ঘর হারাবে, নগরমুখী অভিবাসন হয়ে উঠবে অবশ্যম্ভাবী। মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকা, জীববৈচিত্র্য, খাদ্য, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ভৌত অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব হবে মারাত্মক। দ্রুত উদ্যোগী না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে বিশ্বকে সতর্ক করেছেন তিনি। ভবিষ্যতদ্রষ্টা নেতা এখানেই থেমে থাকেননি। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করে দিয়ে বলেছেন, ‘আর এ কারণে আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ এবং প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’ তবে বিশ্ব এসে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে এই আশায় আমরা হাত গুটিয়ে যে বসে নেই সে কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘সম্পদ ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার পরও নিজেদের ভবিষ্যত রক্ষায় আমরা লড়াই করে যাচ্ছি।’ শেখ হাসিনা তাঁর নিবন্ধের শুরুতেই লিখেছেন, এসডিজির যে লক্ষ্যটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে সেটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সব সময় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু তারপরও একশ্রেণীর বিরুদ্ধবাদী অপপ্রচারে লিপ্ত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তো বটেই, ছিদ্রান্বেষী ‘সোশ্যাল এলিট’ শ্রেণীও নানা অভিযোগে শেখ হাসিনার ত্রুটি তুলে ধরতে সচেষ্ট। তাদের অনেক অভিযোগ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। কিন্তু জনকল্যাণের মন্ত্রে দীক্ষা যাঁর, তিনি ওসব অভিযোগ গায়ে মাখেন না। তবে কোথাও প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সরাসরি তার জবাব দিতেও কুণ্ঠিত নন তিনি। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে অনেক অভিযোগের উত্তর দিয়েছেন তিনি। ঢাকায় দেয়া এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার কাজ সাধারণ মানুষের উন্নয়ন। আমার রাজনীতি সাধারণ মানুষের জন্য, নিজের জন্য নয়।’ গার্ডিয়ানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জোর দিয়েই বলেছেন, ‘জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আছে।’

জনগণের প্রতিনিধি তিনি, জনগণই তাঁকে বসিয়েছে নেতৃত্বের আসনে। জনগণের মনের কথা তিনি বুঝতে পারেন সহজেই। তাইতো জোর দিয়ে বলতে পারেন, ‘জনগণ চায় তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হোক। আমি তাদের সেই চাহিদা পূরণেই কাজ করছি। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও চাকরির ব্যবস্থা করছি।’ ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের দেশে নিতে সরকারের লক্ষ্যের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা গার্ডিয়ানকে দেয়া ওই সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান কার্যকর, মানুষও সন্তুষ্ট।’ নিজেকে অন্যদের মতো শাসক না ভেবে সেবক হিসেবে ভাবতে পেরেই তিনি তৃপ্ত। তাইতো জোর দিয়ে বলতে পারেন, ‘আমি শাসন করছি না, জনগণের সেবা করছি।’ গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাতকারে তাঁর নেতৃত্বসুলভ দৃষ্টান্তই ফুটে উঠেছে। প্রমাণিত হয়েছে শেখ হাসিনার দেশপ্রেমে কোন ঘাটতি নেই। তাঁর চিন্তা ও চেতনায় কেবলই বাংলাদেশ ও দেশের মানুষ। তাঁর স্বপ্নের আঙ্গিনায় যে সবুজ মানচিত্রটি আঁকা সেটি বাংলাদেশের। সেখানে এদেশের মানুষেরই বিচরণ। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। তিনি দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: অস্ট্রিয়াপ্রবাসী ও মানবাধিকারকর্মী হধুৎঁষ@মসী.ধঃ