২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ত্যাগের মহিমায় পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উদযাপিত

ত্যাগের মহিমায় পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উদযাপিত
  • দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর দরবারে মোনাজাত

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মহান ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সারাদেশে শুক্রবার উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে দেশের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা উদযাপন করে। ঘরে ঘরে ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত হয়েছে মন। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আনন্দ-উচ্ছ্বাসেই পালন করেছে তাদের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব।

শুক্রবার সকালে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের জন্য সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ স্থানীয় ঈদগাহ বা মসজিদে সমবেত হন। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে নিজের পাপমোচন এবং পরিবার-পরিজন, দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের মিনায় পদপিষ্ট হয়ে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দেশের বিভিন্ন ঈদগাহে মোনাজাত করা হয়। এরপর হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভেতরের পশুত্বকে পরিহার ও আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করেন তাঁরা।

ত্যাগের মহিমা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকার মুসলিম সম্প্রদায় ঈদের নামাজ আদায় ও পশু কোরবানির মাধ্যমে তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা উদযাপন করে। গত কয়েক দিনের মুষলধারের বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার অবসান ঘটিয়ে ঈদের সকাল থেকেই আকাশ মেঘমুক্ত ও রোদ্রজ্জ্বল থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় এ উৎসব উদযাপন করে। শঙ্কামুক্তাবস্থায় সবাই ঈদগাহ, মসজিদ ও খোলা মাঠে নামাজ আদায়ের পর পশু কোরবানি করতে পেরেছেন। পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সরকারী হাসপাতাল, কারাগার, ও সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।

ঢাকায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল আটটায় সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। জাতীয় ঈদগাহের প্রধান জামাতে মন্ত্রিসভার সদসবৃন্দ, সুপ্রীমকোর্টের বিচারকগণ, সংসদ সদস্যগণ, সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকগণসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ উৎসব আমেজে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি উপস্থিত সকলের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান ঈদ জামাতে ইমামতি করেন। নামাজ শেষে দেশের শান্তি ও উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত ঈদের এ প্রধান জামাতে মহিলা ও বিদেশী কূটনীতিকদের নামাজ আদায়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। খাবার পানি ও মোবাইল টয়লেটেরও বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। জাতীয় ঈদগাহে সুষ্ঠুভাবে ঈদ জামাত অনুষ্ঠানে নেয়া হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদগাহে সকল প্রবেশ পথ এবং ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের নামাজের স্থানসহ ঈদগাহ মাঠের প্যান্ডেলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। প্রধান এ জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাদা পোশাকে র‌্যাব এবং পুলিশ সদস্যরা ঈদগাহ ময়দানে সার্বক্ষণিক তৎপর ছিলেন। ঈদগাহে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

এবারের ঈদে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দুই প্রধান নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া রয়েছেন বিদেশে। জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে পরিবারের সদস্য এবং প্রবাসী নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ঈদ পালন করেছেন। আর খালেদা জিয়া লন্ডনে পুত্র, নাতি-নাতনীদের সঙ্গে ঈদ পালন করেছেন। এছাড়া দল দুটির অধিকাংশ সিনিয়র নেতাই এখন বিদেশে। আর দেশে যেসব নেতা-মন্ত্রীরা ছিলেন তাদের অধিকাংশই নিজ এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে ঈদ পালন করেছেন।

তবে এবারের ঈদে ঘরমুখী লাখ লাখ মানুষকে প্রচ- যানজটের কবলে পড়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ঢাকা থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টার এতটুকু পথ পেরুতেই ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা লেগে যায়। শত দুর্ভোগ ও হয়রানি সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষ নিজ গ্রামে ছুটে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পবিত্র ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। ঈদ শেষে এখন মানুষ ফের রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে। তিন দিনের ছুটি শেষে রবিবার অফিস খুললেও সর্বত্রই এখনও ফাঁকা। ঈদের আমেজ এতটুকুও কমেনি। রাজধানী ঢাকা সেই পূর্বের অবস্থায় ফিরতে আরও এক সপ্তাহ লাগবে এমনটাই মনে করছেন পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা।

বরাবরের মতো এবারও দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। রাজধানীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জামাত অনুষ্ঠিত হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সকাল সাতটায়। বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর একটি করে মোট ৫টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শেষ জামাত অনুষ্ঠিত হয় বেলা পৌনে ১১টায়। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ঈদ-উল-আযহার নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যাপ্ত পানি ও নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উদ্যোগে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত ঈদ জামাতে নামাজ আদায় করেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ সংসদ সদস্যবৃন্দ। সেখানে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং এলাকার সাধারণ মানুষও জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে সেখানেও দেশ ও জাতির কল্যাণ, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদ-উল- আযহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ মসজিদের ইমাম জামাত পরিচালনা করেন। ঈদের নামাজ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ, সুখ-সমৃদ্ধি ও জাতীয় অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, মসজিদুল জামিআয় ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামাত সকাল ৮টায় এবং দ্বিতীয়টি সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় মসজিদ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল মেইন গেট সংলগ্ন মাঠ এবং শহীদুল্লাহ হল লনে সকাল ৮টায় ঈদ-উল-আযহার পৃথক আরও দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাঠে সকাল পৌনে সাতটায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ঈদ-উল-আযহার জামাত হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঈদ জামাতটি হয় মশুরীখোলা শাহ্ সাহেব বাড়ি জামে মসজিদে। ১১৫তম ঈদ-উল-আযহার ওই জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৮টায়।

নির্বিঘেœ ঈদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন অন্যবারের মতো এবারও বিভিন্ন ঈদগাহ, খেলার মাঠ ও মসজিদে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। জাতীয় ঈদগাহসহ রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৯২টি ওয়ার্ডে ৩৬২টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ঈদ-উল-আযহার ২২৮টি জামাত হয়। এছাড়া কোরবানির পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকার দুই মেয়র দক্ষতার সঙ্গেই দ্রুত সকল কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়।

ঈদের নামাজ আদায়ের পর পশু কোরবানি শেষে সব শ্রেণী-পেশার ধর্মপ্রাণ মুসলমান আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস বিতরণ করেন। গরিব দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন মাংস ও অর্থ। বিকেলের পরে রাজধানীর শিশুপার্কসহ বিভিন্ন এ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলোতে নামে শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের ভীড়। এবার পবিত্র ঈদ-উল-আযহার কয়েকদিন পরই হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। তাই এবার ঢাকাসহ সারাদেশে মুসলিম সম্প্রদায়কে ঈদের শুভেচ্ছার পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়কেও দুর্গাপুজার শুভেচ্ছা জানিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণে ভরে ফেলে। সামনে পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এভাবেই সব সম্প্রদায়ের মানুষের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করেন।

এদিকে রাজধানীর যে সকল স্থানে তিনটি করে জামাত অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলোর মধ্যে- সায়েদাবাদ আরজুশাহ্ পাক দরবার শরিফ বড় জামে মসজিদে প্রথম জামাত সকাল সাতটায়, দ্বিতীয়টি সকাল আটটায় ও তৃতীয় জামাত সকাল নয়টায় অনুষ্ঠিত হয়। আরামবাগের বাবেরহমত দেওয়ানবাগ শরিফে প্রথম জামাত সকাল আটটায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল সাড়ে নয়টায় ও তৃতীয় জামাত সকাল দশটায় অনুষ্ঠিত হয়। কাজীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রথম জামাত হয় সকাল সাতটায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল আটটায় ও তৃতীয় জামাত সকাল নয়টায় অনুষ্ঠিত হয়।

দুটি করে ঈদ জামাত যে সকল স্থানে হয়, সে স্থানগুলো হলো- দক্ষিণ বনশ্রী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সকাল সাড়ে সাতটা ও সকাল সাড়ে আটটা, মানিকনগর পুকুরপাড় জামে মসজিদে সকাল সাতটা ও সকাল আটটা, দক্ষিণ মুগদা ব্যাংক কলোনির রসুলবাগ জামে মসজিদে সকাল সাতটা ও আটটা, যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল দরবারে মোজাদ্দেদীয়ায় সকাল আটটা ও সকাল সাড়ে আটটা এবং খিলক্ষেত কুর্মিটোলা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ ঈদগাহে সকাল সাতটা ও সকাল পৌনে আটটায় অনুষ্ঠিত হয়।