২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় অস্থির কাঁচা চামড়া বাজার

  • পাচারের আশঙ্কা লোকসানের মুখে মৌসুমী ব্যবসায়ী

এম শাহজাহান ॥ নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় অস্থির কাঁচা চামড়ার বাজার। মাঠ পর্যায়ে বেশি দাম দিয়ে কেনায় লোকসানের মুখে পড়েছেন চামড়ার মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। কোরবানি ঈদের দ্বিতীয় দিন শনিবার থেকে বেশিরভাগ ট্যানারি মালিক চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, দাম কমাতে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে হাজারীবাগ ও পোস্তায় চামড়া এনেও বিক্রি করতে পারছে না মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। লোকসান এড়াতে ট্রাকভর্তি চামড়া ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন তারা। দাম পড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত চামড়া পাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও চামড়া পাচার ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশী নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার। এছাড়া ঢাকায় চামড়ার মূল্যে ধস নামায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া আসছে না। এখন পর্যন্ত কোরবানির মাত্র ৪০ শতাংশ চামড়া পেয়েছে ট্যানারিগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে বিক্রি করতে না পারায় তৎপর হয়ে উঠছে চামড়া পাচারকারীরা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশের চেয়ে কাঁচা চামড়ার দাম বেশি। চাহিদাও ব্যাপক। এই বাস্তবতায় মাঠ ও ট্যানারি পর্যায়ে দামের সমন্বয় করা সম্ভব না হলে এ বছর বিপুল চামড়া পাচার হয়ে যেতে পারে। এতে ভয়াবহ কাঁচামাল সঙ্কটে পড়তে পারে চামড়া শিল্প খাত। এ বছর ঢাকার কোরবানি হওয়া গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৫০-৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া ৪০-৪৫ টাকা, প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ২০-২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু দেশের কোথাও এই দামে চামড়া কিনতে পারেননি মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

এদিকে, বেশি দাম দিয়ে চামড়া কেনায় এখন বিপাকে পড়েছেন এসব ব্যবসায়ী। যদিও ঈদের দিন বিকেল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৮০-৮৫ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে ট্যানারি মালিকরা আর বেশি দাম না নেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেন। এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি দিয়েও যাতে কোন ব্যবসায়ী চামড়া না কেনে সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। এ অবস্থায় কাঁচা চামড়া নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে সারাদেশে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, নাটোর ও নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের আড়তগুলোতে চামড়ার দাম নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস এ্যান্ড ফুটঅয়্যার এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবু তাহের জনকণ্ঠকে বলেন, সবকিছু নির্ভর করে ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের ওপর। এখন চামড়ার সাপ্লাই আছে কিন্তু ডিমান্ড নেই। দাম বেঁধে দেয়ার পরও মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। এই দায় তাদেরই। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনতে পারবে না। এ কারণে ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে চামড়া কেনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমরা তো আর লোকসান দিয়ে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের লাভবান করতে পারব না। আপনারা না নিলে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোথাও পাচার হতে পারবে না। এটি এমন কোন পণ্য নয়, যে মাথায় করে নিয়ে গেলাম। নিতে হলে ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান প্রয়োজন। কিন্তু পাচাররোধে আগেই সব ধরনের উদ্যোগের কথা সরকারকে জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্যত্র দাম বেশি হলে পাচারের একটা আশঙ্কা তো থেকে যায়। তবে এখন কোথাও চামড়ার বাজার ভাল নয়। তাই পাচারের কথা ভাবছি না।

মৌসুমী ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে ॥ এবারের কোরবানিতে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। কোরবানি এলে এই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন কসাই, বেকার, ছাত্র, রিকক্সা ও সিএনজি অটোচালকসহ বিভিন্ন নিম্ন আয়ের মানুষ। এ রকমই এক চামড়া ব্যবসায়ী ওয়ারীর সাজ্জাদ হোসেন। ঈদের সারাদিন ওয়ারী-মতিঝিল এলাকা ঘুরে ঘুরে চামড়া কিনেছেন তিনি।

এ বছর কোরবানির ঈদে ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। নির্ধারিত এ মূল্যটি ছিল লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মাঠ পর্যায় থেকে খুচরা কারবারিরা চামড়া সংগ্রহ করেন প্রায় দ্বিগুণ দামে। এক একটি গরুর চামড়া ১৫শ’ টাকা থেকে ২২শ’ টাকা পর্যন্ত মূল্যে ক্রয় করা হয়। এ ধরনের মৌসুমী চামড়া সংগ্রহকারীরা ধরা খেয়েছেন। ফলে তাদের লোকসান গুনতে হয়। হাটে বাজারে গভীর রাত পর্যন্ত চামড়া নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় মৌসুমী ব্যবসায়ীদের। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে কেনা দামের চেয়ে কমমূল্যে চামড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তারা। বেশি মূল্যে চামড়া সংগ্রহ প্রসঙ্গে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তারা অনেকেই প্রতিযোগিতার কারণে বেশিমূল্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি বছরই মৌসুমী চামড়া সংগ্রহকারীদের মাঠ পর্যায়ে তৎপর হতে দেখা যায়। নিজেদের মধ্যে মূল্য নিয়ে বোঝাপড়া না থাকায় এমনকি অনেকের সরকার নির্ধারিত মূল্য সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এ অবস্থা। আবুল বাশার নামের এক মৌসুমী ব্যবসায়ী জানান, তিনি প্রতিবছরই মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন। এবারও করেছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলোÑ সরকার দাম বেঁধে দিলেও কোরবানিদাতারা তো সে মূল্যে চামড়া বিক্রি করছেন না। ফলে তিনিও বেশি মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন।

চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলার সর্বত্র একই চিত্র। বেশিমূল্যে চামড়া ক্রয় করে শেষ পর্যন্ত তারা মুনাফা করতে পারেননি। খুব অল্পসংখ্যক চামড়া সংগ্রহকারী লবণ মেখে চামড়া সংরক্ষণ করলেও বেশিরভাগ সংগ্রহকারীই লোকসানে চামড়া বিক্রি করে দিয়েছেন।

নির্বাচিত সংবাদ