২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ ষড়যন্ত্রের নতুন ইন্ধন ও সজাগ থাকার জাতীয় দায়িত্ব

  • অজয় দাশগুপ্ত

ঈদের আনন্দে ভাসা জাতি যখন ত্যাগ আর উৎসবে ব্যস্ত, তখন আমাদের অজান্তেই ঘটে গেছে দু’একটি অপঘটনা। যার একটি সাম্প্রদায়িকতার বহির্প্রকাশ। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনও সাম্প্রদায়িক নয়। আজ অবধি সে ধারা বজায় রেখেছে তারা। আমরা এক দেশে এক মাটিতে এক সমাজে পাশাপাশি বসবাস করা মানুষ। আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি, আচার-আচরণ এক। কোরবানি ঈদে গোশত শেয়ার না করলে উৎসব পূর্ণ হয় না আমাদের। পূর্ণতা নেই সহাবস্থান আর উদারতা ছাড়া। এই দেশে একজন সাংবাদিক বিপদে পড়লে মানুষ জাত ধর্ম সম্প্রদায় বাদ দিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। দলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের মানুষ পরিচয়। আমাদের এই দেশটির হাল ধরে আছেন গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুকন্যা। তাঁর আমলে যাবতীয় সাম্প্রদায়িক কর্মকা-ের পেছনে আছে উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী আর জামায়াতের ইন্ধন। এ কথাও মানতে হবে আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটিমেরে আছে শত্রুরা। তাদের ভূমিকাও কম নয়। যেভাবেই হোক এরা সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঈদের আগে আবারও মূর্তি ভাঙ্গার দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে ভয় লাগানোর জন্য তো বটেই, আছে সুদূরপ্রসারী দূরভিসন্ধি। এই যেমন অনেক মানুষ এখন বলছে- এমন তো পাক আমলেও ঘটেনি। অনেক হিন্দুকেও এ কথা বলতে শুনি আজকাল। এটা যে কত বড় মিথ্যা আর পাকিস্তান যে কি জিনিস তা এখন অপ্রকাশ্য কিছু না। বরং সেদিকে তাকালেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসবে যে কারও। আমি খুব অবাক হই যখন কেউ পাকিস্তানীদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করে। পাকিস্তানীরা কি চিজ সে বিষয়ে একটু বলা যাক।

যে দেশে বসবাস করছি তার পুরোটাই বহুজাতিক। এ দেশে না আসলে আমি এত দেশের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেতাম না। পৃথিবীর হেন দেশ নেই যে দেশের মানুষ এখানে থাকেন না। উত্তর কোরিয়া বা কিউবার মতো একা নিঃসঙ্গ দেশের মানুষও থাকেন এই দেশে। দু’একজন হলেও তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ ঘটেছে আমার। বলা বাহুল্য, পাকিস্তানীরাও আছেন এখানে। আমার পরিচিত দু’একজন পাকিস্তানীকে আমি কিছুতেই মন্দ মানুষ বলতে পারব না। কামরান মীর্জা নামে এক তরুণ পাকিস্তানী চাকরি সূত্রে পরিচিত। তাদের একটি বড় পেট্রোল স্টেশনও আছে সিডনিতে। এক দুপুরে গিন্নিকে নিয়ে যাচ্ছিলাম, গন্তব্য একটি পারিবারিক দাওয়াত। তেল ভরে টাকা দিতে গিয়ে দেখি কামরান বসে আছে কাউন্টারে। বেরিয়ে এসে গলাগলি করার ফাঁকে আমার হাতে ধরিয়ে দিল ডোনাট নামের এক বাক্স মিষ্টি। নাছোড়বান্দা কামরানের কাছ থেকে এই উপহার না নিয়ে বেরিয়ে আসার উপায় ছিল না আমার। মোস্তফা কামাল সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। যতদিন সেখানে কাজ করতাম বিকেল হলেই এসে দাঁড়িয়ে থাকত। আড্ডা আর কফি পানে অনেক সময় কেটেছে আমাদের। কখন যে সে কফির টাকা শোধ করে দিত টের পেতাম না। ইরাম জোসেফ পাকিস্তানী ক্রিশ্চান তরুণী। সেও আমার এক সময়ের সহকর্মী। বাড়িতে বানানো কেক আর মিষ্টি খাইয়ে আমার শর্করার অসুখে অসামান্য অবদান রাখা ইরামকে ভোলাও অসম্ভব।

কিন্তু এর বিপরীত চিত্রটিও বলা প্রয়োজন। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি ও গোঁফের কারণে আমার গেট আপে অনেকেই জোশ খুঁজে পান। পাকিস্তানীদের সঙ্গে দেখা হলেই তারা লম্বা একটা সালাম দিয়ে প্রশ্ন করেন ‘হোয়ার আর ইউ ফ্রম ব্রাদার’? এই ব্রাদার সম্বোধনের আসল কারণটা বুঝি বলে আমার যেমন হাসি পায়, তেমনি পিত্তিও জ্বলে যায়। আমি খুব ভাল করে জানি এর কারণ কি। তাই রাগ লুকিয়ে কপট আন্তরিকতার ভান করে বলি : ‘বাংলাদেশ’, এতে আরও আহ্লাদিত হয়ে প্রায় বুকেই টেনে নেয় তারা। আমি বলি, ‘কেন ভাই ব্রাদার কেন? আমি কেন তোমার ব্রাদার’? খুশি খুশি মনে তাদের উত্তর, ‘কারণ তুমি বাংলাদেশের লোক। এক সময় তো আমরা একই ছিলাম তাই না’? আমি নিশ্চিত জানি, একটু বাদেই ব্রাদারের মুখে এই জেহাদি হাসি আর থাকবে না। তাই ভান করে বলি, ‘তাতে কি? এখন তো আমরা আলাদা। তাছাড়া তোমরা তো আমাদের মেরেছ, ধর্ষণ করেছ, লুটপাট করেছ।’ অদম্য পাকিস্তানীরা একটুও ঘাবড়ায় না। কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘ছোড় দো ইয়ার ও সব ফালতু পলিটিক্স কি বাত। হাম লোগ ব্রাদার হু অর রহেঙ্গা ভি।’ এবার আমি আরও একটু নমনীয় হয়ে বলি, ‘জরুর’।

তারপরই আসল জায়গায় হাত দেই। প্রশ্ন করি, তা ব্রাদার কি নাম তোমার? এক গাল হেসে তাদের নাম বলে পাল্টা প্রশ্ন করে ‘তোমার নাম’? চোখে চোখ রেখে বলি ‘অজয়’। এতেই কেল্লা ফতে! ব্রাদারের তখন ঘাম ছুটতে শুরু করেছে। হাত ধরে রাখা হাতের মুঠি শিথিল। কারও কারও চোখে-মুখে এক ধরনের বিষাদ বা বিষণœতা নেমে আসে। কেউ কথা না বাড়িয়ে কাজ আছে বলে তড়িঘড়ি পা চালায়। কেউবা বলে ‘স্যরি’। তখন আমার আনন্দ দেখে কে! আমি তখন জোর গলায় বলতে থাকি, ‘কেন হে আমি না তোমার ব্রাদার! আমি না বাংলাদেশী ব্রাদার! সমস্যা কোথায়?’ পাকিস্তানীর তখন সময় নেই। মালাউনকে ব্রাদার বলার প্রায়শ্চিত্ত খোঁজার জন্য মরিয়া পাকির দৌড়ে আমি হাসি চেপে রাখতে পারি না। কারণ এরা সেই জাতি যাদের দেশের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় একডজন মানুষের মৃত্যুর পর ফেরত আসা এগারোটি কফিন ছিল জাতীয় পতাকায় ঢাকা আর একটি মাত্র কফিনে লেখা ছিল ‘কাফের খ্রিস্টান’।

ফলে তুলনা করবেন না। বাংলাদেশে এখনও সবাই শান্তি প্রত্যাশী। এখনও মানুষ মানুষের মতো বাঁচে। এই দেশে মূর্তি ভাঙ্গার লোকেরা বুক ফুলিয়ে চলতে পারে না। তাদের হামলা চোরাগোপ্তা। তারা পাকিস্তানীদের মতো বুক ফুলিয়ে বলতে পারে না, হয় ধর্মান্তরিত হও নয় তো দেশ ছাড়। বরং আমাদের দেশে শেখ হাসিনার আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছে নতুন এক যাত্রা। নেত্রীর হাত শক্তিশালী করার পরিবর্তে যেসব সংখ্যালঘু নেতা বা সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলেন বা জাতিকে বিভ্রান্ত করেন তাদের বলি, মন ও মননকে সজাগ করুন। ভাল করে ভেবে তারপর নিজেদের অবস্থান ঠিক করুন। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছাড়া তৃণমূলে সাম্প্রদায়িকতা ঠেকানো অসম্ভব। মূর্তি ভাঙ্গার মাধ্যমে যারা আমাদের পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে চায় তাদের কাছে একটাই বার্তা- তার চেষ্টা করেও সফল হবে না। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। ষড়যন্ত্রকারীরা দেশে মূর্তি ভেঙ্গে বিদেশে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের বিরুদ্ধে দু’চারজন মানুষ জমায়েত করে সেøাগান দিয়ে কোন উদ্দেশ্যই সফল করতে পারবে না। এটা যেন ভুলে না যাই আমরা।

dasguptaajoy@hotmail.com