২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৎস্যপ্রিয়তা

বিশ শতকের নব্বই দশকে বিটিভিতে মাছ চাষ বিষয়ক একটি বিজ্ঞাপনের সেøাগান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। মাছ চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ উন্মোচনের জন্য ধ্বনিত হতো ‘মৎস্য মারিব খাইব সুখে, কী আনন্দ লাগছে বুকে।’ আনন্দ হওয়ারই কথা। যত গালিই দেয়া হোক বাঙালীকে ভিন ভাষীর ‘মছলীখোর’ হিসেবে, তাতে তার চিত্তে সুখই জাগে। মাছের আমিষ প্রোটিন শারীরিক চাহিদা পূরণে যেমন সহায়ক, তেমনি সুস্বাস্থ্যেরও লক্ষণ। এক সময় তো প্রবাদই ছিল ‘মাছে ভাতে’ বাঙালী এখন তা অতীত। এমনিতেই আমিষের চাহিদা পূর্ণ না হলে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান জাতি হিসেবে বাঙালীর বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রটি থেকে যায় অনিশ্চিত। এই বাস্তবতায় মাছের মাধ্যমে অনেকাংশই আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপকহারে মাছ চাষ। যার অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ এদেশে বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সদিচ্ছা আর উদ্যোগ। মাছের দিন ছিল বটে বাঙালীর জীবনে। কিন্তু সেই মাছ এক সময় মহার্ঘ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। বাঙালীর পাতে আর মাছ ওঠেনি সেভাবে দীর্ঘকাল। ‘সাগর নদী সকল জলে মাছ চাষে সোনা ফলে’- বিষয়টি জানা ছিল না বাঙালীর। তাই মাছের উৎপাদন বাড়াতে সেভাবে নজর দেয়নি। বিশ শতকের শেষ দিক থেকে বাঙালী নিজ উদ্যোগে মৎস্যচাষ চালুর পর উৎপাদন বেড়েছে ব্যাপকহারে। তাই দেখা যায়, পুকুর ও জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মৎস্যজীবীদের সাফল্য বরাবর উদাহরণ হিসেবে এসেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) প্রতিবেদনে। তবে মাছচাষীদের এই সাফল্য এসেছে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে। সরকারের কৃষিঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে মাছচাষীরা এখনও অবহেলাই পেয়ে আসছে। তদুপরি মাছচাষীদের জন্য সরকারী-বেসরকারী কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি। তারপরও এই খাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ বলছে ফাও। তাদের মতে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। দেশে এখন বছরে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যদিও ১৬ কোটি মানুষের চাহিদা ৪২ লাখ টন মাছ। এই ঘাটতি পূরণ করতে প্রয়োজন উৎপাদন বাড়ানো। ফাও অবশ্য এমন তথ্যও দিচ্ছে যে, বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে গত এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচে অবস্থান করছে। বর্তমানে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীন, ভারত ও মিয়ানমার। এমনিতে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ব্যবস্থা মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। এখানকার আড়াই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় আর গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মাছ চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে তা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। তাই এখনও প্রতিবেশী দেশ তথা বিদেশ হতে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এটা বাস্তব, মাছচাষীদের জন্য সরকারী আনুকূল্য অপর্যাপ্ত। সুতরাং সরকার যদি মাছ চাষে আরও মনোযোগী হয়, চাষীদের সহায়তা করে, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে। ফাওয়ের হিসাবে ধারাবাহিকভাবে এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচের মধ্যে রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল। গত দশ বছরে দেশে মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শুমারিতে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে চাষের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টন। অবশ্য জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদনও বেড়েছে। সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, জনপ্রতি ১২ কেজি মাছ খাওয়া হয়। প্রতি লোকমায় মাছ খেতে হলে উৎপাদন বাড়ানো সঙ্গত। এজন্য মাছ চাষের পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হবে বলে মৎস্যপ্রিয় বাঙালীর আশা।