২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খাদ্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত ॥ সামুদ্রিক শৈবাল

খাদ্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত ॥ সামুদ্রিক শৈবাল
  • দেশের ২৫ হাজার বর্গ কিমি উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে ১৪০ প্রজাতির শৈবাল ;###;এ সাগরশস্য থেকে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব ;###;হতে পারে আগামী দিনের পুষ্টি ভা-ার ;###;শৈবালের ঔষধি গুণ প্রচুর ;###;রফতানি সম্ভাবনা অফুরন্ত ;###;প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে দেশে শৈবাল চাষের উদ্যোগ

কাওসার রহমান ॥ দেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৪০ প্রজাতির শৈবাল পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৮ প্রজাতির শৈবাল বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রয়েছে ৭১০ কিলোমিটারব্যাপী সমুদ্র সৈকত। আরও রয়েছে ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারব্যাপী উপকূলীয় অঞ্চল। যেখানে পরিকল্পিত বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাছের পাশাপাশি এ সামুদ্রিক শৈবাল চাষকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে পারে বাংলাদেশের অফুরান ব্লু-ইকোনমি। কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সামুদ্রিক শৈবালই হতে পারে আগামী দিনের পুষ্টির ভা-ার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার। শুধু ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে দেশে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সামুদ্রিক মৎস্যের জল আয়তনের অর্থনৈতিক এলাকা ৪১,০৪১ বর্গ নটিক্যাল মাইল হতে পারে পুষ্টি নিরাপত্তার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সফল চাষে উৎপাদিত সামুদ্রিক শৈবাল এনে দিতে পারে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। এ শৈবাল বিদেশে রফতানি করেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। সামুদ্রিক শৈবাল চাষে উপকূলবাসীর আর্থিক সচ্ছলতার নতুন পথও উন্মুক্ত হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও চাষীদের বিকল্প আয়ের উপায় হিসেবে শৈবাল চাষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া শৈবাল চাষের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারও নারী-পুরুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বিপুল পরিমাণ সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের অধীনে আসার পর সরকার ‘ব্লু-ইকোনমির’ প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের উন্নয়নে সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের প্রেক্ষিতে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। অপার সম্ভাবনার গুরুত্ব অনুধাবন করে আগামী সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। এজন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শৈবাল চাষকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করে দিয়ে যাচ্ছি। এখন এটি নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। গবেষণার মাধ্যমে এর উন্নয়ন করা হবে। কৃষকদের সামুদ্রিক শৈবাল চাষে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা দেয়া হবে।’

বাংলাদেশে ‘সামুদ্রিক শৈবাল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ হিসেবে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বর্তমানে ১৮০ জন চাষী ১০টি গ্রুপে ভাগ হয়ে সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ শহরের শাহ্পরীর দ্বীপ ও জালিয়াপাড়া এলাকায় নাফ নদীর তীর এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার রেজু খালের তীরে শৈবাল চাষ করছে। এসকল চাষী বছরে দুটি প্রজাতির ৪০০ থেকে ৫০০ মণ শৈবাল উৎপাদন করছে। এছাড়া আরও অনেক চাষী প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আরও প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার মণ শৈবাল সংগ্রহ করছে। চাষকৃত ও সংগৃহীত এসব শৈবাল শুকিয়ে ও প্রক্রিয়াজতকরণ করে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে বিক্রি করা হচ্ছে। উৎপাদিত শৈবাল প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা এবং প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত শৈবাল বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা মণ দরে। এসব শৈবাল মিয়ানমার থেকে চলে যাচ্ছে চীনে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোন কোন প্রজাতি দেখতে কালো সেমাইয়ের মতো। কোনটি আবার আঙ্গুরের মতো। কোনটি দেখলে মনে হবে মোটা পাটের রশি যেন। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এমনই বিভিন্ন রঙ ও আকৃতির প্রায় ১৪০ প্রজাতির শৈবাল। সবজি হিসেবে খাওয়ার উপযোগী এসব শৈবাল। আবার চকোলেট কিংবা ওষুধ জমাট বাঁধানোর উপাদান ‘এগার’ তৈরির প্রধান কাঁচামালও পাওয়া যায় এসব থেকে। ঠিকমতো উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে শৈবাল নামের এ সমুদ্রশস্য দিয়ে আয় করা যাবে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এতদিন অজানা থাকা এসব তথ্য এক গবেষণার মাধ্যমে উদ্ঘাটন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাফর। প্রায় বিনা পুঁজিতে সমুদ্রশস্য উৎপাদনের কৌশলও আছে তার গবেষণায়।

সামুদ্রিক শৈবাল শস্যের সম্ভাবনা খুঁজতে ২০০০ সাল থেকেই গবেষণা শুরু করেন ড. জাফর। ২০১৩ সালে এসে কাক্সিক্ষত সাফল্য পান। গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, এক মাস সমুদ্রতটে মোটা রশি বা জাল ফেলে রাখলেই সে জালকে ঘিরে উৎপাদিত হয় সামুদ্রিক শৈবাল। আবার উপকূলীয় অঞ্চলে যদি জোয়ার-ভাটার স্থলে রশি কিংবা বাঁশ রাখা হয়, মাসখানেকের মধ্যে সেই রশি কিংবা বাঁশের ওপরও গজাবে কোটি টাকা মূল্যের এসব সামুদ্রিক শস্য। গবেষণাপত্রে সামুদ্রিক শৈবাল কৃত্রিম উপায়ে চাষের পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে ড. জাফর বলেন, টেকনাফে আঞ্চলিকভাবে এসব সামুদ্রিক শৈবালকে বলা হয় ‘হেজেলা’। সেন্টমার্টিন অঞ্চলের লোকজন এসব হেজেলা (সামুদ্রিক শৈবাল) সংগ্রহ করে স্বল্প দামে বিক্রি করে দিচ্ছে পাশের দেশ মিয়ানমারে। আর মিয়ানমার থেকে তা চলে যাচ্ছে চীন-কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। অথচ বাংলাদেশকে প্রতিবছর শুধু ওষুধ শিল্পের জন্য সামুদ্রিক শৈবাল থেকে উৎপাদিত কাঁচামাল কিনতে গুনতে হচ্ছে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

এর আগে ‘বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ নিয়ে যৌথভাবে গবেষণা করেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নেসার আহমেদ এবং থাইল্যান্ডের কাসেটসার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাকোয়াকালচার বিভাগের শিক্ষক ওয়ারা টাপারহুডি। তারা গবেষণা করে দেখতে পান, দেশের ৭১০ কিলোমিটারব্যাপী সমুদ্র সৈকতের ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলের বালি ও কাদাযুক্ত মাটি শৈবাল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বিশেষ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও বাগেরহাট জেলা ভৌগোলিকভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। এছাড়া সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হচ্ছে খাবারযোগ্য সবুজ, লাল ও বাদামি বঙের শৈবাল চাষের সবচেয়ে উপযোগী এলাকা। অথচ আর্থ-সামাজিক ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে শৈবাল চাষ বিস্তৃতি লাভ করছে না। ফলে এদেশে সামুদ্রিক শৈবালের নিয়মিত কোন শিল্প গড়ে উঠেনি।

এদেশের আদিবাসীরা প্রাচীনকাল থেকেই সামুদ্রিক শৈবালকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে শৈবাল টাটকা সালাদ, সবজি কিংবা মাছ বা মাংসের সঙ্গে তরকারি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও দেশের বায়ো কেমিক্যালস, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কসমেটিকস শিল্পে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সামুদ্রিক শৈবাল।

ফলে সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হওয়া সত্ত্বেও এদেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কিছু লোক দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শৈবাল চাষে জড়িত রয়েছে। স্থানীয়রা সাধারণত নবেম্বর-জানুয়ারি সময়ে সমুদ্র থেকে শৈবাল সংগ্রহ করে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারা এপ্রিল-মে সময়ে সীমিত আকারে সামুদ্রিক শৈবাল সংগ্রহ করে। এগুলো শুকিয়ে পরবর্তীতে মিয়ানমার, চীন ও সিঙ্গাপুরে রফতানি করা হয়।

তারা গবেষণার মাধ্যমে দেখতে পান, বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবালের ১৩৩টি উন্নত জাত রয়েছে। এর মধ্যে আটটি জাত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষের খুবই উপযোগী। এগুলো হলো- কিউলারপা (সবুজ), এ্যানটেরোমরফা (সবুজ), গেলিডিয়েরা (লাল), গেলিডিয়াম (লাল) হেলিমেনিয়া (লাল), হাইপনিয়া (লাল), হাইড্রোক্লাথরাস (বাদামি) এবং সারগাসাম (বাদামি)। কিন্তু জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকার শৈবাল সংগ্রহ ও রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। অথচ পরিবেশের ক্ষতি না করেও বাংলাদেশ সবুজ শৈবাল চাষ ও রফতানির একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উপকূলে জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী স্থানে এসব শৈবাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে এদেশে শৈবালভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও প্রাকৃতিকভাবেই উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে, যা দেশটির জন্য বাড়তি সুবিধা। শৈবাল চাষে খরচ কম কিন্তু আয় অনেক বেশি, যা বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ৭৬টি উপজোর বাসিন্দারা বেশির ভাগই মৎস্য আহরণ ও মৎস্য সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের বিকল্প আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। এদেশে শৈবালের জাত এতটাই সহজলভ্য যে, শুধু চাষের জন্য উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন খাবার হিসেবে এটিকে জনপ্রিয় করা। কারণ শৈবাল এদেশের মানুষের পুষ্টির একটি বড় ভা-ার হতে পারে। এদেশের ১০ লাখেরও বেশি মানুষ গলগ- রোগে ভুগছে। অধিকাংশ শৈবালেই সমুদ্রের পানির চেয়ে বেশি আয়োডিন রয়েছে, যা ওষুধ বা লবণের চেয়েও সমৃদ্ধ বিকল্প হতে পারে। আর এতে দুধের চেয়েও ১০ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা শরীরে সহজে হজমযোগ্য।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে শৈবাল চাষেরর প্রধান সমস্যা পর্যাপ্ত তথ্য ও জ্ঞানের অভাব। অভাব প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের। বাণিজ্যিকভিত্তিতে বড় আকারে শৈবাল চাষ করতে হলে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। অভিজ্ঞ চাষীর অভাবেই এদেশে শৈবাল চাষ গতি পাচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে শৈবাল চাষে দক্ষ চাষী রয়েছে। তারা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এদেশের চাষীদের সেবা দিতে পারে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদিত হয়। ফলে বাংলাদেশে শৈবাল উৎপাদিত না হওয়ার কোন কারণ নেই।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ ॥ অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো শৈবাল বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় জনগণ ‘হেজেলা’ নামক এক প্রকার শৈবাল কুড়িয়ে, তা শুকিয়ে বিদেশে রফতানি করে এবং কিছু শৈবাল সার হিসেবে ব্যবহার করে। পর্যটকদের অবাধে চলাফেরা, নৌ-চালনা, পাথর আহরণ এসব কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপে শৈবালের আবাসস্থলে কিছুটা অসুবিধা হয়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে শৈবাল সংগ্রহ না করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে শৈবাল চাষাবাদ করলে এর গুণগতমান যেমন রক্ষা হয় তেমনি আর্থিকভাবে লাভবানও হওয়া যায়।

কক্সবাজারে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ২০১০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে দুই প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করার মাধ্যমে দেশে প্রথম এর চাষ শুরু হয়। কিন্তু সরকারী উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই শৈবাল চাষ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।

তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে এরই মধ্যে কক্সবাজারের জাহানারা গ্রীন এ্যাগ্রোর উদ্যোগে শুরু হয়েছে শৈবাল চাষ। এ প্রতিষ্ঠানের শৈবাল চাষে স্থানীয় ৫শ’ জেলে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের উৎপাদিত শৈবাল ওই প্রতিষ্ঠানটিই কিনে নিচ্ছে। সেন্টমার্টিন ছাড়াও কক্সবাজার জেলার টেকনাফের শাহ্পরীর দ্বীপ ও জালিয়াপাড়া এলাকায় নাফ নদীর তীর ও উখিয়ার ইনানী এলাকার রেজু খালের তীরে শৈবাল চাষ হচ্ছে। এ সকল চাষীরা বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মণ শৈবাল উৎপাদন করছে, যা প্রক্রিয়াজাত করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দরে প্রতিবেশী দেশে বিক্রি করা হচ্ছে।

এছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থানীয় লোকজন জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থান থেকে বছরে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মণ সামুদ্রিক শৈবাল সংগ্রহ করছে। এসব শৈবাল সূর্যের তাপে শুকিয়ে প্রতিমণ এক থেকে দেড় হাজার টাকা দরে মিয়ানমারে বিক্রি করছে।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টও কক্সবাজার অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করছে। তারা এ পর্যন্ত ১৮০ চাষীকে শৈবাল চাষের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর আগে আরও তিন শ’ চাষীকে তারা সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে সচেতন করেছে। পল্লী-কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) একটি প্রকল্পের আওতায় তারা এ সকল চাষীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের প্রশিক্ষিত প্রায় ১২৫ চাষী বর্তমানে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে শৈবাল চাষ করছেন। এ প্রতিষ্ঠানটি পিকেএসএফের অর্থায়নে সামুদ্রিক শৈবাল চাষে চার বছর মেয়াদী আরও একটি প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার এলাকার হোটেল ও ফার্মেসিগুলোতে শৈবাল বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে পর্যটকরা এখানে এসে ভিন্নতর খাবার হিসেবে জলজ উদ্ভিদের স্বাদ নিয়ে যেতে পারেন।

কোস্ট ট্রাস্টের পক্ষে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা ও রিসার্চ ফেলো মোঃ শফিউদ্দিন। তিনি জানান, চাষীদের শৈবালের গুরুত্ব বুঝাতে পারলে এর উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, উন্মুক্ত সাগরেও শৈবাল চাষ করা যায়। জেলেরা ১৫ দিনের জন্য সাগরে যায় মাছ ধরতে। এ সময় তারা যদি জাল নিয়ে সমুদ্রের পানিতে ফেলে রাখে তবে দেখা যাবে ১৫ দিনেই ওই জালে শৈবাল জন্ম নিয়েছে। আবার দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি ঘের এলাকাতেও রোপণ পদ্ধতিতে শৈবাল চাষ করা সম্ভব। এজন্য চাষীদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও বাজার তৈরির জন্য কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ঔষধি গুণ থাকায় সবজি হিসেবে এই শৈবাল খাবার তালিকায় রাখা যেতে পারে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রতিদিনের খাবার তালিকায় ৩ গ্রাম করে শৈবাল রাখলে দেশের বেশিরভাগ জনগণ টিউমার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা পাবেন।’

শফিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে ৫০ গ্রাম শুকনো সামুদ্রিক শৈবাল ১৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। কাপ আইসক্রিমের কাপে করেও শৈবাল দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করা যায়। এজন্য প্রাকৃতিক উৎস ছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে শৈবাল চাষ ও উৎপাদনে আগ্রহী কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সম্ভাবনা ॥ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কক্সবাজারে নারিকেল জিঞ্জিরা তথা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৪০ ধরনের শৈবাল জন্মায়। তা ছাড়া জেলা উপকূলীয় প্যারাবন এলাকাতেও ১০ প্রকারের শৈবাল দেখা যায়। এর মধ্যে ৮ প্রজাতির শৈবাল বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেগুলো চাষ করে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।

মাঠপর্যায়ে গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, বর্তমানে এক ধরনের শৈবাল পাওয়া যায়, যা কুমারীর চুল বা সেমাই হিসেবে পরিচিত। এটি দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতি এবং যে কোন শক্ত বস্তুর ওপর জন্মে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রবাল, পাথর, রশি, বাঁশ এমনকি অন্য শৈবালের ওপরও এ শৈবাল জন্মে।

গৃহস্থালি উপকরণ, দড়ি, বাঁশ, জাল, প্লাস্টিক বয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে চাষীরা সহজেই শৈবালের চাষ শুরু করতে পারেন। সৈকতে জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থানে অধিকাংশ শৈবাল জন্মায়। ফলে ভূমিহীন চাষীরা খাস অনাবাদি জলাভূমিতে বিনা বাধায় শৈবাল চাষ করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের গবেষকদের উচিত এদেশের প্রাকৃতিক অবস্থা বিবেচনা করে লাভজনক শৈবাল চাষের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করা। যেন তা মৎস্য সেক্টরেও এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাফর আহমদ বাংলাদেশের সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ পদ্ধতি খুব নতুন উদ্যোগ। এর চাষ পদ্ধতিও খুব সহজ। দেশের উপকূলীয় জলরাশিতে ব্যাপকভাবে শৈবাল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে চাষের কাঠামো প্রতিষ্ঠাকরণে চাষীদের ক্ষুদ্র পুঁজি সরবরাহ করতে হবে।

তিনি আরও জানান, গৃহস্থালি উপকরণ তথা দড়ি, বাঁশ, জাল, প্লাস্টিক বয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে চাষীরা সহজেই এই চাষ শুরু করতে পারে। সৈকতে জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থানে অধিকাংশ শৈবাল জন্মায় ফলে ভূমিহীন চাষীগণ খাস সরকারী অনাবাদি জলাভূমিতে বিনা বাধায় শৈবাল চাষ করতে পারে।

ড. মোহাম্মদ জাফর আহমদ আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ শৈবালের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া চাষকৃত শৈবালের ভালমানের ঔষুধি গুণ থাকায় দেশেও এর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল এ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশে রয়েছে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের অপার সম্ভাবনা। সঠিক ও পরিকল্পিতভাবে চাষের পাশাপাশি দেশের ভিতর ও বর্হিবিশ্বে এর বাজার সৃষ্টি করা হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে এই শৈবাল, যা বেকারত্বকে কমাবে এবং পুষ্টির চাহিদাকে পূরণ করতে সাহায্য করবে।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো শৈবাল বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় জনগণ ‘হাইপেনা’ শৈবাল কুড়িয়ে তা শুকিয়ে বিদেশে রফতানি করে এবং কিছু শৈবাল সার হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু পর্যটকদের অবাধে চলাফেরা, নৌ-চালনা, পাথর আহরণ ইত্যাদি কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপে শৈবালের উৎপাদন বিঘিœত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উৎস ছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে শৈবাল উৎপাদন ও চাষে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক বলেন, ‘গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত যে, দেশের উপকূলীয় জলরাশিতে ব্যাপকভাবে শৈবাল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে চাষের কাঠামো প্রতিষ্ঠাকরণে চাষীদের স্বল্প বিনিয়োগ প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ শৈবালের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া চাষকৃত শৈবালের ভালমানের ঔষুধি গুণ থাকায় দেশেও খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।’

গবেষণায় দেখা যায়, পরিকল্পিতভাবে শৈবাল চাষ করা হলে সামুদ্রিক ৪১,০৪১ বর্গ নটিক্যাল মাইল এলাকাজুড়ে একদিকে যেমন বিশাল মৎস্যভা-ার গড়ে তোলা সম্ভব, অন্যদিকে উপকূলবাসীর আর্থিক সচ্ছলতার নতুন পথও উন্মুক্ত হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও চাষীদের বিকল্প আয়ের উপায় হিসেবে শৈবাল চাষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া শৈবাল চাষের মাধ্যমে ওই সব অঞ্চলে হাজারও নারী-পুরুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভাব।

তবে শৈবাল চাষের ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধাও রয়েছে। সমুদ্রে তলানি জমা, সাগরের শক্তিশালী ঢেউ এবং ভাটা শৈবাল চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চাষী পর্যায়ে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, পর্যাপ্ত দেশীয় বাজার সৃষ্টি না হওয়া, প্রযুক্তিগত ও দক্ষ মানুষের অভাব লাভজনক শৈবাল চাষকে ব্যাহত করতে পারে।

আবার পরিকল্পিতভাবে শৈবাল চাষ করা হলে সামুদ্রিক এলাকাজুড়ে বিশাল মাৎস্যভা-ার গড়ে তোলা সম্ভব। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সামুদ্রিক শৈবাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলনে স্পিরুলিনা নামক অতি ক্ষুদ্র নীলাভ শৈবালকে আগামী দিনের সেরা খাদ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এ্যান্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন একে খাদ্যের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়াও দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ রাখতে শৈবাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

শৈবাল চাষ পদ্ধতি ॥ পরিত্যক্ত ফাটা-ছেঁড়া জাল সমুদ্র সৈকতের জোয়ার-ভাটার স্থানে ৩-৪ হাত দূরত্বের মধ্যে দুটি বাঁশ পুঁতে শক্ত করে বাঁধতে হবে। ওই জালে কিছু শৈবাল সুতা দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এরপর অপেক্ষা করতে হবে মাত্র এক মাস। পরবর্তীতে ১৫ দিন পরপর ওই জাল থেকে শৈবাল উত্তোলন করা যাবে। প্রতিমাসে এক কেজি জাল থেকে ১০ হাজার টাকার শৈবাল পাওয়া যাবে। জোয়ার-ভাটার মাঝের স্থানে অধিকাংশ শৈবাল জন্মায়। সে কারণে ভূমিহীন চাষীরা সরকারী জলাভূমিতে শৈবাল চাষ করতে পারবেন। এদিকে শৈবাল চাষে কোন ধরনের কীটনাশকও দেয়া লাগে না। কেবল পানির স্রোত থাকলেই চলে। যেহেতু শৈবাল চাষীদের পনেরো দিন পরপর জাল থেকে শৈবাল সংগ্রহ করতে হয় তাই শৈবাল চাষে নিয়োজিত নারী-পুরুষ গৃহস্থালির কাজ, মৎস্য চাষ, ক্ষেত-খামারসহ বিভিন্ন কাজ-কর্মও করতে পারে।

এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো হলোÑ ১. বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি নির্বাচন, ২. সঠিক স্থান নির্বাচন, ৩. বাঁশের ফ্রেম তৈরির কৌশল, ৪. শৈবাল আহরণের কৌশল ও ৫. শৈবাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল।

সাধারণত জোয়ার-ভাটায় মাঝখানে পানিতে বিনা চাষে উৎপাদিত হয় কিছু কিছু সামুুদ্রিক শৈবাল; যেমন- হিপনিয়া, সারগাসাম, জেলিরিয়াম। আবার সমুদ্রের পানির ৪০০ মিটারের মধ্যে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় পানির সেই অংশে কোন কোন বস্তু পেলেই তাকে জড়িয়েও এসব সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদিত হয়ে থাকে। প্যারাবন এলাকায় পানির আসা-যাওয়ার মাঝে জন্মায় এন্টারোমোর্ফা। উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রতটে জাল বিছিয়ে এলে সেখানে জমে থাকা পানিতে সেই জালকে ঘিরে জন্মাবে আঙ্গুরের মতো দেখতে সামুদ্রিক শস্য ক্লোরোফা।

পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নারিকেলের ছোবড়া, কাঁথা, রশি বা জালের মধ্যে শৈবাল সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয়। শৈবাল চাষের প্রধান কাজ হলো উপযুক্ত স্থান নির্বাচন। উপযুক্ত স্থান হলো প্রবল ঢেউ ও স্রোতের প্রভাবমুক্ত এবং উপকূলীয় অগভীর-গভীর এলাকা। সেন্টমার্টন, টেকনাফ, উখিয়া এবং কক্সবাজার উপকূলে শৈবাল চাষ করা সম্ভব। এছাড়া উপকূলীয় প্যারাবন ও নদীর মোহনায় যেখানে পানির লবণাক্ততা বেশি থাকে সেসব এলাকায় শৈবাল চাষ সম্ভব।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবুজ শৈবালই বেশি চাষ হচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশেও কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত পুরো সমুদ্র সৈকত এলাকাই সবুজ শৈবাল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কিউলারপা (সবুজ) ও এ্যানটেরোমরফা (সবুজ) জাতের সবুজ শৈবাল প্রোটিন, এ্যামিনো এ্যাসিড, ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ; যা শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, সার হিসেবে এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আমাদের দেশে উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে শৈবাল চাষ করা হলে একদিকে যেমন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে, অন্যদিকে হাজারও নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরও একটি দিক উন্মোচিত হবে। এখন শুধু প্রয়োজন শৈবাল চাষে আগ্রহী ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ।

রফতানির সম্ভাবনা ॥ সামুদ্রিক শৈবাল একটি সম্ভাবনাময় রফতানিযোগ্য পণ্য। সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি টন শৈবাল উৎপাদন হয়, যার আর্থিক মূল্য ১২০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিশ্বে একুয়াকালচার উৎপাদনে শৈবালের অবস্থান দ্বিতীয়। শৈবাল একটি সম্ভাবনাময় জলজ উদ্ভিদ, যার পুষ্টিমান অন্যান্য জলজ প্রজাতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ হিসেবে বিশ্বব্যাপী দিন দিন সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে মানুষের খাদ্য ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অনেক দেশেই শৈবালের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সামুদ্রিক শৈবাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। আর গুরুত্বপূর্ণ এ সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যোগ করতে পারে এক নতুন মাত্রা।

বাংলাদেশ কোস্ট ট্রাস্টের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বছরে প্রায় দুই হাজার টন শৈবাল প্রতিবেশী দেশে পাঁচার হয়। অথচ বৈধ পথে এ শৈবাল বিদেশে রফতানি করা হলে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

সামুদ্রিক শৈবালের ব্যবহার ॥ সামুদ্রিক শৈবালের রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। এটি একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ জলজ উদ্ভিদ। এতে পুষ্টিকর খাদ্য উপাদানের মধ্যে রয়েছেÑ প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, কপার, জিংক, কোবাল্ট, আয়োডিন। এছাড়াও ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৬, ভিটামিন ‘কে’ এবং ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে শৈবালে।

শৈবাল থেকে ‘সি হুড মিল্ক শ্যেক’ নামে এক ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। ওই খাবার নাস্তা ও ভাতের বিপরীতে খাওয়া যায়। খাবারটি তৈরির জন্য শৈবালের ভেতরের অংশ কোন মেশিন দিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। এটি হাতের মাধ্যমে নিতে হয়। তাই এসব খাবার তৈরি করতে হাজারও নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া ওই খাবার ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগ নিরাময়ে অন্যতম ভূমিকাও পালন করে।

দেশীয় প্যাকেটজাত ও কোমল পানীয়, জেল, জেলি, সংরক্ষিত খাদ্যে, আইসক্রিম, সেম্পু, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন জিনিস উৎপাদনে ব্যবহার হয় শৈবাল। তথা মানবদেহে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে থাকে।

শৈবালের ঔষধি গুণ ॥ এর রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। লাল ও বাদামি বর্ণের শৈবালে ক্যারোটিন নামে এক ধরনের উপাদান আছে, যা মানবদেহে খাদ্যাভ্যাসে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমায়। ডায়রিয়া এবং টিউমার বৃদ্ধি রোধ ও প্রতিরোধ করে। এতে বিদ্যমান ক্যারাজিনান মানবদেহের উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। ইনসুলিন উৎপাদনকারী প্যানক্রিয়াসের নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে ধীরে ধীরে পুনর্জীবিত করে তোলে, যা ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করার কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। হৃদরোগ, ব্রেনস্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। স্পিরুলিনা শৈবাল দেহের হজম শক্তি বৃদ্ধি, রোগজীবাণু থেকে রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা এইডস প্রতিরোধে সহায়ক। শৈবাল মিশ্রিত আয়োডিনযুক্ত খাবার আয়োডিন সমস্যা দূর করতে পারে, সেই সঙ্গে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যেতে পারে।

চীন ও জাপানে জনগণের খাদ্যাভ্যাসে শৈবাল রাখায় ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কম। অনেক সময় ডায়রিয়ার ওষুধ হিসেবেও এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। টিউমার বৃদ্ধি রহিতকরণের পদার্থও শৈবালে আছে। তাছাড়া শৈবাল ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি কমায়।

এছাড়া শৈবাল সার উৎপাদন, সমুদ্রের দূষণ রোধেও ভূমিকা রাখে। এতে বিভিন্ন পিগমেন্ট থাকে, যা রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শৈবালে ঔষুধি গুণ থাকায় সবজি হিসেবে এটিকে খাবার তালিকায় রাখলে দেশের বেশির ভাগ জনগণ টিউমার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা পাবে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সামুদ্রিক শৈবালের গুরুত্ব অপরিসীম। শৈবাল পানির দূষণমাত্রা এবং পানির তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদির প্রভাব থেকে অনেকটা মুক্তি দেয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শৈবাল প্রধান ভূমিকা পালন করে। এছাড়া শৈবাল সমুদ্রের পানিতে প্রাথমিক উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। বৈশ্বিক ঊষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধেও শৈবাল চাষ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যেহেতু শৈবাল প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তাই খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনভাবে শৈবাল চাষ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের সমস্যা না হয়। সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখা এবং পর্যটকদের অবাধে চলাফেরা, পাথর আহরণ ও নৌপরিবহনের দিকে বিশেষভাবে নজর না দিলেও ব্যাহত হতে পারে শৈবাল চাষ।

বিকল্প আয়ের উৎস ॥ উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম খুব সীমিত। এ অঞ্চলের জনসাধারণ বেশিরভাগ সময় বেকার থাকে। তারা দৈনিকভিত্তিতে আয় করে। অর্থ জমানোর সুযোগ থাকে না। ফলে আর্থিক অভাব অনটন তাদের লেগেই থাকে, বাড়ে ঋণের বোঝা। পরিণামে চাষী পল্লীতে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করে। উপকূলীয় অঞ্চলের চাষীদের বিকল্প আয়, স্থিতিশীল পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টিতে শৈবাল চাষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বিশাল এ সমুদ্রকে যদি কাজে লাগানো যায় তবে খাদ্যের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী চাষীদের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে শৈবাল চাষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। তাছাড়া এ চাষের মাধ্যমে ওই সব অঞ্চলের নারী-পুরুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব।

সামুদ্রিক শৈবালের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ॥ জাপানের জিডিপির ২১ শতাংশ আসে সমুদ্র শস্য রফতানি ও এ থেকে উৎপাদিত সামগ্রী থেকে। চীনের ১৪-১৫ শতাংশ ও কোরিয়ার ৮-১০ শতাংশ জিডিপি গড়ে এ খাত থেকে আসে। সমুদ্র শস্যের মধ্যে সবচেয়ে দামি ক্লোরোফা। দেখতে আঙ্গুরের মতো এই সমুদ্র শস্যের এক আউন্সের আন্তর্জাতিক মূল্য ৬৪ ডলার। সে হিসেবে বাংলাদেশী টাকায় কেজিপ্রতি ক্লোরোফার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮০০ টাকা। এই শৈবাল থেকে উৎপাদিত হয় ওষুধ জমাট বাঁধানোর কাঁচামাল। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে এ ক্লোরোফা প্রাকৃতিকভাবে জন্মাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাফর বলেন, ‘সমুদ্রতটে কোন ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার টন সামুদ্রিক শৈবাল। বিশেষ করে সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া, হাতিয়া, সুন্দরবনের প্যারাবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে যদি পরিকল্পিতভাবে এটি চাষ করা হয় তবে উৎপাদিত হবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। বিনিয়োগ ছাড়া হাজার কোটি টাকার সম্পদ যদি পানিতে উৎপাদিত হয়ে পানিতেই ধ্বংস হয়, তবে বিষয়টি হবে দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘জলজ উদ্ভিদ শৈবাল আমরা প্রতিনিয়ত অবচেতন মনে ব্যবহার করছি। চকোলেট, ট্যাবলেটের বাইন্ডিংসহ নানাভাবে একে আমরা ব্যবহার করি। শুধু ওষুধই নয় অর্থনীতিতেও এর অবদান রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ জাপানে জিডিপির শতকরা ২১ শতাংশ অবদান রাখছে শৈবাল। চীন ও জাপানে জনগণের খাদ্যভ্যাসে শৈবাল রাখায় ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কম। অনেক সময় ডায়রিয়ার ওষুধ হিসেবেও এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। টিউমার বৃদ্ধি রহিতকরণের পদার্থ তো এতে আছেই।’

বাংলাদেশেও শৈবাল হতে পারে অন্যতম রফতানি পণ্য। এ প্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষায় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারী পর্যায়ের উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন তিনি।

সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা সামুদ্রিক শৈবালের ব্যাপক চাষের উদ্যোগ, এর পুষ্টিগুণ, অর্থনৈতিক চাহিদা, জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচার, ক্যাম্পেনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলে দেশে এর বৈধ ও স্থায়ী বাজার সৃষ্টি সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন এই গবেষক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন, পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়নে শৈবাল চাষ খুলে দিতে পারে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নতুন দুয়ার। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের অংশগ্রহণে নতুন মাত্রা যোগ করে জনগণের পুষ্টির অভাব পূরণ ও রোগ প্রতিরোধে আগামী দিনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই শৈবাল চাষ।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে জমিতে বালির চেয়ে মাটির পরিমাণ বেশি। ফলে আমাদের দেশে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ কারণেই আমরা আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এদেশে শৈবাল চাষের কাজ শুরু করতে চাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘উপকূলের কিছু মানুষ এখন নিজ উদ্যোগে